ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তৃতীয় ধাপে আগের দুটি নির্বাচনের মতোই কেন্দ্র দখল, কারচুপি ও অনিয়মের কিছুৃ অভিযোগ পাওয়া গেলেও বড় ধরনের কোনো গোলযোগ ছাড়াই গতকাল শনিবার শেষ হয়েছে ৬১৪টি ইউপির ভোট গ্রহণ। আগের মতো ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা না ঘটলেও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবর মিলেছে। পাবনার চাটমোহরে একটি কেন্দ্রে ফল ঘোষণা করতে দেরি হওয়ায় এলাকাবাসীর বিক্ষোভে গুলি বর্ষণ করে বিজিবি। এতে একজন নিহত হন। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে দুই পক্ষের সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের গুলির সময় দৌড়ে পালাতে গিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও তিনজন। এ ছাড়া বিভিন্ন জেলায় প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের তিন চেয়ারম্যান প্রার্থীসহ সারাদেশে প্রায় ৫০ বিএনপি ও জাসদের প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনার ফলে এবারের ভোট অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। সাড়ে পাঁচ হাজারেরও বেশি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে দু-তিনটি ঘটনা একেবারেই শূন্য শতাংশ। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রথম দুই ধাপের মতোই গতকালের ভোটেও ব্যাপক কারচুপি ও দখলের ঘটনা ঘটেছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের এই অপকর্মে সহযোগী হিসেবে স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। সাক্ষীগোপালের ভূমিকায় ছিল নির্বাচন কমিশন।
তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেছেন, আগের দুই ধাপের তুলনায় এবারের ভোট শান্তিপূর্ণ হয়েছে। পরের তিন ধাপে আরও শান্তিপূর্ণ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
পর্যবেক্ষক সংস্থা ব্রতীর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গতকালের ভোটে ইসির অধিকতর তৎপরতা সত্ত্বেও অনিয়ম ও সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়নি। তবে আগের দুই ধাপের তুলনায় সহিংসতার ঘটনা কম ছিল। সারাদেশে জাল ভোটসহ বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাসহ অন্তত ৩২ জনকে আটক করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে ব্যুরো, আঞ্চলিক অফিস, জেলা-উপজেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর থেকে আরও জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ, মাগুরা, শ্রীপুর, কুমিল্লায় ব্যাপক কারচুপি ও ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ভোটের সময় সংঘর্ষে কুমিল্লায় ৩৬, শেরপুরে ৫০, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২০, লক্ষ্মীপুরে দুই পুলিশ সদস্যসহ ২৫, চাঁদপুরে পুলিশসহ ২০, জামালপুরে ২৪, মাগুরায় ১০, শ্রীপুরে ৫ জনসহ সারাদেশে দুই শতাধিক আহত হয়েছেন।
পাবনা : ভোট গ্রহণ শেষে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে চাটমোহর উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ফল ঘোষণায় দেরি করছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আলমগীর হোসেন। একে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এলাকাবাসী। এ সময় তারা রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি গাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গুলি বর্ষণ করে। এতে গুলিবিদ্ধ হন বেশ কয়েকজন। তাদের মধ্যে এমদাদ হোসেন ইন্দাকে (৬০) উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহত এমদাদ একজন তালা-চাবি মেরামতকারী।
চাটমোহর থানার ওসি সুব্রত কুমার দাস জানান, এক মেম্বার প্রার্থী পুনরায় ভোট গণনার দাবিতে প্রিসাইডিং অফিসারকে চাপ দেন। তিনি দাবি না মানায় মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকরা সড়ক অবরোধ করে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি ছুঁড়লে একজন নিহত হন।
চট্টগ্রাম :ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের একখুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুপুর ২টার দিকে সরকারি দলের প্রার্থীর সমর্থকরা জোর করে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে সিল মারতে গেলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকরা বাধা দেয়। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় পুলিশ গুলি চালালে দৌড়ে পালাতে গিয়ে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ইদ্রিচ মিয়া নামে এক ব্যক্তি মারা যান। এ ছাড়া পুলিশের গুলিতে আরাফাত, হোসনে আরা বেগম, মোহছেনা বেগম গুলিবিদ্ধ হন। একই সময় হরুয়ালছড়ি ইউনিয়নে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শামসুল আলম গুলিবদ্ধ হয়েছেন বলে জানা গেছে। এদিকে প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ এনে তিন ইউনিয়নের সরকারদলীয় প্রার্থীরা ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। তারা হলেন পাইন্দং ইউনিয়নের শাহ আলম সিকদার, কাঞ্চন নগর ইউনিয়নের দিদারুল আলম ও হারুয়ালছড়ির জুলফিকার আলী ভুট্টো।
বান্দরবান :লামা উপজেলার আজিজনগর, লামা সদর ও ফাইতং ইউনিয়ন, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছড়ি ইউনিয়নে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হয়েছে।
কুমিল্লা : সদর উপজেলার আদর্শ সদর, কালীবাজার, জগন্নাথপুর ইউনিয়ন; লাকসাম উপজেলার আসগরা ইউনিয়ন; বুড়িচংয়ের রাজাপুর ইউনিয়ন সংঘর্ষে অন্তত ৩৬ জন আহত হয়েছেন। কারচুপির অভিযোগ এনে সদরের কালীবাজার ইউনিয়নের বিএনপি প্রার্থী আলী হোসেন ও লাকসাম উপজেলার লাকসাম পূর্ব ইউনিয়নের বিএনপি প্রার্থী নুরুন্নবী চৌধুরী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে বুড়িচং উপজেলার জগতপুর ভোটকেন্দ্রে এক প্রার্থীর পক্ষে ব্যালট পেপারে সিল মারার অভিযোগে দুই সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
শেরপুর : সদর উপজেলার চরমুচারিয়া ইউনিয়নের লতারিয়া, চরপক্ষিমারী ইউনিয়নের জঙ্গলদি, কুলুরচর, বেপারিপাড়া, চরশেরপুর ইউনিয়নের হেরুয়া-বালুরঘাট, চরশেরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কামারের চর ইউনিয়নের সাহান্ধীরচর উত্তর, ৭নং চর, নয়াপাড়া এবং বলায়েরচর ইউনিয়নের পাইকুরা কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী এবং মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছে অর্ধশত।
চাঁদপুর : ফরিদগঞ্জ উপজেলার রূপসা উত্তর ইউনিয়নে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। বালিথুবা পশ্চিম ইউনিয়নের লোহাগড়া কেন্দ্রে সংঘর্ষের সময় হাসান তারেক নামে এক পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়। সুবিদপুর ইউনিয়নের শোল্লা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে দু’পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় আহত হয়েছে ৫ জন। এদিকে পাইকপাড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের শাহাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে তিনটি পিস্তল, দেশি অস্ত্র ও দুুটি মাইক্রোবাসসহ আওয়ামী লীগের প্রার্থী শওকত বিএসসির ১১ সমর্থককে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া : নবীনগর উপজেলার পশ্চিম ইউপি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ২০ জন আহত হয়। সংঘর্ষের ঘটনায় এই ইউনিয়নের বিএনপি প্রার্থীর ভাই মো. মলাই মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। শিবপুর, বড়িকান্দি, জিনদপুর, রতনপুর, নবীনগর পশ্চিম ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী এবং বড়াইল ইউনিয়নে জাসদের প্রার্থী দুপুর ১২টার দিকে কারচুপির অভিযোগ এনে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।
লক্ষ্মীপুর :রামগঞ্জের ইছাপুর ইউনিয়নের সৌন্দরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে দুপুরে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে এসআই সেলিম উদ্দিন ও কনস্টেবল সফি উল্যাহ গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন ১৫ জন। এ ছাড়া বিভিন্ন কেন্দ্রে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে আরও ১০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
জামালপুর :ইসলামপুর উপজেলার গাইবান্ধা ইউনিয়নের পোড়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে সাতজন আহত হয়। একই ইউনিয়নের মরাকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে দশজন আহত হয়। চরপুঁটিমারি ইউনিয়নের আখড়াখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মেম্বার প্রার্থী কল্পনা বেগম ও আলকাছ আলীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ সাতজন আহত হয়।
নারায়ণগঞ্জ : রূপগঞ্জ উপজেলার ভোলাব ইউনিয়নের চারিতালুক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে পুলিশ সদস্য আনিছুর রহমান ও আরিফ হোসেনসহ অন্তত ১২ জন আহত হয়েছে। গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের আধুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের চেষ্টাকালে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় সেলিম মিয়া নামে এক পুলিশ সদস্য আহত হন। একই ইউনিয়নের দড়িকান্দি এলাকায় দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে ৫ জন আহত হয়েছে। উলি্লখিত ঘটনায় পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনকে আটক করেছে।
মাগুরা :শ্রীপুর উপজেলার ৮ নম্বর নাকোল ইউনিয়নের রায়নগর ভোটকেন্দ্রে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হলে পাঁচজন আহত হয়। ২ নম্বর আমলসার ইউনিয়নে রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। ৪ নম্বর শ্রীপুর ইউনিয়নের হাট-দারিয়াপুর কেন্দ্রে দুই মেম্বার প্রার্থীর সর্মথকদের মধ্যে সংঘর্ষে ৫ জন আহত হয়েছে।
এদিকে সুনামগঞ্জের সদর উপজেলার কোরবান নগর ইউনিয়নের এক কেন্দ্রে একজন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারকে মারধর করেছে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকরা। এ ছাড়া নাটোর, সিরাজগঞ্জ, নোয়াখালী, বগুড়ার ধুনট, জয়পুরহাটের পাঁচবিবি ও টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে জাল ভোট, কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেওয়া ও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।


