বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতি চলছে কোন পথে?

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, সুইডেন থেকে।

দীর্ঘ দিন থেকে সুইডেনের মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে এখন বার বার মনে হয় বাংলাদেশের রাজনীতিটা কি আসলে কোনো রাজনীতির পর্যায়ে পরে? এধরনের রাজনৈতিক ধারা বিশ্বের আর কোনো দেশে আছে কি? রাজনীতিতে গণতন্ত্র অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ বিষয় হলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে আদৌ কি কোনো গণতন্ত্র আছে? আমার তো মনে হয়, এখানে আছে শুধু তোষামোদী, চাটুকারিতা ও একনায়কতন্ত্র। নিজ নিজ দলে গণতন্ত্রিক সিস্টেম না এনে শুধু গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে চিত্কার করা হচ্ছে। বাংলাদেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল বিরোধী অবস্থানে থাকলে সরকারকে বলে স্বৈরাচার আবার ক্ষমতায় গেলে তখন তারা নিজেরাই হয়ে যায় স্বৈরাচার। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।  এধরনের রাজনীতির পরিবর্তন অত্যন্ত প্রয়োজন হলেও ভবিষ্যতে আদৌ কোনদিন সে পরিবর্তন আসবে কি না তাতে সন্দেহ রয়েছে। কারণ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এধরনের পরিবর্তন আনার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ভবিষ্যতেও করবে কি না তাতে সন্দেহ রয়েছে।

আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের সাংগঠনিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। দলে প্রাথমিক সদস্য ফি: দিয়ে একবার সদস্য হওয়ার পর প্রতি বত্সর নুতন করে ফি: দেওয়ার নিয়ম থাকলেও কেউ তা পরিশোদ করেন কি না তাতে সন্দেহ রয়েছে। অনেকে কোন ধরনের ফি: না দিয়েই দলের নেতৃত্ব পেয়ে যান। সুতরাং সদস্য ফি: নবায়নের বিষয়টি কার্যকরী করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমান আই টি যুগে খুব সহজেই সদস্যদের তালিকা রেজিস্ট্রেশন ও ফি: পরিশোদ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এভাবে প্রতিবত্সর বার্ষিক ফি: জমা দেওয়ার বেবস্থা গ্রহণ করলে একবার ভেবে দেখুন বড় বড়  রাজনৈতিক দলগুলোর বাত্সরিক আয় কোথায় গিয়ে দাড়াতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সদস্য  ফি: জমা না দেওয়া হলে নিয়ম অনুযায়ী তিনি দলের সদস্য থাকার যোগ্যতা হারাবেন। এজন্য প্রতিটি দলে প্রয়োজন বাত্সরিক সদস্য ফি: সিস্টেম কার্যকরী করা। প্রাথমিক সদস্য ফি: বেবস্থা এখন হয়তো শুধু মাত্র গঠনতন্ত্রেই উল্লেখ আছে। বাস্তবে কয়জন পরিশোদ করেন তা কি কখনো  পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে? প্রতিবত্সর নিয়ম অনুসারে দলের সদস্য ফি: না দিয়ে নেতা কর্মীরা কি করে দল করেন নেতা হন এম পি হন এমনকি মন্ত্রী পর্যন্ত হন তা আমার কাছে অদ্ভূত  মনে হয়। এ কি করে সম্ভব। বাংলাদেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল সন্মেলনের পূর্বে কি কখনো যাচাই করে দেখেছে কারা দলের সদস্য ফি: পরিশোদ করেছেন? নাকি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে একবার সদস্য ফি: জমা দিলেই তাকে আজীবন সদস্য হিসেবে ধরা হয়? বিষয়টি আমার কাছে পরিষ্কার নয়।

রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্র থাকলে জেলা উপজেলা পর্যায়ের কমিটিগুলোর কোনো স্বীকৃতির প্রশ্ন আসতো না। দলে বিভক্ততা আসতো না। নেতৃত্ব নিয়ে দন্ধ সৃষ্টি হতো না। দলীয় কর্মীদের সরাসরি সমর্থনে সৃষ্টি হতো নেতৃত্ব। কর্মীদের খুব সহজেই দলীয় নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার সুযোগ আসতো। তা না করে এখানে ক্ষমতাকে অগণতান্ত্রিকভাবে কেন্দ্রের হাতে আকড়িয়ে ধরে রাখা হয়েছে। সৃষ্টি করা হয়েছে স্বীকৃতি নামের ক্ষমতার খেলা। কেন্দ্রের এই নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক  খেলার কারণেই মূলত সৃষ্টি হচ্ছে একই দলে একের অধিক কমিটি ও নেতৃত্ব। কখনো কখনো  আবার দলের ভেতরে নেতৃত্ব নিয়ে হয় মারামারি খুনাখুনি। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্লাটফর্মে দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন নিয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। দলগুলো চলছে নেতা কেন্দ্রিকভাবে। দলে গণতন্ত্র আসলে নেতা নেত্রীদের কর্মীদের কাছে জবাবদিহিতার দার উন্মুক্ত হতো। অন্যদিকে দল একক নেতৃত্বের উপর নির্ভর না হয়ে উঠবে কর্মী নির্ভর। ফলে কর্মীরা প্রকাশ্যে নেতা নেত্রীদের সাংগঠনিক কাজ কর্মের সমালোচনা করার সুযোগ পাবে। দলের কেন্দ্রীয় নেতারা তখন আত্ব সমালোচনা, আত্ব সংযম ও আত্ব শুদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের ভুল শুদ্ধ করার সুযোগ পাবে। এই আত্ব শুদ্ধি, আত্ব সমালোচনা ও আত্ব সংযমের কথা বলেছেন আমাদের মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ যদি প্রশ্ন করি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর এই আদর্শ কি এখন তার প্রানপ্রিয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগে আছে? কি উত্তর দিবেন তখন আওয়ামী লীগ নেতারা?

রাজনৈতিক দলগুলোতে প্রকৃত গণতান্ত্রিক বেবস্থা কার্যকরী করা হলে তখন আর কেন্দ্রীয় কমিটি  থেকে স্বীকৃতির প্রয়োজন হবে না। জেলা, উপজেলা থানা ও বিদেশের কমিটিগুলো সরাসরি সদস্যদের ভোট নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকবে। দলের গঠনতন্ত্র মেনে নিয়ম অনুসারে  সন্মেলনের মাধ্যমে তখন নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে। সুইডিশ রাজনীতির সাথে তুলনা করে আমি বলতে পারি বিগত তিন বত্সর যাবত লেফট পার্টির একটি শাখার সভাপতি পদে আমি সরাসরি সদস্যদের ভোট নির্বাচিত হয়েছি। এজন্য জেলা কমিটি কিংবা কোনো নেতার স্বীকৃতির প্রয়োজন হয়নি। বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় কমিটির ক্ষমতাকে কমিয়ে আনতে হলে এধরনের গণতান্ত্রিক সিস্টেম চালু করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে নেতা নেত্রীরা কোথায় কোথায় মিডিয়াতে আর বলবেন যে দলের সভানেত্রী সকল সিদ্ধান্তের মালিক। সিদ্ধান্তের মালিক তো হবে কর্মীরা, নেতারা নয়। একেই বলে গণতন্ত্র। দলের গঠনতন্ত্রের বাহিরে যদি কোনো নেতা কর্মী  কিছু করে একমাত্র তাহলেই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা যেতে পারে। নেতা নেত্রীর  কার্যকলাপের সমালোচনা করা সদস্যদের নৈতিক অধিকার। দলের প্রতিটি কর্মীর গণতান্ত্রিক  অধিকার। এজন্য সংস্কার পন্থী কিংবা অন্য কোনো দোষ দিয়ে কাউকে দল থেকে বহিষ্কার   করা যায় না। দলের গঠনতন্ত্র মেনে চললে তাকে কেউ দল থেকে বহিষ্কার করতে পারে না। কোনো নেতা নেত্রীর ক্ষমতা নেই কোনো কর্মী বা নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা।

আওয়ামী লীগের বিপক্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপির দিকে তাকিয়ে দেখুন। সেখানে কি করুন অবস্থা। সম্প্রতি মা ও ছেলের রাজনৈতিক পদকে আরো শক্তভাবে পাকাপোক্ত করা ও দীর্ঘদিন থেকে দায়িত্বরত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে ভারমুক্ত করা হয়েছে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ভাবে। একে একে কমিটির অন্যান্যদের নাম এখন বেগম খালেদা জিয়া দলের সদ্য নিযুক্ত সিনিয়ার মহাসচিব রিজবীর মাধ্যমে ঘোষণা করে চলছেন। অথচ কত ঢাক ঢল পিটিয়ে করা হলো দলের কাউন্সিল অধিবেশন। জানিনা দলের গঠনতন্ত্রে এধরনের কাউন্সিল অধিবেশন করার কোনো নিয়ম আছে কি না। যদি থেকে থাকে তাহলে প্রতিবারই তো এভাবেই হবে অধিবেশন। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে অযথা অর্থের অপচয় না করে ঘরে বসে কমিটি তৈরী করে মিডিয়ায় প্রকাশ করলেই তো হয়। দলের এমন কেউ কি আছেন এধরনের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার? না, কারো সেই সাহস নেই। কারণ অতীতের মত আর কেউ সংস্কারপন্থী হয়ে রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়তে চান না। সুতরাং বেগম খালেদা জিয়া যা বলবেন সেটাই হলো দলের গঠনতন্ত্র, গণতন্ত্র ও আদর্শ। তিনি কখনই ভুল করতে পারেন না। তিনি আমাদের নেত্রী। তার ছেলে তারেক রহমান আমাদের ভবিষ্যত নেতা। বিএনপি চলবে খালেদা তারেকের নেতৃত্বে। এখানে প্রতিদন্দী বলে কোনো কথা নেই। এই হলো বিএনপির রাজনীতির হাল চাল। এই রাজনীতিকে পুজি করেই বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন যুগ যুগ ধরে তার একক নেতৃত্ব।

এ ব্যাপারে এককভাবে শুধু বিএনপিকে দায়ী করা ঠিক হবে না। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেও বিরাজ করছে একই অবস্থা। এখানেও চলছে অগণতান্ত্রিক পথে একক নেতৃত্ব। ফলে তৃণমূলে আদর্শবান, সৎ ও পরীক্ষিত নেতারা নেতৃত্বে আসতে পারছেন না। অথচ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সময় দলের এমন অবস্থা ছিল না। আওয়ামী লীগের সন্মেলন হয়েছে। নুতন নুতন নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়েছে। সারা বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অবস্থান ছিল শক্ত। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু একসময় আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। এই সময় কামরুজ্জামান হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি। আওয়ামী লীগে এমন অনেক গণতান্ত্রিক উদাহরণ রেখে গেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। অথচ এই আওয়ামী লীগে কয়েক যুগ থেকে দলীয় প্রধানের পরিবর্তন হয়নি। আসছে অধিবেশনে আওয়ামী লীগ জানি না এধরনের কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসবেন কি না। বর্তমানে একদিকে দল অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী দুটোকেই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে সামাল দিতে হচ্ছে। তিনি চাইলে প্রধানমন্ত্রী পদ ছেড়ে দিয়ে দলীয় সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারেন। কিংবা বঙ্গবন্ধুর মত দলের সভাপতি পদ ছেড়ে দিয়ে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে পারেন। তাহলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনায় তিনি আরো বেশি সময় দেওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতে সোনিয়া গান্ধী তার উজ্জল দৃষ্টান্ত। তিনি দলের সভানেত্রী থেকে মনমোহন সিং কে  প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিলেন।

এছাড়া বাংলাদেশে অনেকে বর্তমান পারিবারিক রাজনীতির সমালোচনা করে থাকেন। কিন্তু আমি তাদের সাথে একমত নই। পারিবারিক রাজনীতি বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। বাংলাদেশ তার বেতিকক্রম নয়। সুতরাং এখানে সমালোচনা আসার কোনো যুক্তিকতা আছে বলে আমি মনে করি না। তবে শুধু পরিবার থেকে আসছে বলেই যাকে তাকে উড়ে এসে জুড়ে বসতে হবে এমন কোনো কথা নয়। তাকে আসতে হবে রাজনৈতিক যোগ্যতার মাপকাঠিতে। শুধুমাত্র পারিবারিক কারণে নয়। দলে গণতন্ত্র আসলে এই নিয়মের পরিবর্তন খুব সহজেই নিয়ে আসা যায়। বাংলাদেশের আসে পাশে অনেক দেশেই পরিবারতন্ত্রের রাজনীতি দৃস্টিত। তবে সেই পরিবারতন্ত্র  যোগ্যতার ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক পদে আসছে। বাংলাদেশের মত পরিবারের নাম বহন করে নয়। সুতরাং সরাসরি পরিবারতন্ত্রের সমালোচনা না করে এখানে দলে গণতান্ত্রিক সিস্টেমকে চালু করার উপর জোর দেওয়া উচিত। তাহলে দলীয় কর্মীরা সহজেই দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারবে। দলে গণতন্ত্র ফিরে এলে এমনিতেই পরিবারতন্ত্রের অবসান আসতে বাধ্য। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে জনগনের প্রশ্ন, বড় দুইটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে আদৌ আসবে কি কোনদিন প্রকৃত গণতন্ত্র?

আরও পড়ুন