ছাত্রীকে যৌন হয়রানির মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহফুজুর রশিদ ফেরদৌসকে ২ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। বুধবার বিকেল পৌনে ৪টার দিকে সাত দিনের পুলিশের করা রিমান্ড আবেদনের শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দেলোয়ার হোসেন এ আদেশ দেন আদালত।
অন্যদিকে তার রিমান্ড আবেদন বাতিল পূর্বক আসামির জামিন চেয়ে শুনানি করেন ঢাকা বারের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট কাজী নজিবুল্লাহ হিরু। তিনি আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগকে বায়বীয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
অপরদিকে রিমান্ড আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির পক্ষে অ্যাডভোকেট ফাহমিদা আক্তার (রিঙ্কি)। তিনি আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে দাবি করে এ পর্যায়ে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া আবশ্যক, অন্যথায় মামলার তদন্ডে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। শুনানি শেষে বিচারক আসামির আইনজীবীর আবেদন নাকচ করে ২ দিনের ওই রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে মঙ্গলবার (৩ মে) ভোরে ছাত্রীদের ‘যৌন নিপীড়ন’র অভিযোগে রাজধানীর হলি ফ্যামিল রেড ক্রিসেন্ট এলাকার নিজ বাসা থেকে ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে কলাবাগান থানা পুলিশ। এর পর বুধবার (৪ মে) দুপুরে তাকে ঢাকা চিপ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) কোর্টে হাজির করে ৭ দিনের রিমান আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
গত শনিবার (৩০ এপ্রিল) যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে ক্লাস বর্জন করে আন্দোলন শুরু করে আহসান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আকস্মিক আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়। তৎক্ষণাৎ বৈঠকে বসে অভিযুক্ত শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কর্তৃপক্ষের ঘোষণাকে প্রত্যাখান করে চার দফা দাবি নিয়ে আন্দোলন করে আসছে শিক্ষার্থীরা।
বেশ কয়েক বছর ধরে মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ করে আসছিলেন নিপীড়নের শিকার শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকের দাপটে সব মিলিয়ে যাচ্ছিল। নিপীড়নের শিকার ছাত্রীদের বেদনা অব্যক্তই থেকে যায়। তবে শেষ রক্ষা হল না দাপুটে শিক্ষক মাহফুজুর রশিদ ফেরদৌসের।
ত্রী-সন্তানসহ পরিবার নিয়ে হলি ফ্যামিল রেড ক্রিসেন্ট এলাকার একটি ফ্ল্যাটে থাকেন যৌন হয়রানির দায়ে অভিযুক্ত মাহফুজ। আরেকটি ফ্ল্যাট রাজধানীর পান্থপথ আবাসিক এলাকায়। প্যরাডাইস সুইটসের পাশে শ্বশুরের কাছ থেকে উপহার পাওয়া ওই ফ্ল্যাটে শিক্ষার্থীদের ব্ল্যাকমেইল করে এনে জোরপূর্বক যৌন হয়রানি করে আসছিলেন।
মাহফুজের ব্ল্যাকমেইল করার পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পড়া বোঝানোর নামে শিক্ষার্থীদের ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতেন। দ্বিমত করলে শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেয়া হত। ফলাফল সেমিস্টার ড্রপ আউট।
প্রাথমিক এ প্রস্তাবে শিক্ষার্থী সায় না দিলে অর্থাৎ পান্থপথের ফ্ল্যাটে যেতে অস্বীকৃতি জানালে বশে আনতে শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন মাহফুজুর রশিদ ফেরদৌস। চেষ্টা করতেন শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের ম্যানেজ করতে।
মাহফুজের ব্ল্যাকমেইলের পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা আরো জানান, ফ্ল্যাটে ডেকে কৌশলে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে তিনি (শিক্ষক) তার অফিসিয়াল নম্বরে আজেবাজে ম্যাসেজ পাঠিয়ে রাখতেন, যা দিয়ে পরবর্তীতে তাদের ফাঁদে ফেলতেন।
নানা কৌশল অবলম্বন করে মাহফুজুর রশিদ শিক্ষার্থীদের বাধ্য করতেন পান্থপথের ফ্ল্যাটে নিয়ে যেতে। সেখানে নিয়ে যৌন নিপিড়ন এবং শারীরিক নির্যাতন করতেন। এ কৌশলে অসংখ্য ছাত্রীর সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছেন লম্পট ওই শিক্ষক। কথা না শুনলে ভার্সিটিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর চরিত্র নিয়ে কুৎসা রটানোর হুমকিও দিতেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের মোবাইলে নিজের ন্যুড পিক পাঠানো ছিল ওই শিক্ষকের কাছে অতি সহজ একটা ব্যাপার। আজেবাজে টেক্সটিং, যা হরহামেশাই পাঠানো হত।
অবশেষে সব ভয়, লজ্জা ভেঙে সতীর্থদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদ গড়ে তোলেন ভুক্তভোগীরা। সবাই একসঙ্গে আন্দোলন শুরু করেন। তীব্র আন্দোলনের তোপে মুখ খুলতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। ক্যাম্পাসের চৌহদ্দিতে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয় মাহফুজকে। অভিযোগ পাঠানো হয় হাইকোর্ট কর্তৃক যৌন নির্যাতন ও যৌন হয়রানি বন্ধে গঠিত কমিটিতেও।
উল্লেখ্য, ওই লম্পট শিক্ষক আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর এবং ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।


