জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আদিবাসী ছাত্রীকে পয়লা বৈশাখে লাঞ্ছনা, ছিনতাই ও প্রহারের দায়ে আজীবন বহিষ্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের পাঁচ নেতা-কর্মীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সম্প্রতি হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে। আজ সোমবার ডেপুটি রেজিস্ট্রার (শিক্ষা) মোহাম্মদ আলী স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশের মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ছাত্রী লাঞ্ছনা, ছিনতাই ও প্রহারের অভিযোগে গত বছর ২৩ মে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কার্যকরী সদস্য এবং সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী নিশাত ইমতিয়াজ, ছাত্রলীগ কর্মী নৃবিজ্ঞান বিভাগের আবদুর রহমান ও নুরুল কবির, হল শাখা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক ও রসায়ন বিভাগের নাফিজ ইমতিয়াজ এবং ছাত্রলীগ কর্মী ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের রাকীব হাসানকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়। এঁরা প্রত্যেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সালাম-বরকত হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
বহিষ্কারের পর গত বছর শেষের দিকে হাইকোর্টে রিট করেন ছাত্রলীগের এই পাঁচ নেতা-কর্মী। এতে শুনানি শেষে গত ২০ মার্চ আদালত এই বহিষ্কারাদেশ অবৈধ ঘোষণা করেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার (আইন) মাহতাব-উজ-জাহিদ বলেন, শুনানি শেষে হাইকোর্ট বহিষ্কারাদেশকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। হাইকোর্টের এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে গত ছয় এপ্রিল এই পাঁচজন শিক্ষাকার্যক্রমে অংশ নেওয়ার জন্য উপাচার্য ফারজানা ইসলামের কাছে আবেদন করেন। আবেদন গৃহীত হওয়ার পর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের কথা জানিয়ে অফিস আদেশ জারি করে প্রশাসন।
ডেপুটি রেজিস্ট্রার (শিক্ষা) মোহাম্মদ আলী বলেন, হাইকোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হয়েছে।
গত বছরের ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখ সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী এক ছাত্রীকে লাঞ্ছনার অভিযোগ ওঠে ছাত্রলীগের এই পাঁচ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে। ১৬ এপ্রিল ছাত্রলীগ থেকে তাঁদের সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, পয়লা বৈশাখের দিন বিভাগের অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ওই ছাত্রী তাঁর সহপাঠীর সঙ্গে নিজের হলে ফিরছিলেন। ক্যাম্পাসের পরিবহন চত্বর সংলগ্ন চৌরঙ্গীতে আসার পর দুই ছেলে তাদের দাঁড় করিয়ে কথা বলে। পাশেই আরও তিনজন দাঁড়িয়ে ছিল।
একপর্যায়ে ছাত্রলীগের কেউ একজন ওই ছাত্রীর ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে ঢুকে যান। তখন তাঁরাও (ওই ছাত্রী ও তাঁর সহপাঠী) ব্যাগ ফিরিয়ে আনতে জঙ্গলের ভেতর ঢুকে যান। জঙ্গলের ভেতর ওই পাঁচজনের সঙ্গে তাদের বাগবিতাণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ছাত্রলীগের
নেতা-কর্মীরা তাঁদের মারধর এবং গালিগালাজ করেন।
এ সময় ছাত্রলীগ কর্মী নুরুল কবির ছাত্রীর মুঠোফোন ও ব্যাগ থেকে ৫০০ টাকা ছিনিয়ে নেয়। নিশাত ইমতিয়াজ ওই ছাত্রীকে উদ্দেশ্য করে অশ্লীল মন্তব্য করেন। এ সময় তাঁরা ওই ছাত্রীর হাত ধরে টানাটানি করে। রাকীব হাসান এ সময় শাড়ি ধরে টান দিলে ওই ছাত্রী চিৎকার করেন। চিৎকার শুনে আশপাশের মানুষজন জড়ো হয়। এতে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা পালিয়ে যায়।
হলে গিয়ে ওই ছাত্রী বিষয়টি জ্যেষ্ঠ ছাত্রীদের জানান। পরদিন বুধবার দিনব্যাপী ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা সমঝোতার চেষ্টা করে। কিন্তু হলের ছাত্রীরা এতে রাজি হননি। রাত নয়টার দিকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হলের সামনে গিয়ে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ছাত্রী ও কয়েকজন আদিবাসী শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলোচনায় বসেন। ততক্ষণে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে। সাংবাদিকেরা হলের সামনে আসলে আলোচনা অসমাপ্ত রেখেই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা সেখান থেকে চলে যান। যাওয়ার সময় ছিনিয়ে নেওয়া মুঠোফোনটি এক ছাত্রীর হাতে দিয়ে যান তারা।
এরপর হলের জ্যেষ্ঠ ছাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে প্রথমে প্রক্টরের কাছে এবং পরে উপাচার্যের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন ওই ছাত্রী।


