বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

গরিবের বিচার তো আল্লায় করে

1459133272কলেজ ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর চেহলামের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে বাবা এয়ার হোসেনের কপালের ভাঁজ তত বাড়ছে। কারণ চেহলাম করার মতো আর্থিক সংগতিও নেই শোকে আচ্ছন্ন পরিবারটির। ২৮ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করতে পারেনি তদন্ত কর্মকর্তারা। দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের ১৮ দিন পার হলেও আজ পর্যন্ত মেলেনি প্রতিবেদন। তদন্তে নিয়োজিত সিআইডিও মুখ খুলছে না। এ অবস্থায় হতাশ বাবা বিচার চাইছেন আল্লাহর কাছে।

তনুর বাবা এয়ার হোসেন কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহকারী। গতকাল রবিবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আমার তো টাকা-পয়সা নাই। চল্লিশা (চেহলাম) করতে টাকা-পয়সার দরকার আছে না বাবা? দেখি কী করা যায়। চল্লিশা তো করতে হবে।’

মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে এয়ার হোসেন বলেন, ‘গত চার-পাঁচ দিনে কেউ মামলার ব্যাপারে কোনো কথা বলেনি। তদন্ত কর্মকর্তাও কথা বলেননি। আমার আর কী করার আছে বাবা? গরিবের বিচার তো আল্লায় করে। এখন আল্লাহ যদি এর বিচার করে।’

তনু হত্যা মামলা তদন্তে কুমিল্লা সিআইডির (পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ) রহস্যময় আচরণ করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজী মো. ইব্রাহিম গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করেন। গতকাল তিনি কুমিল্লায় ফিরেছেন। তবে তদন্তের বিষয়ে কোনো কথা বলছেন না। গতকাল এই প্রতিবেদক কথা বলার চেষ্টা করলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই তিনি বলেন, ‘তনু হত্যার বিষয়ের কোনো কথা বলব না।’ এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

তনু হত্যাকাণ্ডের পর গত ২৭ মার্চ রাত থেকে রহস্যময়ভাবে নিখোঁজ ছিল তনুর ছোট ভাইয়ের বন্ধু মিজানুর রহমান সোহাগ। ১৬ দিন পর ফিরে এলেও কারা তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল, কোথায় রাখা হয়েছিল—এসব বিষয়ে সে কিছুই বলতে পারছে না। সিআইডির কোনো কর্মকর্তা বা তদন্ত কর্মকর্তাও সোহাগের কাছে যাননি।

সোহাগের বোন খালেদা আক্তার জানান, গত ১২ এপ্রিল সোহাগ ফিরে আসার পর দিন বুড়িচং থানার পুলিশ তাদের বাড়িতে গিয়ে কথা বলেছে। সিআইডির কেউ আসেনি, খবরও নেয়নি। তুলে নিয়ে যাওয়ার সময়ের ঘটনা ও ফিরে আসার সময়ের ঘটনা ছাড়া সোহাগ আর কিছু বলতে পারছে না। কারা নিল, কোথায় ছিল—এসব বিষয়ে সে কিছুই জানে না। তার মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা, ব্যথায় কাতরায়।

বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট নাজমুল আলম চৌধুরী নোমান জানান, সিআইডির শীর্ষ কর্মকর্তাদের তত্পরতা ও শিগগির তনু হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের আশ্বাসে জনগণ আশান্বিত হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক দিনে সিআইডির রহস্যময় নীরবতা নানা সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।

তনুর প্রথম দফা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন জমা পড়েছিল গত ৪ এপ্রিল। প্রথম প্রতিবেদন নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠায় গত ৩০ মার্চ দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্তের জন্য তনুর লাশ কবর থেকে তুলে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। তারপর পেরিয়ে গেছে ১৮ দিন। এখন পর্যন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় ময়নাতদন্তকারী দলের প্রধান কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. কামদা প্রসাদ সাহা জানান, সব বিষয়ের রিপোর্ট এলে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দেওয়া হবে। তবে এটা কবে হবে, তা বলা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কুমিল্লা জেলা কমিটির আহ্বায়ক বিমল সরকার ও যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সাঈদ গতকাল জানান, সোমবার (আজ) বিকেলে শহরের কান্দিরপাড়ে তনু হত্যাকাণ্ডসহ দেশে চলমান ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে সংগঠনের উদ্যোগে নাগরিক সমাবেশের আয়োজন করা হবে।

প্রসঙ্গত, গত ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নামতি সেনানিবাসের পাওয়ার হাউস রোডের পাশের একটি জঙ্গলের মধ্যে মেয়ের লাশ পান এয়ার হোসেন। পরদিন দুপুরে তনুর প্রথম দফা ময়নাতদন্ত করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যার পর কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার মির্জাপুরে গ্রামের বাড়িতে লাশ দাফন করা হয়। এ ঘটনায় রাতে তনুর বাবা কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

আরও পড়ুন