বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ইস্যুর ভিড়ে তনু কি হারিয়ে গেল

tonu--মানিক মুনতাসির।

একজন সংবাদকর্মী হিসেবে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি খবরের পেছনে ছুটি। পথ-ঘাট, বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালত সবখানেই খবরের গন্ধ খুঁজি। আবার মাঝে মাঝে খবরের গন্ধই আপনা-আপনি নাকে এসে খোঁচা মারে। তখন আর খোঁজারও প্রয়োজন পড়ে না। চারিদিকে খবর।

একটা সময় ছিল সড়ক দূর্ঘটনায় আহত হলেই সে খবর পত্রিকায় ছাপা হতো। এখন আর সে সময় নেই। সব নিহতের খবর ছাপানোও সম্ভব হয় না। এখন সড়ক দূর্ঘটনায় প্রাণহানি হলেও প্রশ্ন চলে আসে কতজন মারা গেছে। এরপর সিদ্ধান্ত হয় সে খবর পত্রিকার কোন জায়গায় স্থান পাবে। পত্রিকায় ছাপানোর জন্য বিবেচনা করা হয় কোন খবরটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ খবর। সময় আর চাহিদার সঙ্গে পাল্টেছে এসব। এছাড়া মারামারি বা গোলাগুলি, ক্যাম্পাসে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এসব খবর গুরুত্ব পেলেও তনু হত্যার মতো ঘটনাও পত্রিকার পাতায় স্থান পায়। তাইতো তনু হত্যার খবর প্রকাশ হওয়ার প্রথমদিন কয়েকটা পত্রিকা তা গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছিল, সেটা আমাদের সবার জানা।

এবার আসি আসল কথায়। দেশের প্রথম সারির একটি পত্রিকার গত ২৭ এপ্রিলের প্রধান শিরোনাম ছিল ১৪ মাসে ৩৪ হামলা। নিহত ৩৫, আহত ১২৯। এসব হামলা শুধুমাত্র জঙ্গীগোষ্ঠীর। এর বাইরে আলোচ্য সময়ে অন্য ঘটনায় আরো কতজন মারা গেছে তার হিসাব হয়তো সরকারের কাছেও নেই। তবে বিরোধী দলের কাছে হিসাবটা থাকা বাঞ্চনীয়। কিন্তু বর্তমান প্রধান এবং দ্বিতীয় বিরোধী দলের যে দৈন্যদশা তাতে তাদের কাছেও সে পরিসংখ্যান নেই। কারণ তারা নিজেদেরই হিসাব রাখতে পারে না। মানুষও খুব দ্রুত এসব ভুলে যায়। কারণ ইস্যুর কোন অভাব নেই।

দেখা গেল যে, সকালে হয়তো একজন সন্ত্রাসী হামলায় নিহত। বিকালে অন্য এক ঘটনায় জানা গেল- কাউকে ধর্ষণের পর হত্যা। আবার রাতে হয়তো খবর পাওয়া গেল- কুপিয়ে হত্যার। এর কোনটা মনে রাখবে মানুষ। গত দুই মাসে কতটা ঘটনা ঘটেছে সে হিসাব হয়তো আমার কাছেও নেই।

তবে বড় ঘটনার মধ্যে যদি বলি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা, কুমিল্লার শিক্ষার্থী তনু হত্যাকান্ড, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হত্যাকান্ড, কলাবাগানে ডাবল মার্ডার। গত দেড় দুই মাসের ব্যবধানে এতসব বড় বড় ঘটনা। শুধু দেড় দুই মাসই নয়, প্রতিনিয়তই ঘটেছে বড় বড় অঘটন। একটার রেশ কাটতে না কাটতেই সামনে চলে আসে আরেকটি বড় ঘটনা। যা আসলেই অসহনীয়। একটা ঘটনা বাধ্য করছে আরেকটি ঘটনাকে ভুলে যেতে। আমরা হয়ে যাচ্ছি ঘটনার সাময়িক দর্শক। এখন তো স্বজন হারানো প্রিয়জনের চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে। খুন ধর্ষনের ঘটনাও কাঁদায় না। মানুষের মন হয়ে যাচ্ছে পাথরের মত শক্ত আর কঠিন। যে কোন ঘটনায় সহজেই আর কাঁদতে পারছে না মানুষ। শুধুমাত্র সাময়িক আফসোস। আর মনোকষ্ট। বড় জোর মানববন্ধন। তবে একটা জায়গায় প্রতিবাদ হয় দারুণভাবে, সেটা হলো ফেসবুকে। এখানে সবাই প্রতিবাদী। প্রতিবাদী তো নয় যেন বিপ্লববাদী।

যাহোক, এবার কুমিল্লার সেই সোহাগী জাহান তনুর কথায় আসা যাক। ঘটরার প্রথম দিন গুরুত্ব না পেলেও দু-তিনদিন পর থেকে দুই সপ্তাহ গণমাধ্যমে বেশ কভারেজ পেয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এর ব্যবহারকারীরা ছিলেন সরব। কিন্তু সেই তনুকে যে এখন আমরা ভুলে গেছি। এর সাক্ষাৎ প্রমাণ তনুকে নিয়ে এখন আর কোন মিছিল-সমাবেশ বা কোন প্রতিবাদী কর্মসূচী নেই।

হত্যার এক মাস পেরিয়ে গেলেও এ হত্যার রহস্য এখনও উন্মোচিত হয়নি। এমন কী, প্রথম দফা ফরেনসিক পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামতও মেলেনি। যথেষ্ট সংশয় সৃষ্টি হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনে যে, তনু আদৌ ধর্ষিত হয়েছে কি না। এ প্রেক্ষিতে ‘তনুকে হত্যা করা হয়েছে’ না কি ‘সে আত্মহত্যা করেছে’ -সেটাও এখন জনমনে অনেক বড় প্রশ্ন। আসলে তনুর ভাগ্যে কী হয়েছিল? সেটা অভাগা তনুই ভাল জানে। হয়তো মহান সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ জানে না। জানলেও হয়তো কেউ মুখও খুলবে না। যে কোন হত্যার বিচার হওয়ার আগে প্রকৃত হত্যাকারী চিহ্নিত হওয়া বাঞ্চনীয়। তনুর ক্ষেত্রে এমনটাই হবে বলে মানুষ এখনও বিশ্বাস করে।

চোখের পলকেই ঘটছে নিত্য নতুন ঘটনা। প্রিয়জনের চোখেল জল শুকিয়ে যাওয়ার আগেই আরেক প্রিয়জনের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে বাংলার মাটিতে। প্রিয়জনের অশ্রুতে সিক্ত হচ্ছে গ্রীস্মের খরতাপের চৌচির মাটি। কিন্তু ঠান্ডা হয় না প্রিয়জন হারানো মন। থেমে থাকে না খুনির রক্তমাখা হাত। হবেই বা কেন? না আছে অপরাধীর শাস্তি; আর না আছে খুনীর কোন বিচার। দিনে-দুপুরে খুন করে অস্ত্র উঁচিয়ে পালিয়ে যায় সন্ত্রাসী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায় খুনির দল।

এবার অন্য একটি প্রসঙ্গে আসা যাক। আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে খুন, ধর্ষণ, হত্যা আর গুমসহ এ ধরনের সব ঘটনা যত তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়া যায় তাই ভাল। আমার এ কথায় হয়তো অনেকেই রাগ করতে পারেন। কিন্তু এর সপক্ষে আমার যুক্তি শুনলে অনেকেই একমত হবেন আশা করি। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় যেসব খরর ছাপা হয়, এর অর্ধেকেরও বেশি থাকে খারাপ খবর। এমন কী কোন কোন ক্ষেত্রে ৫০ ভাগেরও বেশি নেগেটিভ খবর থাকে পত্রিকার পাতায়। আর টেলিভিশনের অবস্থাই প্রায় একই রকম। আর থাকবেই বা না কেন? পজেটিভ ঘটনা তো নেই। মনুষত্ব নেই। মানুষের মনুষত্ব লোপ পাচ্ছে প্রতি মুহুর্তেই। ফলে হাতেগোনা কিছু পজেটিভ ঘটনা থাকলেও -তা মানুষের মনে দাগ কাটে না। পত্রিকার কাটতির কথা না হয় নাইবা বললাম।

এবার আমার যুক্তিতে আসি। আপনার-আমার বাসায় যে পত্রিকাটি হকার রোজ সকালে দিয়ে যায় সেটা নিশ্চয় আমরা কেউ একা পড়ি না। বাসার অন্য সদস্যরাও তা পড়েন। এমন কী শিশুরাও তো পড়ে। তাহলে শিশুরা কী শিখছে, আর কী দেখছে? প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় বড় বড় হেড লাইনে যখন হত্যা, ধর্ষণ, খুন, গুম, প্রিয়জন হারানোর শোকার্ত মা-বোনের ছবি আর খবর পড়ছে, দেখছে আপনার-আমার সন্তান। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান। তারা সেখান থেকে কী শিখছে? দেশ আর দেশের শাসন, বিচার, আইন ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের ধারণাই বা কী হচ্ছে। বড় হলে তারা কী করবে -এ নিয়ে নিশ্চই অভিভাবকমহল উদ্বিগ্ন।

এবার শেষ কথায় আসি। আসুন না আমরা তনু, দীপণ, অভিজিৎ, হুমায়ুন আজাদ, প্রফেসর গোপাল কৃঞ্চ মুহুরী, আইভি রহমান, প্রফেসর রেজাউল করিম সিদ্দিকীর কথা ভুলে যাই। তবে বিচারের আগে নয়। বিচার পর্যন্ত মনে রাখি। সুষ্ঠু বিচারের পর বেমালুম ভুলে যাই। তাতে তনুদের আত্মাও শান্তি পাবে। কিন্তু বিচার না হলে যে তারাও আমাদের পথ আগলে ধরবে। যদি আমরা পরকাল আর পরজগতকে বিশ্বাস করি।

মানিক মুনতাসির: সাংবাদিক

আরও পড়ুন