বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে তোলপাড়: ‘মোসাদ’ ইস্যুতে ক্ষোভ আসলামকে তলব

indexবিএনপি ক্রমেই জটিল ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে। দলটিতে পদ ও মনোনয়ন বাণিজ্য এখন রমরমা। আর এর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড সোচ্চার হয়েছেন দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা প্রায় একযোগে ওই বাণিজ্যের অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। অনেকেই এ ঘটনাকে সিনিয়র নেতাদের এক রকম বিদ্রোহ বলে মনে করছেন। ঘটনার আকস্মিকতায় প্রচণ্ড বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত না নেওয়া হলেও বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখছেন বলে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে।

একপর্যায়ে দিল্লিতে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এক এজেন্টের সঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর বৈঠক বিষয়ে আলোচনা হয়। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদসহ সিনিয়র কয়েকজন নেতা বলেন, এ ঘটনায় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত। লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান একে আরেকটি তাইওয়ান ঘটনার পুনরাবৃত্তি বলে উল্লেখ করেন। খালেদা জিয়া এসব বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, আসলাম চৌধুরীকে ডেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। পরে তাঁকে চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে তলব করে ওই বৈঠক বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।

সূত্র মতে, বৈঠকে উপস্থিত স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বিএনপিতে পদ ও মনোনয়ন বাণিজ্য বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি তুলে বলেছেন, ‘সততার প্রতীক জিয়াউর রহমানের দল এখন ডুবন্ত জাহাজ। আমি এ জাহাজের একজন যাত্রী।’ খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে এ জাহাজকে রক্ষার দায়িত্ব আপনার। শ্যুট দেম; আপনি তাদের দল থেকে বের করে দেন।’

সূত্র মতে, মাহবুবের এই দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদও বলেন, ‘হ্যাঁ মাডাম, শ্যুট দেম। আপনি নিজে তদন্ত করে তাদেরকে দল থেকে বের করে দেবেন। জিয়াউর রহমানের দল এভাবে চলতে পারে না।’ মওদুদ আরো বলেন, ‘আমরা এমনিতেই অত্যন্ত নাজুক অবস্থার মধ্যে আছি। এ অবস্থায় এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো ভয়ংকর হবে।’

সূত্র মতে, বৈঠকের একপর্যায়ে স্থায়ী কমিটির দু-একজন সদস্য ছাড়া প্রায় সবাই পদ ও মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলেন। খালেদা জিয়া একপর্যায়ে বলেন, ‘আমি কিছু কিছু জানি।’ তবে সরকারের লোকেরা এসব পত্রপত্রিকায় লেখাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, সরকারের এজেন্টরা এসব করাচ্ছে। স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য তখন দলের ওই এজেন্টদের খুঁজে বের করার দাবি তোলেন।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা জানান, একমাত্র গয়েশ্বর চন্দ্র রায় তদন্ত কমিটি গঠনের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে সাংবাদিকরা আরো বেশি লেখার সুযোগ পাবেন। তদন্তে একজনের কথা উঠে এলে লেখা হবে ১০ জনের কথা। সূত্র মতে, এ পর্যায়ে গয়েশ্বরকে থামিয়ে দিয়ে মওদুদ আহমদ বলেন, ‘তুমি ওদের ডিফেন্ড করো না। এতে দলের ক্ষতি হবে।’ আলোচনার এ পর্যায়ে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এসব নিয়ে এরই মধ্যে দলের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেছে।

জানতে চাইলে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমি তদন্ত কমিটি গঠনের পক্ষেও ছিলাম না, বিপক্ষেও ছিলাম না।’ তাঁর মতে, ‘তদন্ত কমিটি গঠনের ব্যাপারে যাঁরা জোর দিয়েছেন, তাঁরাই বাইরে ছড়াচ্ছেন আমি বিরোধিতা করেছি বলে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্থায়ী কমিটির বৈঠকের ব্যাপারে বাইরে কথা বলায় নিষেধ আছে। জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির অন্য সদস্যরাও কথা বলতে রাজি হননি। মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমি আমার মতামত দলীয় ফোরামের আলোচনায় দিয়েছি। বাইরে এ নিয়ে কথা বলা ঠিক হবে না। তবে পদ ও মনোনয়ন বাণিজ্য হচ্ছে, এ কথা সবাই বলছে। তাই এগুলো খতিয়ে দেখতে তদন্তের দাবি ওঠা স্বাভাবিক।’

উল্লেখ্য, বিএনপিতে পদ বাণিজ্য (কমিটিতে টাকার বিনিময়ে পদ) ও মনোনয়ন বাণিজ্য (ইউপি ও পৌর নির্বাচনের মনোনয়ন) চলছে বলে গত কয়েক দিনে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। বিশেষ করে মনোনয়নের সঙ্গে জড়িত দলের একজন সহদপ্তর সম্পাদকের ব্যাংক স্টেটমেন্ট ফাঁস হওয়ার ঘটনায় দলের মধ্যে প্রচণ্ড তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্ট ওই ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমেই মনোনয়নের টাকা লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। আর অভিযোগের ওই আঙুল তোলা হয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতাদের দিকে।

পক্ষান্তরে কমিটি গঠনে গুলশান কার্যালয়ে চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস এবং নয়াপল্টন কার্যালয়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, কমিটি গঠনে দলটির সিনিয়র নেতাদের সম্পৃক্ত না করায় তাঁরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। তাঁদের সঙ্গে এমনকি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও কমিটি গঠন নিয়ে খালেদা জিয়ার দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর বের হয়।

এ পরিস্থিতিতে মূলত সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব কমাতেই হঠাৎ করে স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডাকেন খালেদা জিয়া। উপস্থিত নেতাদের তিনি জানান, স্থায়ী কমিটিতে আপনারা সবাই থাকবেন। পাশাপাশি ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গেও তাঁর কোনো দূরত্ব হয়নি বলে জানান তিনি। বলেন, গতকাল (রবিবার) তারেকের সঙ্গে কথা হয়েছে তাঁর।

সূত্র মতে, বৈঠকে অনেকটা অপ্রাসঙ্গিকভাবেই মহানগরী বিএনপিকে চার ভাগ করে আবার কেন্দ্রীয় মহানগরী বিএনপির পৃথক আরেকটি কেন্দ্রীয় কমিটি করার প্রস্তাব করেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তবে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেন, উত্তর ও দক্ষিণে মেয়র নির্বাচন হয় এবং এরই মধ্যে বিএনপি সে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। সুতরাং এখানে চারটি কমিটি বা পৃথক কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া এটি গঠনতন্ত্রের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, দলে কেন্দ্রীয় কমিটি কয়টি থাকে? তিনি প্রস্তাব দেন, দুই মহানগরী কমিটি কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে দায়ী থাকবে। আলোচনার এই পর্যায়ে খালেদা জিয়া গয়েশ্বরের প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়ে জানান, মহানগরী দুই ভাগ হবে।

সূত্র মতে, তারেক রহমানের ক্ষমতা বৃদ্ধিবিষয়ক গয়েশ্বরের আরেকটি প্রস্তাবও বৈঠকে নাকচ হয়ে যায়।

আসলাম চৌধুরীকে নিয়ে আলোচনা : ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এক এজেন্টের সঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীকে জড়িয়ে খবর প্রকাশিত হওয়ার ঘটনা নিয়ে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদসহ সিনিয়র কয়েকজন নেতা এ বিষয়ে বলেছেন, একটি জাতীয় দৈনিকে এ-সংক্রান্ত খবর ও ছবি প্রকাশিত হওয়ায় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান একে আরেকটি তাইওয়ান ঘটনার পুনরাবৃত্তি বলে উল্লেখ করেন। আলোচনাকালে মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর রায় বলেন, পত্রিকায় ছবি নানাভাবে ছাপা যায়।

মওদুদ আহমদ এ পর্যায়ে বলেন, সঠিক বা বেঠিক যাই হোক, এ ঘটনা খতিয়ে দেখা উচিত। খালেদা জিয়া এর সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, আসলাম চৌধুরীকে ডেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। সূত্র মতে, স্থায়ী কমিটির বৈঠকের পরে আসলাম চৌধুরীকে ডেকে একটি জাতীয় দৈনিকে তাঁকে জড়িয়ে খবরের বিষয় জানতে চাওয়া হয়। আসলাম বলেন, দিল্লিতে তিনি ব্যবসায়ী হিসেবে গিয়েছিলেন। সেখানে কিভাবে বা কারা তাঁর ছবি তুলেছে এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

আসলাম চৌধুরী বলেন, ‘চেয়ারপারসন আমাকে সতর্কভাবে চলতে বলেছেন। তবে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে কিছু বলেননি।’

উল্লেখ্য, বিগত বিএনপি সরকারের সময় বাংলাদেশে তাইওয়ান সেন্টার করার অনুমতি দিয়ে চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট করে বিএনপি। সে সম্পর্ক আজও স্বাভাবিক হয়নি।

আরও পড়ুন