দফায় দফায় ফেরত যাচ্ছে সরকারিভাবে আমদানি করা জাহাজভর্তি গম। এসব গমের নির্দিষ্ট মানদণ্ডের পরীক্ষায় অধিকাংশই নিম্নমান প্রমাণিত হওয়ায় তা ফেরত পাঠাচ্ছে খাদ্য অধিদপ্তর।
গত দুই বছর ধরে ব্রাজিল এবং ফ্রান্স থেকে এসব নিম্নমানের গম আসলেও অতি সম্প্রতি রাশিয়া থেকে দুটি চালানে ১ লাখ টন গম এসেছে তাও পরীক্ষায় নিম্নমান প্রমাণিত হয়েছে। এ চালানগুলোও গ্রহণ না করে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ নিয়ে দুই অর্থবছরে প্রায় ৪ লাখ টন গম নিয়ে ৭টি জাহাজ ফেরত গেছে।
এভাবে আমদানি করা গম দফায় দফায় ফেরত যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও খাদ্য বিভাগ বলছে, মজুদ কিংবা সরবরাহে তেমন বিঘ্ন ঘটবে না। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতি নাকি অন্য কোনো কারণে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা দরকার।
নিম্নমানের হওয়ায় গেল অর্থবছরে সরকারের আমদানি করা সাড়ে ৩ লাখ টন গম নিয়ে রফতানিকারক দেশে ফেরত যায় ৫টি জাহাজ। চলতি অর্থবছরেও দেড় লাখ টন গম আমদানির জন্য ৩টি চুক্তি করে সরকার। যার আওতায় রাশিয়া থেকে গেল মাসে প্রায় ১ লাখ টন গম নিয়ে দুটি জাহাজ পৌঁছে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে। তবে নমুনা পরীক্ষায় মানসম্মত না হওয়ায় গমগুলো গ্রহণ করেনি সরকার। ‘এমভি স্পার লিবরা’ নামের জাহাজে রাশিয়া থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে ৫১ হাজার টন গম আসে ৮ মার্চ। ৭ এপ্রিল রাশিয়া থেকে ‘এমভি ইকুইনক্স ডন’ নামের আরেকটি জাহাজ ৪৮ হাজার ৩০০ টন সরকারি গম নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করে। খাদ্য অধিদফতর থেকে পাওয়া এসব গমের নমুনা রিপোর্টে দেখা যায়, ‘এমভি স্পার লিবরা’ নামের জাহাজে রাশিয়া থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে ৫১ হাজার টন গম আসে ৮ মার্চ। নিয়ম অনুযায়ী বন্দরে আসার পর জাহাজ থেকে গমের নমুনা সংগ্রহ করে খাদ্য অধিদফতর। সংগৃহীত এ নমুনায় নয়টি ক্ষেত্রে গুণগতমান পরীক্ষা করা হয়। মান অনুযায়ী বিজাতীয় উপাদান (গমের খোসা বা ভুসি) থাকার কথা সর্বোচ্চ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে আমদানি করা গমে এসব উপাদান পাওয়া যায় এক দশমিক ০৮ শতাংশ। এ কারণে আমদানি করা গম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে খাদ্য অধিদফতর। রাশিয়া থেকে ‘এমভি ইকুইনক্স ডন’ নামের আরেকটি জাহাজ ৪৮ হাজার ৩০০ টন নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর আসে ৭ এপ্রিল। এ জাহাজ থেকে শনিবার নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে এ জাহাজেরও সব গম নিম্নমানের পান খাদ্য অধিদফতরের রসায়নবিদরা।
গেল বছর ফ্রান্স আর ব্রাজিল থেকে আনা নিুমানের গম নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠলে গমের নতুন মানদণ্ড ঠিক করে সরকার। তবে এরপরও ঘটেছে ব্যত্যয়। দফাফ দফায় আসছে নিুমানের গমভর্তি জাহাজ। বারবার নিুমানের গম আসার পেছনে কারও কোনো অসৎ উদ্দেশ্য কিংবা দুর্নীতি কাজ করছে কিনা তা খতিয়ে দেখার তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ ব্যাপারে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘খাদ্য অধিদফতরের অধিকাংশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এ সেক্টরটি প্রায় দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। গম আমদানির ক্ষেত্রেও অসাধু কর্মকর্তারা নানা দুর্নীতি ও নয়ছয় করে থাকে। সুতরাং এখানে দুর্নীতি কাজ করেছে কিনা কিংবা বারবার নিুমানের গম আসার পেছনে এ সেক্টরের কোনো কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্টদের অসৎ উদ্দেশ্য আছে কিনা তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বারবার একইভাবে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, গম আসছে, গম ফেরত যাচ্ছে, কারও কোনো ধরনের জবাবদিহিতা নেই। এটা কিভাবে সম্ভব। এখানে যে স্বচ্ছতা কাজ করছে না, জবাবদিহিতা নেই, এটাই তার বড় প্রমাণ।’ এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি কেন ঘটছে তা জবাবদিহিতার আওতায় এনে দেশের অর্থনীতির স্বার্থে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন দেশের এ বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ।
এ ব্যাপারে খাদ্য অধিদফতরের চট্টগ্রামের চলাচল ও সংরক্ষণ নিয়ন্ত্রক জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘গমের মান নিয়ে কোনো আপস না করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা আছে। আগেও আমরা নিুমানের গম ফেরত পাঠিয়েছি। তারপরও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বারবার পচা ও নিুমানের গম নিয়ে আসছে। সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে চাইলে হাই অথরিটি ব্যবস্থা নিতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বারবার যে সরবরাহকারী এসব গম নিয়ে আসছে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়। কিন্তু ব্যাপারটি আমাদের এখতিয়ারে নেই। এগুলো হাই অথরিটি দেখেন।’ তিনি বলেন, ‘এসব গম ফেরত পাঠালেও দেশে পর্যাপ্ত গমের মজুদ রয়েছে। এতে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না।’
খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ফয়েজ আহমেদের সঙ্গে তার ব্যবহৃত টেলিটক মোবাইল ফোনে (নম্বর-০১৫৫৬৩২৬১৭৯) একাধিকবার কল এবং এসএমএস দেয়া হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।


