বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

বঙ্গবন্ধুর বডিগার্ডের সন্তানও তুলে নেয়ার পর থেকে নিখোঁজ

highcourt+jugantor_13274_1463473659‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বডিগার্ডের দায়িত্ব পালন করেছন এমন এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে আজও তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি।’

সাদা পোশাকে আইন-শৃংখলা বাহিনীর পরিচয়ে গ্রেফতার কার্যক্রমের ভয়াবহতা তুলে ধরতে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমানের বরাতে এমন তথ্য তুলে ধরেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।

মঙ্গলবার ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার এবং ১৬৭ ধারায় রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে ১৫দফা নির্দেশনা দিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানিকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, সাদা পোশাকে গ্রেফতার ‘অ্যালার্মিং’ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আইন-শৃংখলাবাহিনী কাউকে গ্রেফতার করে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করছেন না। এটি গ্রহণযোগ্য নয়।

শুনানির এক পর্যায়ে প্রধান বিচরাপতি এস কে সিনহা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের উদ্দেশ্যে বলেন, বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট রায়ে সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা দিয়েছিল। ১৩ বছর পার হয়ে গেলেও আপনার একটি নির্দেশনাও  (সরকার) প্রতিপালন করেননি।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি একটি ঔপনিবেশিক আইন। ১৯৭০ সালে মালয়েশিয়া এই আইনের সংশোধনী এনেছে। মালয়েশিয়াকে অনুসরণ করে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও তাদের ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করেছে।  কিন্তু আমরা এখনো এটি করতে পারছি না।

এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি  জেনারেল বলেন, আমাদের দেশের সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে হাইকোর্টের নির্দেশানসমূহ যথাযথ নয়। আর কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় পুলিশ হেফাজতে যদি কেউ মারা যায় তাহলে পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমাদের দেশে আইন রয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালের ২৩ জুলাই ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকা থেকে বেসরকারি ইনডিপেনডেন্ট ইউনির্ভাসিটির ছাত্র শামীম রেজা রুবেলকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে তৎকালীন ডিবি পুলিশের সহকারী কমিশনার-এসি আকরাম হোসেন। পর দিন মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে মারা যান রুবেল।

এ ঘটনায় রুবেলের বাবা রমনা থানায় এসি আকরামসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় ২০০২ সালে বিচারিক আদালত এসি আকরামসহ ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন।

এদিকে রুবেল হত্যা তদন্তের জন্য বিচারপতি হাবিবুর রহমান খানের সমন্বয়ে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত শেষে কমিটি ৫৪ ও ১৬৭ ধারা সংশোধনের পক্ষে কয়েকটি সুপারিশ করে।

এ সুপারিশ কার্যকর না করায় বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট-ব্লাস্ট হাইকোর্টে রিট করে। ওই  রিট মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল এ ব্যাপারে ১৫ দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দেন হাইকোর্ট।

রায়ে ছয় মাসের মধ্যে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রচলিত বিধান সংশোধন করতে নির্দেশ দেয়া হয়। পাশাপাশি ওই ধারাগুলো সংশোধনের আগে কয়েক দফা নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সরকারকে বলা হয়।

হাইকোর্টের দেয়া নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে- পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করতে পারবে না, কাউকে গ্রেফতারের সময় পুলিশ তার পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে, গ্রেফতারের তিন ঘণ্টার মধ্যে এর কারণ জানাতে হবে, বাসা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য স্থান থেকে গ্রেফতার ব্যক্তির নিকটাত্মীয়কে একঘণ্টার মধ্যে টেলিফোন বা বিশেষ বার্তাবাহক মারফত বিষয়টি জানাতে হবে, গ্রেফতার ব্যক্তিকে তার পছন্দসই আইনজীবী ও নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে পরামর্শ করতে দিতে হবে।

এ ছাড়া গ্রেফতার ব্যক্তিকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে কারাগারের ভেতরে কাঁচ দিয়ে নির্মিত বিশেষ কক্ষে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে, কক্ষের বাইরে তার আইনজীবী ও নিকটাত্মীয় থাকতে পারবেন। জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে ওই ব্যক্তির ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে হবে, পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ম্যাজিস্ট্রেট সঙ্গে সঙ্গে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করবেন। বোর্ড যদি বলে ওই ব্যক্তির ওপর নির্যাতন করা হয়েছে তাহলে পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা নেবেন এবং তাকে দণ্ডবিধির ৩৩০ ধারায় অভিযুক্ত করা হবে।

এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আপিল আবেদনে বলা হয়,এ দুটি ধারা সংশ্লিষ্ট যে আইনে রয়েছে, তা যথষ্টে ও সঠিক। এ জন্য আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের কোনো প্রয়োজন নেই।

২০০৪ সালে আপিল বিভাগ সরকারের লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) মঞ্জুর করেন। তবে হাইকোর্টের ওইসব নির্দেশনা স্থগিত করেননি। এরপর সরকার আপিল  করলে তা ২০০৭, ২০০৮ ও ২০১০ সালে শুনানির জন্য কার্যতালিকায় এলেও শুনানি হয়নি বলে জানা গেছে।

সর্বশেষ গত ২০ জানুয়ারি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসলে আদালত হাইকোর্টের নির্দেশনাসমূহ বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানাতে বলেন। কিন্তু সরকার তা জানায়নি। এর মধ্যে গত ২২ মার্চের এক দফা শুনানি শেষে আজ মঙ্গলবার মামলাটির চূড়ান্ত শুনানি হলো। আপিল বিভাগ ২৪ মে এ মামলার রায় ঘোষণা দিন ধার্য করেছেন।

আরও পড়ুন