আজ মঙ্গলবার ১৭ মে, মঙ্গলবার। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফেরার দিন। দলীয় সভাপতির ৩৬তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসকে পালন করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো ৭ দিনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর স্বামী-সন্তানসহ ছয় বছর বিদেশে কাটিয়ে ১৯৮১ সালের ১৯ মে দেশে ফিরতে সক্ষম হন তার বড় কন্যা শেখ হাসিনা। দুই শিশু সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে লন্ডনে ছোট বোন শেখ রেহানার কাছে রেখে এ দেশে গণতন্ত্র আর প্রগতিশীলতার রাজনীতি ফেরাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন তিনি।
কিন্তু সে দিনটি এমন নিষ্কলুষ ছিল না, শেখ হাসিনার চলার পথও এতো কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। রাজনীতির ময়দানের কঠিন পথের পাশাপাশি প্রকৃতিও সেদিন ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। দিনটি ছিল রোববার। ছিল কালবৈশাখীর প্রবল ঝড়ো হাওয়া, বেগ ছিল ঘণ্টায় ৬৫ মাইল। প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি আর দুর্যোগও সেদিন গতিরোধ করতে পারেনি গণতন্ত্রকামী লাখ লাখ মানুষের মিছিল। গ্রাম-গঞ্জ-শহর নগর-বন্দর থেকে অধিকারবঞ্চিত মুক্তিপাগল জনতা ছুটে এসেছিল রাজধানী ঢাকায়, তাদের একমাত্র আশার প্রদীপ বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারী শেখ হাসিনাকে বরণ করতে। মুষলধারার বৃষ্টি-বাদল উপেক্ষা করে তারা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিল ‘নেত্রী’ কখন আসবেন এই প্রতীক্ষায়।
অবশেষে বিকাল ৪টায় তৎকালীন কুর্মিটোলা বিমানবন্দর হয়ে জনসমুদ্রের জোয়ারে এসে পৌঁছান শেখ হাসিনা। দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর পর দেশের মাটিতে পা রেখেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তাকে একনজর দেখার জন্য কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শেরেবাংলা নগর পর্যন্ত সব রাস্তা পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে।
দেশের মাটিতে পা দিয়ে লাখ লাখ জনতার সংবর্ধনার জবাবে শেখ হাসিনা সেদিন বলেছিলেন, ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি; বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে আমার আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির জনকের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই।’ তার আগমন উপলক্ষে স্বাধীনতার অমর স্লোগান ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত ছিল ঢাকার আকাশ-বাতাস। জনতার কণ্ঠে বজ নিনাদে ঘোষিত হয়েছিল ‘হাসিনা তোমায় কথা দিলাম- পিতৃ হত্যার বদলা নেব’। সেদিন অবিরাম মুষলধারে বারিবর্ষণে যেন ধুয়ে-মুছে যাচ্ছিল বাংলার মাটিতে পিতৃ হত্যার জমাট বাঁধা পাপ আর কলংকের চিহ্ন।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর চরম এক প্রতিকূল পরিবেশে নির্বাসিত প্রবাস জীবন কাটাতে হয় আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তার বিদেশে থাকাকালেই ১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে আওয়ামী লীগ নেতারা শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করেন। দেশে প্রত্যাবর্তনের পর নেতারা তার হাতে তুলে দেন দেশের সর্ববৃহৎ ও ঐতিহ্যের সাফল্যগাথা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের পতাকা।
এর পর থেকে শেখ হাসিনা দলীয় কাউন্সিলে বারবার নির্বাচিত হয়ে দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। দু’বার পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন শেষে এবার তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। যথাযথ প্রক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি তার দুই সন্তানকেও সুশিক্ষিত করে তুলেছেন। ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আজ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন তিনি তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে। মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল অটিজম বিশেষজ্ঞ হিসেবে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় এরই মধ্যে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যথাযোগ্য মর্যাদায় দলীয় সভাপতির স্বদেশ ফেরার দিনটি উদযাপনের জন্য দলের সব স্তরের নেতাকর্মী ও জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
কর্মসূচি : আজকের এই দিনে শেখ হাসিনা লন্ডনে থাকায় বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হবে। এ উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে আওয়ামী লীগ। সভায় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের সভাপতিত্বে দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও দলীয় নেতারা আলোচনায় অংশ নেবেন। এছাড়া অন্যান্য সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোও আলোচনা সভা, মিলাদ-মাহফিল, আনন্দ র্যালির মাধ্যমে দিনটি স্মরণ করবে।


