আলোচিত পানামা পেপারস কেলেংকারিতে এবার রেডক্রসের নাম জড়িয়ে পড়েছে। পানামার আইনি পারমর্শক প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকার ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা গেছে, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবতাবাদী সেবা ও দাতব্য সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব দ্য রেডক্রস (আইসিআরসি) ভুয়া অফশোর কোম্পানির সুবিধাভোগী হয়েছে। সুইস দৈনিক লে মাটিন ডিমানকে পত্রিকা রোববার এ ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে রেডক্রস জানিয়েছে, তাদের অজান্তে ও অনুমোদন ছাড়াই প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করেছে। এদিকে, পরিবারের অফশোর কোম্পানির কর ফাঁকি কেলেংকারির জেরে বিক্ষোভের মুখে ছয় বছরের আয়কর বিবরণী প্রকাশ করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন।
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়, মোসাক ফনসেকা তাদের ক্লায়েন্টদের আয়কর ফাঁকি দিতে ও সম্পদের তথ্য গোপন রাখতে যেসব ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলেছিল, তার মধ্যে দুটো প্রতিষ্ঠানের সুবিধাভোগীর তালিকায় রেডক্রসের নাম রয়েছে। ব্রাদারহুড ফাউন্ডেশন ও ফেইথ ফাউন্ডেশন নামের এ দুটি প্রতিষ্ঠান তাদের সুবিধাভোগী হিসেবে আইসিআরসিকে তালিকাভুক্ত করেছে। সুইস ইনফো নামের একটি সংবাদ সাইট এক প্রতিবেদনে বলেছে, ফেইথ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অর্থ পাচার করতেন আর্জেন্টিনার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেস্তর ক্রিচনার, ক্রিচনা ফার্নান্দেজ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা বিন যায়েদ নাহইয়ান। ওই প্রতিষ্ঠানের সুবিধাভোগী হিসেবে রেডক্রসকে দেখানো হয়েছে।
আইসিআরসির প্রেসিডেন্ট পিটার মোরার এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এমন কোনো বিষয় আমাদের জানা নেই। আমাদের অজান্তেই এই প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করিনি। পিটার আশংকা প্রকাশ করেন এসব সংবাদের কারণে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে সমস্যা হতে পারে। তিনি বলেন, আমরা মানুষের সেবা করি, যুদ্ধক্ষেত্রেও আহতদের দেখাশোনা করি। আমাদের বিনা অনুমোদনে প্রতিষ্ঠানের নাম কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে। এখন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে আমাদের কর্মীরা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অনুমোদনহীন নাম ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেবেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পানামা পেপারস কেলেংকারির সূত্র ধরে রোববার তার ছয় বছরের আয়কর বিবরণী প্রকাশ করেছেন। তিনি ২০১৪-১৫ সালে ২ লাখেরও বেশি পাউন্ডের আয়ের বিপরীতে কর দিয়েছেন ৭৬ হাজার পাউন্ড। পানামা পেপারস কেলেংকারিতে তার নাম আসায় ব্রিটেনে যে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ঝড় ওঠে তার অবসান ঘটাতে তিনি এই বিবরণী প্রকাশের উদ্যোগ নিলেন।
উল্লেখ্য, এই প্রথম ব্রিটেনের কোনো প্রধানমন্ত্রী তার আয়কর বিবরণী প্রকাশ করলেন।
প্রকাশিত বিবরণী থেকে দেখা গেছে, ক্যামেরন তার বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ৩ লাখ পাউন্ড ছাড়াও মায়ের কাছ থেকে উপহার হিসেবে আরও ২ লাখ পাউন্ড পেয়েছেন। সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন- মায়ের কাছ থেকে পাওয়া উপহারও কি অফশোর কোম্পানির তহবিলের অংশ কি-না। আর এসব অর্থের উত্তরাধিকার কর পরিশোধ এড়াতে ধাপে ধাপে অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
শনিবার ক্যামেরন স্বীকার করেছেন তিনি ভালো কোনো সপ্তাহ পার করছেন না। কারণ তিনি মনে করছেন পরিস্থিতি আরও ভালোভাবেই সামাল দেয়া উচিত ছিল। যদিও প্রথমে তিনি বলেছিলেন, এটি একটি ব্যক্তিগত ব্যাপার।
ক্যামেরন এখন বলছেন, ‘আমি জানি শেখার অনেক কিছু আছে। আমি এসব থেকে শিখব। তবে আপনারা ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট অথবা নামহীন উপদেষ্টাদের দায়ী না করে আমাকে অপবাদ দিন।’
চার পৃষ্ঠার আয়কর বিবরণী থেকে দেখা গেছে, ক্যামেরন ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মোট ১১ লাখ পাউন্ড আয় করেছেন। আয়কর দিয়েছেন ৪ লাখ পাউন্ড।
এদিকে মধ্য লন্ডন থেকে ট্রাফালগার স্কয়ার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ থেকে প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। শনিবার আয়োজিত এই বিক্ষোভে স্থবির হয়ে পড়ে শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা।
পানামাভিত্তিক ল’ফার্ম মোসাক ফনসেকার সমর্থনে যেসব অফশোর কোম্পানির নাম ফাঁস হয়েছে তাতে ক্যামেরনের মৃত বাবা ইয়ান ক্যামেরনের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানেরও নাম রয়েছে। ক্যামেরন স্বীকার করেছেন, এ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে তার শেয়ার রয়েছে। চূড়ান্তভাবে একথা স্বীকারের পর বিক্ষোভকারীরা তার পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে।
উল্লেখ্য, কর ফাঁকি দেয়ার লক্ষ্যে বিশ্বের অনেকেই অফশোর কোম্পানিগুলোতে তাদের অর্থ মজুদ করেন। পানামাভিত্তিক ল’ফার্ম মোসাক ফনসেকা এসব ফার্মকে সহায়তা করেছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অনেকের মধ্যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভাদিমির পুতিন থেকে শুরু করে আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীও রয়েছেন। পুতিন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করলেও আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমুন্ড গুনলাগসন ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন।


