বিশ্বজুড়ে বহুল আলোচিত অর্থ পাচারের ‘পানামা পেপার্স’ কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশের ২১ ব্যক্তি ও ৩ প্রতিষ্ঠানের নাম এবং ১৮টি ঠিকানা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো কর ফাঁকি দিয়ে অন্য দেশে অর্থ পাচার করেছে। তবে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যে ঠিকানা প্রকাশ করা হয়েছে অনুসন্ধানে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা মিলছে না। দু-একটি প্রতিষ্ঠান উল্লিখিত ঠিকানায় থাকলেও নাম আসার বিষয়ে তারা কোনো কথা বলতে চাইছে না।
বাংলাদেশি যেসব ব্যক্তির নাম প্রকাশ করা হয়েছে তারা হলেন- কফিল এইচ এস মুয়িদ, পেসিনা স্টেফানো, রুডি বেঞ্জামিন, ইউসুফ রায়হান রেজা, ইশরাক আহমেদ, নভেরা চৌধুরী, মোহাম্মদ ফরহাদ গণি, মেহবুব চৌধুরী, বিলকিস ফাতিমা জেসমিন, রজার বার্ব, আবুল বাসার, জাইন ওমর, বেনজির আহমেদ, আফজালুর রহমান, সুধীর মল্লিক, জীবন কুমার সরকার, নিজাম এম সেলিম, মোহাম্মদ মোকসেদুল ইসলাম, মোতাজ্জেরুল ইসলাম ও সেলিমুজ্জামান। পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশের যে ১৮টি ঠিকানা প্রকাশ করা হয়েছে, এর মধ্যে গতকাল সরেজমিন ঘুরে বেশ কয়েকটির তথ্য পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে রাজধানীর বাংলামোটরের ১১৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউতে অবস্থিত কনকর্ড টাওয়ারের অষ্টম তলায় স্যুইট নম্বর ৯০১-এ গিয়ে দেখা যায়, একটি এক্সেস টেল-এর কার্যালয়। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও দুইটি প্রতিষ্ঠান। এর একটি আলাপ কমিউনিকেশন লিমিটেড। অপরটি টোকিয়ান। এর মধ্যে এক্সেস টেল বিভিন্ন করপোরেট অফিসে ইন্টারনেটের ব্রডব্যান্ড লাইন সংযোগ দেয়। আর আলাপ কমিউনিকেশন বিভিন্ন ব্যাংকে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়। আর টোকিয়ান বিভিন্ন করপোরেট অফিস ও ব্যাংক উভয় অফিসে সংযোগ দেয়। দেখা যায়, অফিসের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলছে। সেখানে কথা হয় প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান মিজানুর রহমানের সঙ্গে।
পানামা পেপারস এর কেলেঙ্কারিতে তালিকায় নাম আসার ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমরা পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি। কিভাবে ওই তালিকায় নাম এসেছে তাও আমরা জানি না। এ নিয়ে আমাদের কোন মাথা ব্যথাও নেই। আমরা আমাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাচ্ছি। তালিকায় নাম আসার পর ম্যানেজিং ডিরেক্টর অফিসে এসেছেন কিনা বা তার সঙ্গে এ ব্যাপারে কিছু আলাপ হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, তিনি তো আমেরিকাতে থাকেন। দেশে এলে অফিসে আসেন নিয়মিত। এই ঘটনার পর এ ব্যাপারে তার সঙ্গে কোনো আলাপ হয়নি বলেও জানান মিজানুর রহমান।
এ ব্যাপারে সিকিউরিটি এবং রিসিপশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন, ওই অফিসের কার্যক্রম স্বাভাবিকই রয়েছে। তারা কোনো পরিবর্তন লক্ষ করেননি। রাজধানীর বড় মগবাজারের ১৭০/এ আউটার সার্কুলার রোডের যে ঠিকানা প্রকাশ করা হয়েছে, সেটির অস্তিত্ব নেই। গতকাল সরজমিনে ওই ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায় ওই বাড়িতে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নেই। ছয় তলা বাড়িতে আবাসিক বাসিন্দারা বসবাস করেন। রাজধানীর গুলশান ১-এর ২২ নম্বর সড়কের ৩৩ নম্বর বাড়ির যে ঠিকানা দেয়া হয়েছে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় সেখানে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। ওই বাড়িটিও আবাসিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাসিন্দাদের পানামা পেপারসে নাম আসার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তারা এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান।
রাজধানীর বনানীর ওল্ড ডিওএইচএসের ৪/এ সড়কের ৪/এ নম্বর বাড়ির ঠিকানায় গিয়ে বাড়ির প্রবেশ গেটে একটি নোটিশ দেখা যায়। এতে লেখা, রেজিস্ট্রি বায়নাসূত্রে এ বাড়ির মালিক মো. মোকসেদুল ইসলাম গং। এই মোকসেদুল ইসলামের নাম রয়েছে পানামা পেপারসে। এ ছাড়া রাজধানীর ৬৫-৬৬ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার ঠিকানাটি ঢাকা চেম্বার ভবন। এ ঠিকানা উল্লেখ রয়েছে পানামা পেপারসে।
রাজধানীর বারিধারার ১ নম্বর সড়কের ১৬ নম্বরের একটি বাড়ির ঠিকানা এসেছে পানামা পেপারসে। বাংলাদেশ বিমান ইনকরপোরেশনের অফিসের ঠিকানার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বাড়ি নম্বর-১ রোড-৬ বারিধারা। এই ঠিকানায় প্রকাশিত কোনো প্রতিষ্ঠান পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া চট্টগ্রামের নাছিরাবাদ এলাকার হিলভিউ আবাসিক এলাকার ২ নম্বর সড়কের ২৯ নম্বর একটি বাড়ির ঠিকানা এসেছে। ওই ঠিকানায়ও কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নেই। এদিকে পানামা পেপারসে নাম আসা সম্ভাব্য কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারে জড়িত ৫২ বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে সরকার। ইতিমধ্যেই প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ওইসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে খোঁজ নিতে শুরু করেছে সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় এ মুহূর্তে বেশি কিছু বলা ঠিক হবে না। তবে এর সত্যতা সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে।
আর পানামার গোপন নথিতে কর ফাঁকির চিত্র উঠে আসা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার মধ্যে বাংলাদেশি কারও নামও এতে রয়েছে কি না, তার তদন্তে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। এজন্য কমিশনের উপপরিচালক এস এম এম আখতার হামিদ ভূঁইঞাকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুদক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন, পানামা পেপারস কেলেঙ্কারির ঘটনায় বাংলাদেশের যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অনুসন্ধানের প্রয়োজনে অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে এমএলএআর (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স রিকোয়েস্ট) পাঠিয়ে বিদেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) গত সোমবার এটি প্রকাশ করে।
পানামাভিত্তিক আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকার গোপন নথি থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আলোচিত ব্যক্তিদের অর্থ পাচার সংক্রান্ত তথ্য ফাঁস করে দেয় আইসিআইজে। অর্থ পাচারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁসের এ ঘটনার নাম দেয়া হয় ‘পানামা পেপারস’। গত এপ্রিলে এ তথ্য পাচারের ঘটনা প্রকাশ করা হয়। তখন থেকেই তা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। পানামা পেপারসে বেরিয়ে আসে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, তারকাসহ অনেকের নাম। আইসিআইজের ওয়েবসাইটে থাকা প্রতিবেদনে বলা হয়, মোসাক ফনসেকার নথিতে বিশ্বের ২০০ দেশের ২ লাখ ১৪ হাজার ব্যক্তির টাকা পাচারের নথি আছে। এসব ব্যক্তির মধ্যে ১৪০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং রাজনীতিকের নাম রয়েছে। এসব ব্যক্তি বিশ্বের ২১টি কর রেয়াত পাওয়া অঞ্চলে পাঠানো টাকায় গড়ে তুলেছেন তথাকথিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।


