শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের হারানো মালামালের সন্ধান পাওয়ার পর সেগুলো যেই বিভাগের নিরাপত্তায় থাকে তার ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক অনিয়ম ধরা পড়েছে। স্টোর রুমের চাবি সংরক্ষিত জায়গায় না রাখায় অন্য বিভাগের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তা ব্যবহার করেন, যে কারণে সেখান মালামাল চুরির ঘটনা ঘটে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
হয়রানির শিকার এক যাত্রীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার বিমানব্ন্দরের ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ বিভাগের এক কর্মকর্তাকে ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করায় এই চিত্র প্রকাশ পায়।
আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউসুফ জানান, এই বিভাগের দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা কর্মকর্তা ডিউটি সুপারভাইজিং অফিসার (ডিএসও) মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেনকে দায়িত্বে অবহেলার জন্য ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
পাশাপাশি বিমান কর্তৃপক্ষকে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাসহ লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডের ‘স্পর্শকাতর’ স্টোরের ‘অব্যবস্থাপনার’ জন্য দায়ী অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও অনুরোধও করা হয়েছে বলে জানান তিনি। বলেন, এই বিভাগের অধীন্স্তদের তদারকি করেন সিকিউরিটি ডিএসও।দায়িত্ব পালনে কোনো অনিয়ম পেলে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর কথা তার।
“অথচ এখন পর্যন্ত তিনি (ইফতেখার) এ ধরণের কোনো অনিয়মের বিষয়ে কাউকে অবহিত করেননি। এমনকি কে কোন শিফটে সিকিউরিটি ইনচার্জ ছিলেন, কখন গেলেন, কার কাছে স্টোরের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে গেলেন তাও কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতেন না।”
ম্যাজিস্ট্রেট ইউসুফ বলেন, ইকবাল হোসেন নামে দুবাইফেরত এক ব্যক্তির অভিযোগের প্রেক্ষিতে লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড বিভাগে অভিযান চালিয়ে নানা অনিয়ম ধরা পড়ার পর স্বেচ্ছা-স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে সিকিউরিটি ডিএসও ইফতেখারকে জরিমানা করা হয়। চাকুরিবিধিমতে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ বিমানের মহাব্যবস্থাপকে জানানো হয়েছে।
তিনি জানান, দীর্ঘ সাত বছর পর দেশে এসে ব্যাগ নিয়ে ভোগান্তিতে পড়ার পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করেন মৌলভীবাজারের ইকবাল। বলেন, “এমিরেটস এয়ারলাইনসে মঙ্গলবার সকালে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর লাগেজ কালেকশন এরিয়া থেকে তার দুবাই থেকে পাঠানো বুকিং ব্যাগটি পাচ্ছিল না।”
ব্যাগ না পেয়ে ইকবাল প্রথমে এমিরেটস কর্মকর্তা কামাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিকালের অন্য একটি ফ্লাইটে ব্যাগ আসবে এবং সন্ধ্যার পর বিমান বন্দরের ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ বিভাগে থেকে লাগেজ নিয়ে যেতে পারবেন বলে বলে তিনি জানান।
ইকবাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে সেখানে গেলে তাকে জানানো হয়, ‘লাগেজ স্টোর বন্ধ হয়ে গেছে, পর দিন সকাল ৯টার পরে লাগেজ মিলবে।’
লাগেজ না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়ে ক্ষুব্ধ ইকবাল বিমান ও এমিরেটসের বিরুদ্ধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করেন।
এক সময় এই বিভাগ সকাল ৯টা- বিকাল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকতো। পরে যাত্রীদের ভোগান্তি প্রশমনে সময় বাড়িয়ে সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত দুই শিফট চালু করা হয়। শিফট দুটি হলেও তা না করে একই লোকেরা আগের মতোই ৯-৫টা অফিস করে দুই শিফটের বেতন-ভাতা নিচ্ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইকবাল বলেন, “বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর বাসে সিলেট পৌছে দেবে বলে এয়ারলাইনসের সঙ্গে কথা হয়েছিল। সকালে ব্যাগ বুঝে না পেয়ে ওই বাসে করে বাড়ি যেতে পারিনি, এয়ারপোর্টের পাশেই একটি হোটেল ভাড়া করে ব্যাগের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
“ফেরার আগেই দেশে সব টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, যাতায়াত ও হাতখরচের জন্য ৩ হাজার টাকা সঙ্গে ছিল। যখন শুনলাম, লাগেজ আসেনি পরদিন বুঝে নিতে হবে, মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছিল।”
ইকবালের অভিযোগ পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত এমিরেটসের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারাও ভোগান্তির জন্য শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে। তাদের অভিযোগ, ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ এর সিকিউরিটি অব্যবস্থাপনার কারণে আগেও তাদের (এমিরেটস কর্তৃপক্ষ) ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে।
এরপর ভ্রাম্যমাণ আদালত লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড বিভাগে গিয়ে নানা ধরণের অনিয়মের কথা জানতে পারেন ইউসুফ।
তিনি বলেন, “লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড বিভাগ রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা রাখার নির্দেশনা দেওয়া আছে। দুই শিফটে লোকজন বাড়িয়ে এটি কার্যকর করার কথা। কিন্তু গিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলে জানি, নির্দেশনা থাকলেও বিভাগটি চলছিল আগের নিয়মেই।”
“একই জনবলেই আগের এক শিফটের পরিবর্তে এখন ওভারটাইমসহ দুই শিফটে বেতন নিচ্ছিলেন কর্মকর্তারা”, বলেন ইউসুফ।
আগের নিয়মে চলার কারণে বিভাগের সবাই সন্ধ্যার পরপরই বিভাগটি বন্ধ করে চলে যেত বলেই স্টোরের মালামাল চুরি হয় বলে ইউসুফ জানান।
“সন্ধ্যা হলেই স্টোর বন্ধ করে চাবি নির্ধারিত রুমে রেখে সিকিউরিটি ইনচার্জ অফিস ছাড়েন। তখন অন্য বিভাগের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ওই স্টোর ব্যবহার করেন।
কাগজে-কলমে ‘দায়িত্বে না থেকেও’ চাবি পাওয়ায় ওইসব কর্মকর্তাদের হাতেই মালামাল চুরি, ব্যাগ কেটে মাল চুরির অহরহ ঘটনা ঘটতে পারে বলেও সন্দেহ এ আইন কর্মকর্তার। বলেন, তা নাহলে সুরক্ষিত স্টোর থেকে কিভাবে মালামাল হাওয়া হয়ে যায়।
জবাবদিহিতার বাইরে থাকা ওই কর্মকর্তারা ‘ব্যাগ ডেলিভারি দেন, নাকি নেন’- এমন প্রশ্ন রাখেন ইউসুফ।


