বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

মুক্তচিন্তার নামে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত সহ্য করা হবে না : প্রধানমন্ত্রী

নববর্ষ উপলক্ষে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানান আওয়ামী লীগ নেতারা -যুগান্তর
পহেলা বৈশাখ উদযাপনের বিরোধিতাকারীদের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এখন একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে, ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লিখলেই তারা হয়ে যায় মুক্তচিন্তার। আমি তো এখানে মুক্তচিন্তার কিছু দেখি না। মুক্তচিন্তার নামে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়াকে বিকৃত ও নোংরা রুচির পরিচয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমরা ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলিম এবং জাতিতে বাঙালি। এদেশে ঈদ ও অন্যান্য পার্বণের মতোই পহেলা বৈশাখও উদযাপিত হয়। ধর্মের নামে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান পালনে বাধা দেয়ার সুযোগ নেই।

প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে বৃহস্পতিবার দলীয়  নেতাকর্মীরা তাকে নবর্ষের শুভেচ্ছা জানানোর প্রক্কালে তিনি এসব কথা বলেন। নববর্ষের অনুষ্ঠানে বাধাদানকারীদের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তারা আদৌ কোনো ধর্ম পালন করেন কি না- তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে তো বহু পার্বণ আছে। আমরা ঈদ করি, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পহেলা বৈশাখও আমরা উদযাপন করি। এখানে ধর্মীয়ভাবে বাধা দেয়ার কিছু নেই। যারা নিষেধ করে, তারা কেন করে তা আমি জানি না। তারা কোন ধর্ম পালন করে সেটা নিয়েও সন্দেহ। পাশাপাশি ধর্মের প্রতি ‘আঘাতকারীদের’ সতর্ক করে দিয়ে সহনশীলতার সঙ্গে সংস্কৃতি ও ধর্ম পালনের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

পহেলা বৈশাখ উদযাপনের বিরোধিতাকারীদের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটাকে অনেকেই অনেক রকম মন্তব্য করার  চেষ্টা করে। কেউ বলে ফেলে যে এটা হিন্দুয়ানি। আমরা মুসলমান হলেও বাংলাদেশে বাস করি। আমরা বাঙালি। কারণ বাঙালি হিসেবে যুদ্ধ করে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। আমরা বাঙালি হলে যে মুসলমান হতে পারব না, এ রকম তো কোনো কথা নেই। ধর্মে কোথায় লেখা আছে- পহেলা বৈশাখ পালন করা যাবে না।

শেখ হাসিনা বলেন, পৃথিবীতে যেসব দেশে মুসলমান আছে সেসব দেশের নামেই তো সেই জাতির নাম। আরব দেশের যারা তাদের অ্যারাবিয়ান বলেই তো সবাই ডাকে। প্যালেস্টাইনের অধিবাসীদের প্যালেস্টাইনি বলেই ডাকা হয়। প্রত্যেকেরই তো পরিচয় একটা দেশ, ভৌগোলিক সীমারেখায় সেই পরিচয় দেয়া হয়। ‘তবে কি তাদের মুসলমানিত্ব চলে যাচ্ছে? তাদের মুসলমানিত্ব তো চলে যাচ্ছে না। বাংলাদেশে জাতিগত সাংস্কৃতিক উৎসব পালনের বিরোধিতাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমাদের খুব দুর্ভাগ্য যে, আমাদের একেক দল একেক রকম করে কথা বলতে শুরু করে। আমাদের এ দেশে যুগ যুগ ধরে যে সংস্কৃতি, আমাদের যে রীতিনীতি, সেগুলো আমরা পালন করি। যার যার ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী ধর্ম পালন করে। একটা সহনশীলতা নিয়ে আমরা বসবাস করব, যেন আমাদের দেশে শান্তি বজায় থাকে। সবচেয়ে বড় কথা শান্তি। কারণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছাড়া কখনও উন্নতি হয় না।

ধর্মীয় প্রসঙ্গ নিয়ে লেখালেখির ক্ষেত্রে সতর্ক করে তিনি বলেন, আরেকটি বিষয় বলব, কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে  লেখা কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এখন একটা ফ্যাশন দাঁড়িয়ে গেছে, ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লেখলেই তা হয়ে গেল মুক্তচিন্তা। আমি এটাকে মুক্তচিন্তা দেখি না। আমি এটাকে দেখি নোংরামি। এত নোংরা নোংরা লেখা কেন লিখবে? আমি আমার ধর্ম মানি, আমি যাকে নবী মানি তাঁর সম্পর্কে নোংরা কথা যদি কেউ লেখে, সেটা কখনও আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। ঠিক তেমনি অন্য ধর্মেরও যারা, তার সম্পর্কেও কেউ কিছু যদি লেখে, তাহলে এটা কখনও গ্রহণযোগ্য হবে না।

ধর্ম বা অন্য ধর্মের অবমাননা করে লেখালেখিকে ‘নোংরা ও বিকৃত মনের পরিচায়ক’ আখ্যায়িত করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, একজন মুসলমান হিসেবে আমি প্রতিনিয়ত ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলি। সেটা নিয়ে যদি কেউ লেখে, তাহলে আমার নিজের কষ্ট হয়। আর এ লেখার জন্য কোনো অঘটন ঘটলে সেটা সরকারের ওপর আসবে কেন? সবাইকে ‘সংযম ও শালীনতা’ বজায় রেখে ‘অসভ্যতা’ পরিহার করার আহ্বান জানান তিনি।

ধর্মের নামে যারা মানুষ খুন করে, তাদের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ খুন করার মধ্যে সমস্যার সমাধান নেই। একজন লেখল, আর একজন খুন করে প্রতিশোধ নেবে এটাও তো ইসলাম ধর্ম বলেনি। বিচার তো আল্লাহ করবেন। আল্লাহই তো বলে দিয়েছেন, তিনিই শেষ বিচারের মালিক। যাদের আল্লাহর ওপর ভরসা নেই তারাই এ খুন-খারাবি করতে চায়। কারণ তারা আসলে আল্লাহ-রসুলও মানে না, তারা নিজেরাই আল্লাহর কাজ করতে চেষ্টা করে। এটা তো শিরক?

বাংলাদেশে এবারই প্রথম সরকারি চাকুরেদের জন্য বৈশাখী উৎসব ভাতা চালু হয়েছে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, দেশের গ্রামগঞ্জেও আনন্দ-উচ্ছ্বাসের সঙ্গে নববর্ষ পালিত হয়। এবার নিরাপত্তার কারণে উন্মুক্ত স্থানে বিকাল ৫টার মধ্যে পহেলা  বৈশাখের অনুষ্ঠান শেষ করতে বলা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিকাল ৫টার মধ্যে উন্মুক্ত স্থানে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান শেষ করার নির্দেশনার সমালেচনা যারা করছেন, তাদেরও জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আরেকটা গ্রুপ আছে। আমরা মানুষের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য সব সময় সচেতন। একটা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করার জন্য কী কী করণীয় আমরা তার কতকগুলো অনুশাসন দেই। এ নির্দেশনা দেয়ায় অনেকে দেখলাম ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। যিনি ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, তাকে আমি বলতে চাই- যদি কোনো অঘটন ঘটে তার দায় কী তিনি নেবেন? তাকেই নিতে হবে। এটা মাথায় রাখতে হবে। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদীদের হামলার ঘটনা তুলে ধরে তিনি নির্দেশনা মেনে শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব উদযাপন করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।

ইসলাম ধর্মে সহনশীলতার  শিক্ষার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের ধর্ম আমরা সবাই পালন করি। আর ইসলাম ধর্মেই নির্দেশনা আছে যে, যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে। এখানে কারও ধর্মের ওপর আঘাত দেয়ার কথা তো বলা হয়নি। নবী করীম (স.) তো বলেই গেছেন যে, ‘ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করও না।’ আর এই যে বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে নানা ধরনের কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করা, থ্রেট করা, বোমা মেরে মানুষ হত্যা করা বা মানুষের জীবনের ওপর হুমকি দেয়া- এটা ধর্মের কোথায় বলা আছে? যারা এ ধরনের হুমকি দেয় তারাই তো আমাদের ধর্মকে অবমাননা করে, ধর্মের বদনাম করে। সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন বছরে বাংলাদেশের আরও অগ্রগতি প্রত্যাশা করেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সমাগতদের মিষ্টি, ফলসহ বিভিন্ন খাবারে আপ্যায়িত করা হয়। অনুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রী, দলীয় নেতাকর্মী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রধানমন্ত্রীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান।

প্রধানমন্ত্রী শুনলেন রুনা লায়লার দুই নাতির গান :
বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের বিখ্যাত শিল্পী রুনা লায়লার দুই নাতির গান শুনে মুগ্ধ হয়ে তাদের প্রাণভরে দোয়া করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।  বুধবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনে রুনা লায়লার মেয়ে তানি লায়লা দুই ছেলে জাইন ও অ্যারন প্রধানমন্ত্রীকে খালি গলায় ‘আই লাভ মাই বাংলাদেশ’ গানটি গেয়ে শোনায়। সে সময় উপস্থিত ছিলেন রুনা লায়লা ও তার স্বামী চিত্রনায়ক আলমগীর এবং রুনা লায়লার মেয়ে তানি লায়লা। ২৬ মার্চ ইউটিউবে অবমুক্ত হওয়া গানটি জাইন ও অ্যারনের মুখে শুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছেন রুনা লায়লা। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার দুই নাতি জাইন ও অ্যারনের উদ্যোগের প্রশংসা করে তাদের দোয়া করেছেন। তাদের উৎসাহ দিয়েছেন। তারাও প্রধানমন্ত্রীকে পেয়ে যেমন অনুপ্রাণিত হয়েছে, ঠিক তেমনি তার দেখা পেয়ে গর্বিত ও আনন্দিত।

রুনা লায়লা আরও বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুবই ব্যস্ত একজন মানুষ। আমরা যোগাযোগ করার পর তিনি তার সব ব্যস্ততা সত্ত্বেও সময় বের করেছেন। আন্তরিকতা নিয়ে কথা বলেছেন। আমরা এজন্য তার কাছে কৃতজ্ঞ।

 

আরও পড়ুন