বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

বাম্পার ফলনেও হাসি নেই কৃষকের মুখে

untitled-4_209291মাঠে-ঘাটে-উঠানে সোনালি ধান। বোরো ধানের ফলন এবার সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। শ্রমে-ঘামে ফলানো ফসল দেখে কৃষকের মুখেও হাসি ফুটেছিল। কিন্তু বাজারে গিয়ে মাঠের খুশি হারিয়ে যাচ্ছে তাদের। এবারও ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না তারা। তাই এক কোটি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মুখ ম্লান। সরকারি হিসাবেই মণপ্রতি ধানের উৎপাদন খরচ এবার ৯২০ টাকার মতো, প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২২ টাকা। কিন্তু কৃষকদের ধান বেচতে হচ্ছে ৯ থেকে ১১ টাকা কেজি দরে। প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে কৃষককে লোকসান দিতে হচ্ছে প্রায় ১০ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি ধানের দাম কমেছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা মণ দরে।

১ মে থেকে অবশ্য বোরো ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হবে। চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। সরকার এ বছর ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছে প্রতি কেজি ধান ২৩ টাকা আর চাল ৩২ টাকা। কৃষক সে মূল্য পাবেন কি-না, তা নিয়ে প্রতি বছরের মতো এ বছরও রয়েছে সংশয়। কৃষিশুমারি অনুযায়ী, দেশে এক কোটি ৪৫ লাখ কৃষকের কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড রয়েছে। সরকার দুই কোটি ৩০ লাখ কৃষকের ডাটাবেজ তৈরি করেছে। এর মধ্যে এক কোটি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘সাধারণত বছরের শুরুতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক বিক্রি করে কৃষি উপকরণের দাম শোধ করে থাকেন। যখন দাম কম থাকে তখনই তাদের ধান বিক্রি করে দিতে হয়। বছরের শেষ দিকে গোলার ফসল শেষ হলে আবার বাজার থেকে চাল কিনে খান তারা। তখন চালের দাম সবচেয়ে বেশি থাকে।’ ধানের দরপতনে ওই এক কোটি ক্ষুদ্র কৃষক ও তাদের পরিবারের পাঁচ কোটি সদস্য বিপদে পড়েছেন।

দরপতনের কারণ: মৌসুমের শুরুতেই এই দরপতনের একটি কারণ, চালকল মালিক ও সরকারি গুদামে ধান কেনা হচ্ছে না। কেননা ব্যাংকগুলো ধান কেনার জন্য চালকল মালিকদের টাকা দিচ্ছে না। অনেক কৃষক মনে করছেন, পুরোদমে ধান কাটা শুরু হলে ধানের দাম আরও পড়ে যেতে পারে। বাজারে ধানের দাম কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ, চালের অতিরিক্ত সরবরাহ। বাজারে রয়েছে প্রচুর ভারতীয় চাল। নতুন ধান উঠতে শুরু করায় চালের দামও কমছে। রাজধানীতে গত এক সপ্তাহে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে এক থেকে দুই টাকা করে কমেছে।

ফড়িয়ারা গুজব ছড়াচ্ছে: চালকল ও সরকারি গুদামে ধান কেনা শুরু না হওয়ায় পুরো ধানের বাজার এখন ফড়িয়াদের কব্জায়। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কমে গ্রামে-গঞ্জে কৃষকের ধান কিনছে তারা। বড় ও সচ্ছল কৃষকরা ধান না বেচে মজুদ করে রাখছেন। কিন্তু ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা ঋণের টাকা শোধ করতে পানির দরেই ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফড়িয়ারা বাজারে নানা গুজবও ছড়াচ্ছে। বলছে, সরকার ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে বেশি চাল কেনায় গুদামে জায়গা না থাকায় এবার বেশি পরিমাণে ধান-চাল কিনতে পারবে না। তাদের কাছে বেচে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

সরকারি লক্ষ্যমাত্রা: বাম্পার ফলনে চলতি মৌসুমে ৪৭ লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় এক কোটি ৮১ লাখ টন খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি বছর সরকারিভাবে সাত লাখ টন ধান ও ছয় লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, এবার কৃষক পর্যায়ে ধানের উৎপাদন খরচ পড়বে ২০.৭০ ও চালের খরচ পড়বে ২৯ টাকা। কৃষক পর্যায়ে ধানের দাম গত বছরের চেয়ে এবার কেজিতে এক টাকা বাড়লেও সরকার চাল কিনবে গতবারের সমান দামে। তিনি বলেন, এবারই প্রথমবারের মতো কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে চালের চেয়ে বেশি ধান কেনা হবে।

সুনামগঞ্জে লোকসান প্রতি একরে সাড়ে ১৭ হাজার টাকা :সুনামগঞ্জের ১৩৮টি হাওরে এবার দুই লাখ একুশ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল চালে আট লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন। টাকার অঙ্কে এই চালের মূল্য দুই হাজার আটশ’ কোটি টাকা। মনের দরদে ধান কেটে ঘরে তুলে বিপদে পড়েছেন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকরা। ধর্মপাশার কৃষক নেতা কৃষক সংগ্রাম সমিতির কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বলেন, ‘এক একর জমি চাষাবাদ করতে সেচের জন্যই খরচ হয় কমপক্ষে ৭০০০ টাকা। মজুরি বাবদ লাগে ৩৫০০ টাকা। সার ও বীজ বাবদ লাগে কমপক্ষে ৩০০০ টাকা। অর্থাৎ উৎপাদন খরচ সাড়ে ১৩ হাজার টাকা। এবার চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে হাওরে পানি ঢুকতে শুরু হওয়ায় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মজুরি দিয়ে ধান কাটতে হয়েছে। তাতে প্রতি একর জমির ধান কাটতে ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। এরপর ওই কাটা ধান হাওরের জমি থেকে খলায় (ধান মাড়াইস্থল) আনতে একরপ্রতি দুই হাজার পাঁচশ’ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পরে ধানের মাড়াই বাবদ খরচ হয়েছে আরও প্রায় দুই হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এবার একরপ্রতি খরচ হয়েছে ২৭ থেকে সাড়ে ২৭ হাজার টাকা। প্রতি একর জমিতে ধান উৎপাদন হয় ৬০ মণ। এই অবস্থায় ধানের ব্যাপারি ও ফড়িয়াদের কপাল খুলেছে। তারা প্রতি মণ ধান সাড়ে তিনশ’ থেকে চারশ’ টাকার বেশি দামে কিনছে না। কৃষকরা বাধ্য হয়ে ওই দামেই বিক্রি করছেন ধান।

কিশোরগঞ্জে দাম কম, ফসলও তলিয়ে গেছে: কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলসহ জেলার ১৩ উপজেলায়ও ধানের দাম ক্রমেই কমছে। তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে অর্ধেক ধান দিয়ে দিতে হচ্ছে শ্রমিকদের। ধানের দাম না থাকায় কৃষি শ্রমিকরাও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। বাজারে নতুন বোরো ধান ৪৬০ থেকে ৪৮০, চিকন ধান সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ইটনার শিমুলকান্দি গ্রামের কৃষক ইমান আলী জানান, তার আড়াই একর জমিতে ২০০ মণ ধান হয়েছে। কিন্তু ধান কাটার মাত্র তিন দিন আগেই ক্ষেতে পানি ঢুকে পাকা ধান তলিয়ে যায়। তার উৎপাদন ব্যয় এক লাখ ৪০ হাজার টাকা। বাজারে ধানের দাম প্রতি মণ ৪৮০ টাকা। তিনি ধান বিক্রি করে পাচ্ছেন ৩৮ হাজার ৪০০ টাকা। ধান চাষে তার ক্ষতি এক লাখ ১২ হাজার ৬০০ টাকা।

নেত্রকোনায় দাম কম, আছে মহাজন:  অকাল বন্যা, শিলাবৃষ্টিসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নেত্রকোনায় এবার বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তার ওপর উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নেই। জেলার ভাটি অঞ্চল খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ ও মদনে ধান কাটা শুরু হয়েছে ২০-২৫ দিন আগে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। সদর উপজেলার বাঘরুয়া গ্রামের কৃষক শাহ এমরান ফকির ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘৫০ কাঠা জমি লাগাইছিলাম। খরচ অইছিল ৬০ হাজার টাকার মতো। ধান কাটা শুরু করছি। হুনতাছি সরকার ২৩ টাকা কেজি দরে ধান কিনব। এই দাম কি আমরা পাইবাম? ‘

জেলার খালিয়াজুরী গ্রামের কৃষক রতন সরকার বলেন, ‘সরকার ধানের দাম দিছে হুনছি, আমরা ওই ধানের ধাম পাইতাম না। ধান রোওনের (রোপণ) আগে মহাজনের কাছ থাইক্যা ২০ হাজার টাকা দাদন নিয়ে ৩০ কাটা জমি লাগাইছলাম। আমার ক্ষেতে যে ধান অইছে তার বেশিরভাগই দেওন লাগব হেরে। তার ওপর ধানের ধামত নাই।’ প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন সুনামগঞ্জ থেকে পঙ্কজ দে, কিশোরগঞ্জ থেকে সাইফুল হক মোল্লা দুলু ও নেত্রকোনা থেকে খলিলুর রহমান শেখ

আরও পড়ুন