বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

চির-নূতনেরে দিল ডাক পঁচিশে বৈশাখ

untitled-3_210845‘তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদঘাটন/সূর্যের মতন।/রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন।/উদয়দিগন্তে ওই শুভ্র শঙ্খ বাজে।/মোর চিত্তমাঝে/চির-নূতনেরে দিল ডাক/পঁচিশে বৈশাখ’- এভাবে চির-নতুনের মধ্যে নিজের আবির্ভাবক্ষণকে অনুভব করেছেন কবিশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। চেয়েছেন সূর্যের দীপ্তি দিয়ে ভুবনকে আলোকিত করতে, নিজেকে উন্মোচন করতে। আমৃত্যু কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে ধাবমান রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছেন হাজার বছরের পথিকৃৎ বাঙালি। তার কাব্যছন্দ, সুরের ডালা আর সরল লেখনীর মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে প্রত্যেক বাঙালির। এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে তিনি প্রেরণা দিয়েছেন আমাদের। মুক্ত স্বদেশে এসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম ভাষণেই মনে করেছিলেন তাকে, অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেছিলেন, ‘কবিগুরু, তুমি এসে দেখে যাও, তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে…।’

আজ রোববার, আজ পঁচিশে বৈশাখ। সেই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৫তম জয়ন্তী আজ। কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িতে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জমিদার পরিবারের ঐতিহ্যকে অতিক্রম করে তিনি তার জীবনব্যাপ্ত কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে পেঁৗছেন শান্তিনিকেতনে। মা সারদাসুন্দরী দেবী এবং বাবা বিখ্যাত জমিদার ও ব্রাহ্ম ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোল আলো করে পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আসেন বঙ্গাব্দে। সারা জীবনই যার কামনা ছিল, ‘যা পেয়েছি প্রথম দিনে তাই যেন পাই শেষে/দু হাত দিয়ে বিশ্বরে ছুঁই শিশুর মতো হেসে।’ তার বাণীর ঐশ্বর্যে, ভাষার নৈপুণ্যে ও মানবিক মাঙ্গলিকতার বোধে এখনও আমাদের শিশুর মতোই ছুঁয়ে যান তিনি, মোহিত করেন, আনন্দিত করেন, উদ্বুদ্ধ করেন।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে রবীন্দ্রনাথ পেঁৗছে দিয়েছেন বিকাশের চূড়ান্ত সোপানে। ‘গীতাঞ্জলি’ রচনা করে ১৯১৩ সালে তিনি নিয়ে আসেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। উর্বর করেছেন তিনি চিত্রকলাকে আধুনিকতার ধারণা দিয়ে। নোবেল পুরস্কারের অর্থ দিয়ে তিনি এ দেশে শাহজাদপুরের দরিদ্র কৃষকদের ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন কৃষি ব্যাংক। গড়ে তোলেন শান্তিনিকেতন। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসেন তিনি। পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকারের ‘নাইটহুড’ উপাধি ত্যাগ করেন। এভাবে বার বার সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্মতার ঘোষণা দিয়েছেন সমাজসচেতন রবীন্দ্রনাথ। তিনি একমাত্র গীতিকবি যার রচিত ভিন্ন ভিন্ন সঙ্গীত ভিন্ন দুটি দেশে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গীত হয়। তার রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ ও ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’- গান দুটি যথাক্রমে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সঙ্গীত।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জয়ন্তী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন।

কর্মসূচি: রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ে কবির স্মৃতিধন্য শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর ও দক্ষিণ ডিহি-পিঠাভোগে উদযাপিত হচ্ছে সরকারি আয়োজনে নানা অনুষ্ঠান। রাজধানীতেও সরকারি উদ্যোগ ছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করবে। দৈনিক পত্রিকাগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। সরকারি-বেসরকারি চ্যানেলগুলো প্রচার করবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা।

রবীন্দ্রজয়ন্তীর সরকারি মূল অনুষ্ঠান হচ্ছে ঢাকায়। আজ বিকেলে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করবেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এতে ‘একুশ শতকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাসঙ্গিকতা’ শীর্ষক স্মারক বক্তব্য রাখবেন অধ্যাপক সনৎকুমার সাহা।

রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে ছায়ানটের আয়োজনে গতকাল শনিবার থেকেই শুরু হয়েছে দুই দিনের রবীন্দ্র উৎসব। তেজগাঁওয়ে চ্যানেল আই ভবনে আয়োজন করা হয়েছে ‘এবি ব্যাংক-চ্যানেল আই রবীন্দ্রমেলা’। বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে মেলা চলবে একটানা রাত ৮টা পর্যন্ত। এবারের মেলায় এবি ব্যাংক-চ্যানেল আই রবীন্দ্রমেলায় আজীবন সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও সঙ্গীতশিল্পী তপন মাহমুদকে।

সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা। এ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হবে সংগঠনটির পাঁচ দিনের রবীন্দ্র উৎসব। শিল্পকলা একাডেমিতেও রয়েছে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানমালা।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *