নবম ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রথম ধাপের সহিংসতা-অনিয়মের রেশ কাটতে না কাটতে শুরু হচ্ছে দ্বিতীয় ধাপের ভোট। দ্বিতীয় ধাপের এই নির্বাচনে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে একটানা বিকাল ৪টা পর্যন্ত ৬৩৯টি ইউপিতে ভোটগ্রহণ হবে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। অনিয়ম ঠেকাতে ‘চরম ব্যবস্থা’ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকারের জনপ্রিয় এই নির্বাচনে এবারও প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যেই মূল লড়াই হবে।
এই ভোট নিয়ে ‘বাড়াবাড়ি’ করলে কাউকেই ছাড় না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। বিএনপি প্রথম দফার মতো এই নির্বাচনেও অনিয়মের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, দলটির কেউ ‘বাড়াবাড়ি’ করলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
‘ফল ছিনতাইয়ের’ অভিযোগ তুলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছন, “আমাদের নেতা-কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আগ্রহের সঙ্গে এইসব নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, একইসঙ্গে সরকারি দলের সন্ত্রাসীরা ত্রাস সৃষ্টি করে ফলাফল ছিনিয়ে নিচ্ছে- এতে সরকার যে তথাকথিত মুখোশ পরে আছে, তা উন্মোচিত হচ্ছে।”
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপ-সচিব সামসুল আলম জানান, ইতোমধ্যে কেন্দ্রে কেন্দ্রে নির্বাচনী সামগ্রী পৌঁছেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের টহলের পাশাপাশি কেন্দ্রের নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়েছে।
পাবনার ফরিদপুরে বুধবার দুপুরে নৌকা ডুবে দুই কেন্দ্রের ব্যালট পেপারসহ নির্বাচন সামগ্রী নষ্ট হয়। পুনরায় মুদ্রণ করে ব্যালটসহ প্রয়োজনী সামগ্রী রাতেই কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছানো হয়েছে বলে জানান ব্যালট পেপার মুদ্রণ তদারকিতে থাকা ইসির উপ-সচিব রকিব উদ্দিন মন্ডল।
দলীয় প্রতীকে প্রথমবারের মতো ইউপি ভোট হচ্ছে এবার। চেয়ারম্যান পদে দলীয় এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য পদে নির্দলীয় প্রতীকে ব্যালট পেপার রয়েছে।
তৃণমূলে দলীয়ভাবে এ নির্বাচনে ব্যাপক গোলযোগ-সহিংসতার শঙ্কা করেছিল পর্যবেক্ষক মহল। তফসিল ঘোষণার পরবর্তী দেড় মাসে প্রথমধাপের ভোট নিয়ে অন্তত ২০ জনের প্রাণহানি হয়েছে।
এ অবস্থায় দ্বিতীয় ধাপে ভোটে অনিয়ম রোধে ‘কঠোর অবস্থান নিয়েছে’ ইসি। সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করেছে নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থাটি।
বুধবার নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, “প্রথম ধাপে কিছু ত্রুটি হয়েছে। এজন্য ব্যবস্থা নিয়েছি। দ্বিতীয় ধাপে এটাই সতর্কবার্তা- কোনো অনিয়ম হলে কাউকে ছাড় নয়। চরম ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছি। পরের ধাপের নির্বাচনগুলো আরও সুন্দর হবে- এমন প্রত্যাশা আমাদের।”
তিনি বলেন, ভোটের মধ্যে যে কোনো আইনসঙ্গত ব্যবস্থা নিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করা হবে। ভোট সুষ্ঠু করতে আইনের সবটুকুই যেন তারা প্রয়োগ করে।
“যেমন আমরা বলেছি, কোনো দুষ্কৃতিকারী দুষ্কৃতি করার চেষ্টা করলে যেন তাকে কোনোরকম ছাড় না দেওয়া হয়। একইসঙ্গে আইনসঙ্গত যে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সব ব্যবস্থাই যেন নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী,” ইসির অবস্থান তুলে ধরে বলেন এ নির্বাচন কমিশনার।
দ্বিতীয় ধাপের ভোট তথ্য
ভোট হবে ৪৭ জেলার ৬৩৯ ইউপিতে। মোট চেয়ারম্যান প্রার্থী দুই হাজার ৬৬২ জন। এরমধ্যে ১৭টি রাজনৈতিক দলের এক হাজার ৪৯৩ জন ও স্বতন্ত্র এক হাজার ১৬৯ জন।
সাধারণ সদস্য পদে ২১ হাজার ২৫৯ জন ও সংরক্ষিত সদস্য পদে ৬ হাজার ৪৯৮ জন লড়ছেন।
ভোটার ১ কোটি ১২ লাখ ১২ হাজার ৩৩৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫৬ লাখ ৩০ হাজার ২৩২ জন ও নারী ৫৫ লাখ ৮৪ হাজার ৭০৭জন। ভোটকেন্দ্র ৬ হাজার ২০৫টি ও কক্ষ ৩২ হাজার ২১টি।
কোন দলের কত প্রার্থী:
৬৩৯ ইউপির প্রত্যেকটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আছে; বিএনপির আছে ৫৬০টিতে। আওয়ামী লীগের ৩৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ৭৯ ইউপিতে প্রার্থী নেই বিএনপির।
চেয়ারম্যান পদে এছাড়া জাতীয় পার্টির ১৪৯ জন, জাসদের ২৪ জন, বিকল্পধারার একজন, ইসলামী আন্দোলনের ৯৪ জন, জাতীয় পার্টি-জেপির তিনজন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির দুইজন, ইসলামী ফ্রন্টের দুইজন, কমিউনিস্ট পার্টির পাঁচজন, জমিয়তে উলামায়ের একজন, খেলাফত মজলিসের একজন, ইসলামী ফ্রন্টের দুইজন, বাসদের একজন, সাম্যবাদী দলের একজন, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির একজন ও জাকের পার্টির তিনজন লড়ছেন।
প্রথম ধাপের ফলে আওয়ামী লীগ-বিএনপি
দেশের সোয়া চার হাজার নির্বাচন উপযোগী ইউপির মধ্যে ২২ মার্চ ৭১২ ইউপিতে ভোট হয়। এতে ৭৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। এরমধ্যে আওয়ামী লীগ ৫৪ ও বিএনপি ১৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
আওয়ামী লীগ ৫৪০টি জিতেছে। এরমধ্যে ৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ও ৪৮৬ জন ভোটে নির্বাচিত।
বিএনপি জিতেছে ৪৭ ইউপিতে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১০৩ ইউপিতে নির্বাচিত হয়েছে। জাতীয় পার্টি, জাতীয় পার্টি-জেপি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টির চেয়ারম্যান প্রার্থীরাও নির্বাচিত হয়েছে এ ধাপে।
ছয় ধাপের ইউপি ভোট
২২ মার্চ প্রথম ধাপ ও ৩১ মার্চ দ্বিতীয় ধাপের ভোট শেষ হচ্ছে। তৃতীয় পর্বে ২৩ এপ্রিল ভোট হবে ৬৫০ ইউপিতে। চতুর্থ পর্বে ৭ মে ভোট হবে সাত শতাধিক ইউপি। পঞ্চম পর্বে ৭১৪ ইউপির ভোট হবে ২৮ মে।৪ জুন ষষ্ঠ ও শেষ পর্বে ভোট হবে বাকি ইউপিতে।


