একটি এলাকা থেকে বাড়িঘর ফেলে পালিয়েছে ৫০টির মতো পরিবার। কারণ, গত কয়েকদিনের ব্যবধানে এই এলাকা থেকে কালো পোশাক পড়ে এসে কারা যেন ১০ জন পুরুষকে তুলে নিয়ে গেছে। যাদের কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।
পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের খাগরবাড়ীয়া ও সাভার গ্রামে এই ঘটনা ঘটেছে। এখানকার সাভার নাম গ্রাম থেকে বাড়িঘর ফেলে পালিয়েছে ৫০টির মতো পরিবার। গত ফেব্রুয়ারি মাসে একটি খুন এবং গত এক মাসে ১০ জনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে ১১ মে ভোরে খাগরবাড়ীয়া গ্রাম থেকে তিন সহোদরসহ পাঁচজনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়। সর্বশেষ গত বুধবার ১৮ মে আরও পাঁচজনকে তুলে নেওয়া হয় সাভার গ্রাম থেকে। এখন দুটি গ্রামই পরিণত হয়েছে আতঙ্কের জনপদে।
দুই গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে গ্রাম দুটি চরমপন্থী–অধ্যুষিত। মাঝেমধ্যেই চলে অস্ত্রের মহড়া। ফলে এমনিতেই আতঙ্কে থাকে গ্রামবাসী। এর মধ্যে গত ২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সাভার গ্রামে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা সাইফুল ইসলামকে। ওই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ে গ্রামবাসী। একে অপরের ওপর বিভিন্নভাবে চড়াও হতে থাকে। সৃষ্টি হয় অরাজক পরিস্থিতি।
জানতে চাইলে পাবনার পুলিশ সুপার আলমগীর কবীর বলেন, ‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি। আর গ্রাম দুটিতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখতে সার্বক্ষণিক পুলিশি নজরদারি রাখা হয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগির পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’
ফরিদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান বলেন, মারপিট, লুটতরাজের যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা সঠিক নয়। খুনের ঘটনার পর অনেকে নিজ থেকেই গ্রামছাড়া হয়েছেন। ১০ জনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব দপ্তরে খোঁজ নিয়েছি। কোথাও তাঁদের সন্ধান মেলেনি।’
নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের অভিযোগ, খুনের ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই গ্রাম দুটিতে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রতিপক্ষ ভেবে বহু মানুষের ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয়ে একের পর এক মানুষকে তুলে নেওয়া হচ্ছে।
সাভারের পাশের মাছপাড়া গ্রামের ইউপি সদস্য চাঁদ আলী বলেন, দুটি গ্রামের মানুষ ঘর থেকে বের হতেই ভয় পাচ্ছেন। ছেলেমেয়েরা স্কুল-কলেজে যেতে পারছে না।
সাভার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, তাঁদের স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে প্রায় ১৫টি শিশু স্কুলে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। পরিবারের সঙ্গে তারা গ্রাম ছেড়েছে বলে শুনেছেন।
অপহৃত তিন ভাই টিক্কা সরদার (৩০), এরশাদ সরদার (২৫) ও সাদ্দাম সরদারের (২০) স্বজনেরা বলেন, ঘটনার রাতে তাঁরা সবাই জেগে ছিলেন। ভোর চারটার দিকে তাঁরা রান্নাঘরে ধান সেদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় বাড়ির পেছন দিক থেকে কালো পোশাকধারী পাঁচ-ছয়জন বাড়িতে ঢোকে। এরপর প্যান্ট-শার্ট ও লুঙ্গি পরা আরও ১০-১২ জন ঢোকে। তারা তিন ভাইয়ের নাম ধরে ডাকতে থাকে। তিন ভাই বের হওয়ামাত্র ধরে নিয়ে চলে যায়।
এরশাদের স্ত্রী দুলালী খাতুন বলেন, কালো পোশাকধারী মানুষগুলো তিন ভাইকে ধরার সঙ্গে সঙ্গে হাতকড়া পরিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যায়। তিনজনের বাবা আবদুল করিম সরদার মনে করেন, গত ফেব্রুয়ারির খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর ছেলেদের তুলে নেওয়া হয়েছে। ছেলেদের নিয়ে যাওয়ার সময় কালো পোশাকধারীদের সঙ্গে সাভার গ্রামের কিছু মানুষ ছিল।


