শনিবার ৭ নভেম্বর ২০২৬

বিএনপি নেতার ব্যাংকে সাড়ে চার কোটি টাকা লেনদেন

Tipu-copy2 copy বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপুর একটি ব্যাংক স্টেটমেন্টকে কেন্দ্র করে বিএনপিতে এখন তোলপাড় চলছে। গত এক বছরে সংশ্লিষ্ট ওই নেতা মার্কেন্টাইল ব্যাংকে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার লেনদেন করেছেন। দলীয় বিরোধীদের অভিযোগ, পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মনোনয়ন বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে ওই লেনদেন হয়েছে। অন্যদিকে তাইফুল সমর্থকরা এ ঘটনাকে দলের একাংশের নোংরামি বলে অভিহিত করছেন। তাঁদের মতে, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের ‘লোক’ হওয়ায় তাঁকে বিপদে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে।

জানা গেছে, তাইফুলের ওই ব্যাংক স্টেটমেন্ট বিএনপি নেতাদের এখন হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়েছে।  স্টেটমেন্টের কপি বিলি হয়েছে দলটির গুলশান ও নয়াপল্টন কার্যালয়ে। বিএনপিতে এ নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা চলছে। কারণ এ ধরনের স্টেটমেন্ট ফাঁস হওয়ায় বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নেতারাও ভয়ে আছেন। বলা হচ্ছে, দলের পদ-পদবি নিয়ে বাণিজ্য এখনো হচ্ছে। ফলে কে কার বিরুদ্ধে চেয়ারপারসনের কাছে অভিযোগ নিয়ে যান—এ নিয়ে একদিকে যেমন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে, অন্যদিকে তাইফুলের ঘনিষ্ঠ নেতাদের নামও উঠে আসছে ওই আলোচনায়।

গত বছর গঠনতন্ত্রে পদ শূন্য না থাকা সত্ত্বেও নতুন একটি পদ সৃষ্টি করে এই তাইফুলকে সহদপ্তর সম্পাদক করা  হয়েছে। মোহাম্মদ শাহজাহানসহ অনেকের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলে আলোচনা থাকলেও তাঁকে পদায়নের নেপথ্যে শিমুল বিশ্বাসের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে বলে দলের অনেক নেতার অভিযোগ। যদিও শিমুল বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, তিনি কাউকে নিয়োগ বা পদায়ন করেননি। তাঁকে পদায়ন করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

ব্যাংক স্টেটমেন্টের ওই কপিতে দেখা যায়, ২০১৫ সালের ৫ এপ্রিল থেকে চলতি বছরের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত  তাইফুলের মালিকানাধীন কম্পানি ‘মেসার্স টি এন্টারপ্রাইজ’-এর নামে মোট চার কোটি ৩৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৭৩ টাকা জমা হয়েছে। এই সময়ে ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে চার কোটি ৩৭ লাখ ৫২ হাজার ৩৭২ টাকা। এতে দেখা যায়, পাবনা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনলাইনে ওই হিসাব নম্বরে টাকা জমা হয়েছে। লেনদেনের হিসাবে দেখা যায়, বেশির ভাগ টাকাই নগদ জমা ও তোলা হয়েছে।

জানতে চাইলে তাইফুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকে লেনদেনের ঘটনা ঠিক আছে। কিন্তু এটি পুরোপুরিই তাঁর ব্যবসার লেনদেনের টাকা। এর সঙ্গে মনোনয়ন বাণিজ্যের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। তিনি বলেন, ‘আমি টুকটাক ব্যবসা করি, সাপ্লাই দিই। আমার বিরুদ্ধে যা হচ্ছে তা নোংরামি। আমি দুর্নীতি করি না। বিএনপির কারো কাছ থেকে পাঁচ টাকা নিয়েছি, কেউ বলতে পারবে না। এ নিয়ে আমি উদ্বিগ্নও নই।’ ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসা করছেন বলে দাবি করেন তিনি।

লেনদেনের বেশির ভাগই নগদ অর্থে হয়েছে কেন জানতে চাইলে তাইফুল ইসলাম আরো বলেন, নগদ দিয়েছে তাই জমা হয়েছে। এর মধ্যে কোনো দুর্নীতি নেই।

তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ সম্পর্কে তাইফুল ইসলাম বলেন, এটি সত্য নয়। নির্বাচন সময়ের ব্যাংক হিসাব পরীক্ষা করলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে।

তবে নাটোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক জানিয়েছেন, তাইফুলকে তাঁরা অনেক দিন ধরে চেনেন। কিন্তু তাঁর বড় কোনো ব্যবসা আছে বলে এযাবৎকালে তাঁরা শোনেননি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রনেতা তাইফুল ইসলাম টিপুর গ্রামের বাড়ি নাটোরের লালপুর উপজেলার মোমেনপুর গ্রামে।

উল্লেখ্য, গত বছর ২৮ এপ্রিল ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং ৩০ ডিসেম্বর সারা দেশে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর এ বছর গত ২২ মার্চ থেকে তিন দফায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাইফুলের ওই ব্যাংক লেনদেনের সঙ্গে ওই নির্বাচনগুলোর মনোনয়ন বাণিজ্যের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে বিএনপির বড় একটি অংশের সন্দেহ। তারা বলছে, মনোনয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাইফুলকে ‘কোষাধ্যক্ষ’ হিসেবে ব্যবহার করে থাকতে পারেন। অর্থাৎ তাঁর হিসাবে টাকা জমা হয়েছে, যা পরে মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন এমন নেতা বা ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপির আরো কিছু নেতার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তাইফুল দেখাশোনা করেন—এমন আলোচনা এখন চলছে বিএনপিতে।

তাইফুলের হিসাব পরীক্ষা করে দেখা গেছে, গত বছর এপ্রিল মাসে মোট ৬১ বার, মে মাসে ৪৭ বার, জুনে ৪১, জুলাইয়ে ৯, সেপ্টেম্বরে ২, নভেম্বরে ১৩, ডিসেম্বরে ১৬ বার তার অ্যাকাউন্টে লেনদেন হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে কোনো লেনদেন না থাকলেও ফেব্রুয়ারি মাসে দুবার, মার্চে ২২ বার এবং ৫ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচবার লেনদেন হয়েছে। তাইফুলের দাবি অনুযায়ী তিনি টুকটাক ব্যবসা করেন। কিন্তু তার পরও এক মাসে ৬১ বা ৪১ বার লেনদেনের কারণ কী জানতে চাইলে তিনি কোনো জবাব দিতে পারেননি।

বিএনপি নেতারাও অনেকে এ চিত্র দেখে বিস্মিত হয়েছেন। পৌর ও ইউপি নির্বাচনের মনোনয়ন বাণিজ্যের আলোচনাও এখন নতুন করে উঠতে শুরু করেছে। দলের নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য ছাগলনাইয়ায় তাঁর এলাকায় বিলাসবহুল নতুন বাড়ি করেছেন—এমন আলোচনা গত কয়েক দিন ধরেই চলছে দলের মধ্যে। এ ছাড়া অনেকে কিনেছেন নতুন গাড়ি।

পৌর ও ইউপি নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত দলের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যের কথা আমার জানা নেই। বড় কোনো অভিযোগ এ পর্যন্ত কেউ তুলছে বলেও আমার জানা নেই।’ তিনি বলেন, ‘ঘটনার (ব্যাংক স্টেটমেন্ট ফাঁস) কথা শুনে আমি তাইফুলকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে টুকটাক ব্যবসা করে বলে জানিয়েছে। এর বেশি কিছু আমি জানি না।’

তবে শিমুল বিশ্বাস বলেন, ‘আমি তাইফুলকে চাকরি বা পদ কোনোটিই দিইনি। পদ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তা ছাড়া টিপু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা ছিলেন। শুনেছি বউ নিয়ে তিনি ঢাকা শহরে বাসা ভাড়া করে থাকতে পারেন না। তার পরও এ বিষয়ে সবচেয়ে ভালো হয় দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োজিত দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদের সঙ্গে কথা বললে। কারণ রিজভী আহমেদের সঙ্গেই কাজ করেন তাইফুল।’

তবে রিজভী আহমেদ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, দলে এখন অনেক নোংরামি হচ্ছে, ফলে কথা না বলাই ভালো।

স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘ব্যবসা করলে এক বছরে সাড়ে চার কোটি টাকা লেনদেন হতেই পারে। তা ছাড়া টিপুর স্ত্রী চাকরি করেন।’

আরও পড়ুন