আবারো বিয়ে করলেন এরশাদ- গত ক’দিন ধরে এমন গুজবেই মেতেছেন ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারকারীরা। এক নারী আইনজীবির সঙ্গে কিছু ছবি গত ক’দিনে ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকসহ সামাজিক গণমাধ্যমগুলোতে।
এরশাদের সঙ্গে ঘরোয়া পরিবেশে মোনাজাতরত ওই নারীর নাম দিলারা বলে জানা গেছে। পেশায় তিনি একজন আইনজীবী। বাড়ি গাইবান্ধা জেলায়। বিবাহবহির্ভূত অসংখ্য নারীর সঙ্গে এরশাদের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময় মুখরোচক আলোচনা রয়েছে। এ কারনে ‘৯০ বছরের এরশাদের ঘরে আমাদের নতুন চাচী’ শিরোনামে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে ছবিটি শেয়ার হচ্ছে। অনেকে এই বিষয়ে টিপ্পনীও কাটছেন!
তবে সামাজিক যোগাযোগে ভাইরাল হওয়া বিয়ের এই ছবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এরশাদের ব্যক্তিগত সহকারী সুনীল শুভ রায়। মি. রায় বলেন, ‘এটা একটি মিলাদের ছবি। কোন ধরনের যাচাই, বাছাই না করে এই ছবিকে বিয়ের ছবি বলে প্রচার করে অন্যায় করা হচ্ছে। আমাদের অফিসে এমন হাজারো ছবি আছে। সব ছবিকে কী তাহলে বিয়ের ছবি বলে প্রচার করা হবে?’
আইনজীবি দিলারার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
উল্লেখ্য, স্বৈরশাসন ও আন্দোলন, দমনপীড়নের জন্য নয়, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আশির দশক থেকে এখনও আলোচিত, সমালোচিত একাধিক নারীর সঙ্গে তার প্রেম ও জটিল সম্পর্কের কারণে। বিভিন্ন সময় প্রকাশিত সংবাদে বিতর্ক তৈরি হয়েছে জিনাত মোশাররফ, মেরি, বিদিশাদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কের কথায়। তবে এরশাদের লেখা আত্মজীবনীতে তার প্রেমিকাদের নাম গোপন রেখেছেন নিপুণতার সঙ্গে। তবে বর্তমানে রাজনৈতিক কর্মপদ্ধতি ও দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ চললেও শেষ পর্যন্ত নানা ঘাত, প্রতিঘাত উপেক্ষা করে তার সঙ্গে আছেন তার প্রথম স্ত্রী রওশনই। পরবর্তীতে মেরি মমতাজকে বিয়ে করলেও ঘর করা হয়নি তাদের। ‘বান্ধবী’ জিনাত মোশাররফকে এরশাদ বিয়ে করেছিলেন বলে জোর গুজব ছিল। দু’জনের কেউ কোনো দিন বিষয়টি অস্বীকার করেননি। এরপর এক সময় বিদিশাকে বিয়ে করেন এরশাদ। তাদের ঘরে জন্ম হয় এরিকের। কিন্তু চারদলের জোট সরকারের আমলে বিএনপির সঙ্গে আঁতাতের অংশ হিসেবে বিদিশাকে শুধু তালাকই দেননি এরশাদ, নানাভাবে হয়রানিও করেছেন।
প্রেমিকারা কে কোথায়?
শুধু সামরিক স্বৈরশাসক হিসেবেই নয়, রাজনৈতিক দাবাড়ু এরশাদ দুর্নীতিপরায়ণ হিসেবে, বহুবিবাহ, অসংখ্য প্রেমিকা, সন্তানসহ নানা দুর্ঘটনায় দেশ-বিদেশে আলোচিত, সমালোচিত। ক্ষমতা দখল করে একদিকে তিনি রাজনীতিতে ধর্মকে টেনেছেন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষনা করেছেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে করেছেন। এমনকি পরদিন কোন মসজিদে নামাজ পড়বেন, তা আগের রাতে স্বপ্নেও দেখেছেন। অন্যদিকে এদেশের কোনো নেতা বহুগামিতা নিয়ে রাজনীতিতে এমন সংযোজন, বিয়োগের দ্বিতীয় নজির তার মতো সৃষ্টি করতে পারেননি।
নারীদেরকে কথিত প্রেমের ফাঁদে ফেলতে এরশাদ ক্ষমতা দখল করে কবিতা লেখাও শুরু করেন। বলা হয়ে থাকে, রোমান্টিক কবিতা ও কবির প্রতি নারীরা দুর্বল। নারী, গোলাপফুল, সেক্স বিষয়ক এসব কবিতা ছাপাতে বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকদেরকে বাধ্যও করেন রাষ্ট্রপতি এরশাদ। অভিযোগ আছে প্রয়াত বরেণ্য কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ শামসুল হক, ফজল শাহাবুদ্দীন প্রমুখ ভাড়ায় এরশাদের কবিতা লিখতেন। তাদের রোমান্টিক ও যৌন কবিতা পত্রিকায় ছাপা হতো এরশাদের নামে। এরশাদের পরকীয়া কাহিনী সাপ্তাহিক যায়যায়দিন এ ছেপে তখন দেশ ছাড়তে হয় পত্রিকাটির সম্পাদক শফিক রেহমানকে।
এরশাদের প্রেমিকার তালিকায় ছিলেন মেরি, শাকিলা জাফর, জিনাত মোশাররফ, নাশিদ কামাল, নীলা চৌধুরী, সালমা বীল হেনা, আমেনা বারী, বিদিশা প্রমুখ। এরশাদ ১৯৯৭ সালে জেল থেকে বের হওয়ার পর সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি একজনকে ভালোবাসতাম।’ সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, ‘তিনি কি জিনাত মোশাররফ?’ জবাবে এরশাদ বলেন, ‘অফকোর্স, তোমরা আমার ছেলের মতো। তার নামটা লিখো না প্লিজ!’
ক্ষমতায় থাকাকালে জিনাতের সঙ্গে এরশাদের পরকীয়া কাহিনী ছিল অনেকের মুখে মুখে। তার নামের সঙ্গে মিল রেখে জিনাত মোশাররফ নতুন নামকরন করেছিলেন জিনাত হুসেইন! তার সঙ্গে পরকীয়া নিয়ে দৈনিক সংবাদের সাংবাদিক রাশেদ আহমদের কাছে খোলামেলা সাক্ষাৎকার দেন এরশাদ। এতে ঘর ভাঙ্গে জিনাতের। ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় সাবেক মন্ত্রী মোশারফের সঙ্গে। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করলে এরশাদের ইচ্ছায় সংরক্ষিত আসনে মহিলা সংসদ সদস্য হন জিনাত।
এরশাদের আলোচিত আরেক প্রেমিকা কণ্ঠশিল্পী শাকিলা জাফর। এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে এক পর্যায়ে বিটিভির পর্দা দখলে থাকত তার। এরশাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান শুরু হতো তার গান দিয়ে। ১৯৮৩ সালে বিটিভির ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানে ‘তুলা রাশির মেয়ে’ গানটির মাধ্যমে শাকিলার পরিচিতি ঘটে দর্শক, শ্রোতাদের সঙ্গে। এরশাদ সরকারের পতনের পর তিনি বেশ কয়েক বছর আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি এখন ব্যস্ত থাকেন সঙ্গীতচর্চা নিয়ে।
এরশাদের আরেক প্রেমিকা নাশিদ কামাল সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালের মেয়ে। এরশাদের সাথে সম্পর্কের অবনতির পর ক্যাপ্টেন মুসাকে বিয়ে করেন। তবে বিয়েটি টেকেনি। মুসা ও নাশিদ কামালের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায। নাশিদ কামাল এখন টিভি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন। তিনি নর্থ সাউথ ইউনির্ভিসিটিতে শিক্ষকতাও করেন।
এরশাদের আরেক প্রেমিকা মেরি। লন্ডনি এ সুন্দরী গতবছর লন্ডনে মারা গেছেন। প্রয়াত চিত্র নায়ক সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীও ছিলেন এরশাদের আলোচিত পরকীয়ার তালিকায়। বছর কয়েক আগে তার স্বামী কমল চৌধুরী মারা গেছেন। তিনি এখন সিলেটে থাকেন।
প্রেম করে এরশাদ তার নিজের বয়সী শিক্ষক আবুবকর সিদ্দিকের মেয়ে বিদিশাকে বিয়ে করেন। বিদিশার সঙ্গে তার ছাড়াছাড়িও হয়ে যায়। গত চারদলের জোট সরকারের আমলে আলোচিত নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে বিদিশার সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়। তখন অভিযোগ উঠে, দুই বউকে দিয়ে এরশাদ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। রওশন রাখছিলেন ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে, আর বিদিশা রাখছিলেন তখনকার জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে। বিদিশা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে লন্ডনে বৈঠকও করেন।
বিষয়টি জানতে পারেন চার দলের জোট সরকারের নীতি নির্ধারকরা। এরপর সরকার থেকে এরশাদকে চাপ দেয়া হয়, তার দ্বিতীয় বউ বিদিশাকে তালাক দিতে। তখন এরশাদের দেয়া চুরির মামলায় জেলে যান বিদিশা, মুক্তিও পান। গত পাঁচ বছর ধরে দেশে অবস্থান করছেন তিনি। এরশাদের সঙ্গে দাম্পত্য জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ‘শত্রুর সঙ্গে বসবাস’ নামে একটা বইও লিখেছেন।
উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। পরের বছর জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তার সরকারের পতন ঘটে। এরপর তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি জেল থেকে অংশ নেন। ছয় বছর আবরুদ্ধ থাকার পর ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি জামিনে মুক্তি পান।


