বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

রেলওয়েতে আটশ’ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম

railway-bd1রেল বিভাগে শত শত কোটি টাকার পণ্য কেনা হয়। কিন্তু তা ব্যবহার করা হয় না। আবার এসব পণ্য ক্রয় করা হয় বাজার দরের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে। রাজস্ব খাতের পাঁচটি প্রকল্পের যন্ত্রাংশ বাজার দরের চেয়ে বেশি মূল্যে ক্রয় করেছে রেল বিভাগ। একই সঙ্গে রেলে ব্যবহারের জন্য কেনা হয় অনুপযোগী মূল্যবান মালামাল, যা পরে আর ব্যবহার সম্ভব হয় না। এভাবে রেলের পণ্য কেনায় বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে বলে সম্প্রতি অডিট আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি)। প্রতিবেদন অনুযায়ী বিভিন্নমুখী অনিয়মের মাধ্যমে রেলে আর্থিক অনিয়ম হয়েছে প্রায় ৮শ’ কোটি টাকা।

সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়, রেল বিভাগে প্রচলিত সরকারি বিধি-বিধান ও নির্দেশ অনুসরণ করা হয়নি। যথাসময়ে দরপত্র আহ্বান ও চুক্তি হয়নি। পাশাপাশি ঘাটতি ও অনাদায় সম্পর্কিত অনিয়মের ব্যাপারে কোনো ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এছাড়া রয়েছে রেলের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা খুবই দুর্বল, যে কারণে এসব অনিয়ম হয়েছে।

এই অনিয়মের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মঙ্গলবার রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বুধবার জানান, রেলের অডিট আপত্তি সম্পর্কে আমি এখনও জানতে পারিনি। ফলে না জেনে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি খতিয়ে দেখব।

জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের রাজস্ব খাতে বাস্তবায়নাধীন পাঁচটি প্রকল্প এবং ২০০৯-১১ অর্থবছরের হিসাবের ওপর নিরীক্ষা পরিচালনা করে রেল অডিট অধিদফতর। এতে ৩৪টি ঘটনার বিপরীতে ৭৮৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়ে। এছাড়া পৃথক আরও একটি নিরীক্ষা পরিচালনা করা হয় রেলওয়ের ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন, ডিজেল ও লোকমোটিভ কারখানার ওপর। ২০০৮-১১ অর্থবছরের হিসাবের ওপর এই নিরীক্ষা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ১০টি ঘটনায় ১৬ কোটি ৫২ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের সন্ধান পাওয়া গেছে।

অবশ্য ২০১৫ সালে সিএজির রিপোর্টেও রেল বিভাগের প্রায় এক হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের তথ্য প্রকাশ পায়। ওই সময় অধিক মূল্যে রেল ক্রয়, বিনা কাজে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ, প্রয়োজন ছাড়াই অনিয়মিত যন্ত্রাংশ ক্রয়সহ নানা উপায়ে এই অর্থ তছরুপ করা হয়।

দেখা গেছে, ১০টি কৌশলের মাধ্যমে রেল বিভাগ ও প্রকল্পের প্রায় ৭৮৪ কোটি টাকার ক্ষতি করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, রেলের জন্য যন্ত্রাংশ ক্রয় করা হয়েছে। কিন্তু ওই যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে বাজারমূল্য থেকে বেশি দামে। মালামাল কেনা নিয়ে এখানে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম হয়। এছাড়া আরেক ঘটনায় প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ না করেই রেলের জন্য মালামাল ক্রয় করা হয়। এই কেনাকাটার পেছনে রয়েছে আর্থিক অনিয়ম।

পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অনেক মালামাল কেনা হয় রেলে ব্যবহারের জন্য। কিন্তু দেখা গেছে, শেষ পর্যন্ত ওইসব মালামাল আর ব্যবহার করা হচ্ছে না। এক পর্যায়ে মূল্যবান এসব পণ্য অকেজো হয়ে গেছে। মূলত এখানে পণ্য কেনাই ছিল মূল উদ্দেশ্য, ব্যবহার নয়। সিএজির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অকেজো মালামালও যথাসময়ে বিক্রির ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। এছাড়া রেলের জন্য কেনা হয়েছে স্লিপার। কিন্তু সেটি ব্যবহার না করেই ফেলে রাখা হয়। এছাড়া আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। কিন্তু তা না মেনে বিধি লংঘন করে পূর্ত কাজের মেরামত চুক্তি অনুমোদন দেয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়। অবৈধ লাভবানের আশায় এ কাজ করা হয়। সিএজির প্রতিবেদনে অন্যান্য অনিয়ম প্রসঙ্গে বলা হয়, ইজারা দেয়া ট্রেনের ওপর ভ্যাট আদায় না করা, ট্র্যাক পুনর্বাসন কাজ থেকে অবমুক্ত মালামাল ওপেন লাইনে কম হস্তান্তর, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাজেট গ্রহণ করে তা কাজে লাগাতে ব্যর্থতার মাধ্যমে এসব আর্থিক ক্ষতি করা হয়।

এদিকে রেলওয়ের ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন, ডিজেল ও লোকমোটিভ কারখানার ওপর নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ছয়টি কৌশলে এখানে আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। এর মধ্যে আছে, রেল বিভাগের জন্য মালামাল কেনা হয়েছে ত্রুটিপূর্ণ ও অনুপযোগী, যা কেনার পরও ব্যবহার সম্ভব হয়নি। এছাড়া অবৈধভাবে মোটরগাড়ি ব্যবহারের কারণে আর্থিক ক্ষতি করা হয়। সিএজির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রেলওয়ের কার ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন, ডিজেল ও লোকমোটিভ কারখানা কর্তৃপক্ষের অদক্ষতা এবং ত্রুটিপূর্ণ মেরামতের ফলে প্রতিষ্ঠানে অস্বাভাবিক আউটটার্ন হয়, যা শেষ পর্যন্ত আর্থিক হিসাবে নেতিবাচক অবস্থার তৈরি করেছে। আরও দেখা গেছে, ত্র“টিপূর্ণ থাকায় রেলের ভোক্তা বিভাগ থেকে স্টোর বিভাগে পণ্য ফেরত পাঠায়। কিন্তু স্টোর বিভাগ আবার ব্যবহারের জন্য আর কোনো পণ্য প্রেরণ করেনি। এভাবে পণ্য সরবরাহ থেকে অনিয়ম করা হয়েছে।

আরও পড়ুন