বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

জিয়াউর রহমানকে হত্যা: সেসময়ের চট্টগ্রামের ডিসি এখন যা বলেন

Ziaddun-M-Chyতৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার সময় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ছিলেন জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী। সুইডেন প্রবাসী মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী জিয়াউদ্দিনের লিখিত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।

১৯৮১ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হত্যা করা হয় তখন জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী চট্টগ্রামের ডিপুটি কমিশনার ছিলেন। পরবর্তিতে তিনি বিশ্বব্যাংকে (ওয়াশিংটন ডিসি) যোগদান করেন। জিয়া হত্যা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান হত্যার বিষয়ের উপর আমি একটি বই লিখেছি (Assassination of Ziaur Rahman and the Aftermath; UPL, Dhaka) যাতে ঘটনা  সম্পর্কে বিশদ বিবরণ আছে। তবুও তার সাক্ষাত্কার নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করাতে রাজি হলেন সাবেক এই ডেপুটি কমিশনার। বর্তমানে তিনি দীর্ঘ দিন থেকে স্বপরিবারে আমেরিকার ম্যারিল্যান্ড শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

ইতিমধ্যে তার লেখা মোট তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম বইটির নাম Assassination of Ziaur Rahman and Aftermath, দ্বিতীয় Fight for Bangladesh এবং সবশেষে Forty Years of  Bangladesh। প্রথম বইটি মূলত লিখেছেন চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার সময় তার জেলা প্রশাসক দায়িত্ব থাকাকালীন নিজ চোখে দেখার অভিজ্ঞতা ও ঘটনাপঞ্জি সম্পর্কে। দ্বিতীয় বইটি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মহুকুমা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে স্বাধীনতা যুদ্ধ তার অভিজ্ঞতার একটি সংগ্রহ ও তৃতীয় বইটি স্বাধীনতা পরবর্তিতে বাংলাদেশের কৃতিত্ব ও অগ্রগতির  উপর একটি সংগ্রহ। জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর দেশের বাড়ি সিলেট।

বাংলাদেশ সরকারের এই সাবেক উর্ধতন কর্মকর্তা তার শিক্ষা জীবন শুরু করেন নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও সবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক। পরবর্তিতে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে কর্নেল ইউনিভার্সিটি নিউইয়র্ক এবং আমেরিকান ইউনিভার্সিটি (ওয়াশিংটন ডিসি) স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করেন।

জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর সাক্ষাত্কারটি এখানে তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: আপনার কর্মজীবন কোথায় কখন শুরু করেন?
আমি ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেই এবং ১৯৭১ সালে বৃহত্তর ঢাকার মুন্সীগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে মহকুমা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করি।

প্রশ্ন: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কি কি পদে দায়িত্ব পালন করেছেন?
স্বাধীনতার পরপরই আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের অধীনে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের বিশেষ সহকারী হিসেবে কাজ করি। ১৯৭২ সালের মে থেকে ১৯৭৪ সালের মার্চ পর্যন্ত মন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামনের একান্ত সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলাম। পরবর্তিতে পুনরায় ১৯৭৫ সালের মার্চ থেকে ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত এইচ এম কামরুজ্জামানের একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।এইসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারকে একটি অভ্যুত্থানে মাধ্যমে উৎখাত করা হয়েছিল।

প্রশ্ন: ১৯৮১ সালে ৩০ মে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার সময় চট্টগ্রামে আপনি কি দায়িত্বে ছিলেন?
আমি তখন চট্টগ্রামের ডিপুটি কমিশনার ছিলাম।

প্রশ্ন: জিয়াউর রহমানের হত্যা করার পরিকল্পনা কি আপনি আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন?
না।সেদিন আমি ভোর রাত তিনটার দিকে সম্ভবত প্রথম গুলির শব্দ শুনেছিলাম। আমার বাংলো থেকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের দূরত্ব ছিল মাত্র একমাইলের মতো।

Zia-Dead-Newsপ্রশ্ন: জিয়া হত্যার খবর আপনি কখন প্রথম জানতে পারলেন?  চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে কি আপনি পরবর্তিতে গিয়েছিলেন?
আমি যখন ভোরবেলা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে পৌঁছাই তখন সেখানে নীরবতা বিরাজ করছিল।পরিস্থিতি দেখে মনে হয়েছিল ঘণ্টাখানেক আগে এখানে রীতিমতো যুদ্ধ হয়েছে।সার্কিট হাউসের বারান্দা এবং ওপরের ব্যালকনির একটি অংশ ভাঙা অবস্থায় পড়েছিল। দুজন পোশাকধারীর মৃতদেহ সিঁড়িতে পড়েছিল। এদের একজন পুলিশ, আরেকজন সেনা সদস্যে। তবে সবচেয়ে বিপর্যয়কর ও মর্মবিদীর্ণ অবস্থায় বুলেটবিদ্ধ হয়ে মেঝেতে পরেছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দেহ। যে স্যুটে তিনি ছিলেন তার একটু দূরেই পড়েছিল তাঁর দেহটি।

প্রশ্ন: জিয়াউর রহমান হত্যার পূর্বে এবং পরবর্তীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
১৯৮১ সালের ৩০ মে দিনটি আমার কাছে একটি দুঃস্বপ্ন। এই দুঃস্বপ্নের স্মৃতিচারণা কখনোই আমার জন্য সুখকর নয়। তারপরও প্রতি বছর ঘুরে ফিরে দিনটি আসলে এই সময়ে আমার মন ১৯৮১সালের ৩০ মের সেই আতঙ্কজনক সকালে চলে যায়। এইদিন সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছিলেন। এইসময় মোট তিন জন নিরীহ মানুষও নিহত হয়। যতটুকু শুনেছি চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে আসা একদল পোশাকধারী সামরিক অফিসার এদের সকলকে হত্যা করেন। সেই দৃশ্যটি আমাকে বহুকাল তাড়িয়ে বেরিয়েছে, এমনকি এখনো তা আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

প্রশ্ন: তারপর?
আমার মনে হয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে খুন করার এই অভিযান খুব সম্ভবত এক ঘণ্টা স্থায়ী ছিল। কারণ পুলিশ নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে এক ঘণ্টা পর রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়েছে বলে আমাকে জানানো হয়। আমি সার্কিট হাউসে পৌঁছার একঘণ্টা আগেই খুনিরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে চলে যায়। অভিযানটি খুব সুপরিকল্পিতছিল। তাদের লক্ষ্যও ছিল একটি। কিন্তু পরবর্তীকালে এই হত্যা ঘটনা নিয়ে যে খবর বেরোয় তা ছিল আরও অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও দুর্বোধ্য।

প্রশ্ন: আপনার এই কথার অর্থ কি খুলে বললে ভালো হতো
হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত ভাবার কারন কয়েকটি। প্রথম সংঘবদ্ধ এবং আতর্কিত আক্রমন, দ্বিতিয়, পুলিশ বাহিনি এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড বাহিনির তুলনামূলক স্বল্পতা সম্পর্কে আক্রমনকারীদের সম্যক জ্ঞান, আর তৃতীয় সার্কিট হাউসের কক্ষ সমুহ এবং অতিথিদের কে কোথায় অবস্থান করছেন তা সম্পর্কে তাদের জ্ঞান।

প্রশ্ন: এই সময় জিয়ার সাথে সার্কেট হাউসে আর কে কে ছিলেন ?
রাষ্ট্রপতির সাথে অল্প সংখ্যকের একটি প্রতিনিধি দলছিল। তারা সকলেই রাতে সার্কিট হাউসেই ছিলেন। রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ছাড়া এই দলে ছিলেন বিএনপির তত্কালীন মহাসচিব ডা.বদরুদ্দোজাচৌধুরী, উপদেষ্টা ড. আমিনা রহমান ওআরও একজন প্রতিমন্ত্রী।

প্রশ্ন: আপনি ওখানে যাওয়ার পর তাদের কি অবস্থায় পেলেন ?
শুনেছি খুনিরা সার্কিট হাউসে ঢোকার পর তাঁরা নাকি খাটের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আমি সার্কিট হাউসে পৌঁছার পর তাদের একে একে বের হয়ে আসতে দেখি। ঐসময় তাঁরা ভয়ে কাঁপছিলেন।

প্রশ্ন: এইসময় আপনি কি আর কোনো কিছু দেখতে পেয়েছিলেন?
এখানে একটি বিষয় যা আমার কাছে খুব আশ্চর্য মনে হয়েছে, আর তা হলো রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব লে. কর্নেল মাহফুজের ভূমিকা। তিনি এইসময় অত্যন্ত শান্ত ছিলেন। তাঁর সামরিক ইউনিফর্মও পরাছিল। আমাদের দেখে বেরিয়ে আসার সময় তিনি বেতার ফোনে কথা বলছিলেন। তিনি খুব শান্ত গলায় আমাদের জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ হেলিকপ্টারে ঢাকা থেকে রওনা হয়েছেন। তাঁর মেজাজের প্রশান্তি দেখে মনে হচ্ছিলনা যে এখানে কোনো বিপর্যয় ঘটেছে। তাঁর ভাব দেখে মনে হয়েছিল, সব কিছুই যেন নিয়ন্ত্রণে আছে। একদল বিপথগামী ঘাতকের হাতে রাষ্ট্রপতি খুন হয়েছেন মাত্র।

প্রশ্ন: তার মানে কি আপনি বলতে চান জিয়াউর রহমানের একান্ত সচিব লে. কর্নেল মাহফুজ এই হত্যাকান্ডের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন?
সেদিন সকালে লে. কর্নেল মাহফুজের রহস্যময় আচরণের পাশাপাশি প্রথম লক্ষণীয় ব্যাপার ছিল সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণে সেনা অনুপস্থিতি। লে. কর্নেল মাহফুজ দাবি করেন, সেনাপ্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও ঘটনার তিন ঘণ্টা পর পর্যন্ত রেডিও বা অন্য কোনো মাধ্যমে এ-সংক্রান্ত কোনো ঘোষণা আসেনি। আমাদের তরফ থেকে সকালের দিকে আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ফোনে ঘটনাটি জানাই। এরপর চট্টগ্রামের সঙ্গে বাইরের টেলিযোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ততা বহাল থাকে। পরবর্তিতে ঢাকা থেকে কোনো হেলিকপ্টার আসেনি, ঢাকা থেকেও কেউ আসেনি।

প্রশ্ন: আমার প্রশ্নটা ছিল লে. কর্নেল মাহফুজের সাথে জিয়াউর রহমান হত্যার কি কোনো সম্পর্ক ছিল বলে আপনি মনে করেন?
তার সরাসরি সম্পৃক্ততা তখন বোঝা যায়নি, তবে তার আচরন আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়নি। পরে কোর্ট মার্শালের বিবরন থেকে(যা অন্যান্য সামরিক অফিসারের কাছে শুনেছি)যে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি হত্যাকারিদের ভিতর থেকে জিয়ার গতিবিধি সম্পর্কে খবর দিয়েছিলেন।

প্রশ্ন: জিয়া হত্যার খবর জনগণ কখন জানতে পারে?
রাষ্ট্রপতি জিয়ার খুনের প্রথম ঘোষণাটি আসে চট্টগ্রাম বেতার থেকে। একজন অজ্ঞাত সেনা কর্মকর্তা এই ঘোষণা দেন। ঘোষণায় বলা হয়, জিয়াউর রহমানের সরকারকে হটিয়ে ‘বিপ্লবী কাউন্সিল’ ক্ষমতা দখল করেছে। এভাবে ছয় ঘণ্টা পার হওয়ার পরও সরকারের তরফ থেকে এসম্পর্কে কোনো কিছু বলা হয়নি। পরবর্তিতে উপরাষ্ট্রপতি এক রেডিও ভাষণে অভ্যুত্থানের নিন্দা জানান। তিনি তার বক্তব্যে চট্টগ্রাম সেনা নিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের(বীরউত্তম)উপর জিয়া হত্যার সব দোষ চাপান।

জিয়ার বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া এই সামরিক অভ্যুত্থান কীভাবে ব্যর্থ হলো?
অভুত্থানকালে এক ডজন সেনা চট্টগ্রাম টেলিফোন ভবন এবং আরেক দল টিভি ও রেডিও ভবন দখল করে নেয়। তবে কোনো সেনাকে শহরের রাস্তায় দেখিনি। অভ্যুত্থানকালে বিদ্রোহী সেনা দল শহরের যানবাহন চলাচল বন্ধ করেনি।আসলে কি ঘটেছে বা কি ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে পুরো শহরে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। মেজর জেনারেল আবুল মনজুর(বীরউত্তম)আমাকে (জেলাপ্রশাসক)ও বিভাগীয় কমিশনারকে সেনা নিবাসে ডেকে নিয়ে নিজেকে বিপ্লবী কাউন্সিলের মুখপাত্র হিসেবে পেশ করেন। আমি তখন তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই বিপ্লবী কাউন্সিলে আপনার সাথে আর কে কে আছেন, তখন তিনি সেপ্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর কথা শুনে আমার মনে হয়েছে তিনি মুখস্থ স্ক্রিপ্ট অনুসারে কথা বলছেন।

প্রশ্ন: অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলো কেন ?
ঐদিন চট্টগ্রাম শহরে সামরিক কোন তত্পরতা ছিলনা, তবে আতংকগ্রস্ত মানুষ শহর ছেড়ে পালাচ্ছিল। পরের দিন সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে জেনারেল মন্জুর জেলা প্রশাসকের কা্র্যালয়ে মিলিত হন। কথা বলতে গিয়ে মনজুরের গলার স্বর একটু ভিন্ন মনে হলো। এইসময় তাকে বেশ বিভ্রান্ত মনে হয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো ঢাকায় কার উপর নির্ভর করে কারা এই অভ্যুত্থান করেছিলেন এবং পরবর্তিতে মনজুরকে বিপদের মধ্যে ফেলে তারা কেন পিছ টান দিলেন? আমার যতটুকু মনে হয় ঢাকা থেকে সমর্থন না পাওয়ার কারণেই এই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছিল।

Zia-kofiner-samneপ্রশ্ন: জিয়া হত্যা সম্পর্কে আপনার ব্যক্তিগত মতামত কি?
যে মানুষদের জিয়াউর রহমান নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন তাদের হাতেই তিনি খুন হয়েছেন। এটাকে আমরা কখনো কোন দুর্ঘটনা বলে আখ্যায়িত করতে পারিনা। অন্যদিকে একদল ক্ষুব্ধ সামরিক ব্যক্তিদের আবেগ প্রবণ সিদ্ধান্তের কারণে তিনি খুন হয়েছেন ব্যাপারটা তেমনও নয়। আমার মনে হয় কয়েক বছর ধরে জিয়াকে খুন করার এই পরিকল্পনা করা হয়েছে। দেশ ও আমাদের মতো দলের বাইরের মানুষদের জন্য এটা খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয় যে আজ পর্যন্ত জিয়া হত্যার প্রকৃত সত্য কখনো প্রকাশিত হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে কিনা তাতে সন্দেহ রয়েছে।

প্রশ্ন: জিয়া হত্যার পেছনে আসলে কি ঘটনা কাজ করেছে বলে আপনি মনে করেন?
দুঃখজনক হলো জিয়া হত্যার তিন সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত কোর্টমার্শালে বিদ্রোহের আসল নেতার কোনো ভাষ্য পাওয়া যায়নি। এই বিচারে ১৩ জন অফিসারকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। তারা সকলে আসলেই দোষী ছিলেন কিনা এ ব্যাপারে প্রশ্ন আসতে পারে। জিয়াউর রহমান হত্যার প্রকৃত ঘটনা হয়তো আমরা আর কোনো দিন জানতে পারবোনা। এই খুনের প্রকৃত পরিকল্পনা কারা করেছিলেন তাঁদের চিনতেও পারবনা। সত্য চিরকালই রহস্যাবৃত হয়ে থাকবে। আমাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকেও এই রহস্য তাড়িয়ে বেড়াবে। আমার মনে হয় সামরিক বাহিনীর ভেতরে থাকা ক্ষমতার দন্ধ থেকেই এই হত্যার সৃষ্টি।

প্রশ্ন: কিন্তু জিয়া উররহমানের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপিতো দুইবার ক্ষমতায় ছিল তখন তারা এই হত্যাকান্ডের বিচার কেন করলোনা?
সেটা তারাই ভাল করে বলতে পারবেন।

প্রশ্ন: জেনারেল মনজুরকে কে হত্যা করেছে বলে আপনি মনে করেন ?
পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পরে মনজুরকে সেনা হেফাজতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত বৈধ ছিলনা বলে আমি মনে করি। নির্ভর যোগ্য তথ্য অনুযায়ী পরবর্তিতে ঢাকা থেকে আগত একজন অফিসার মনজুরের ঘরে প্রবেশ করেন। তিনি মনজুরের দিকে পিস্তল তাক করে গুলি করেন ও এরপর সেখান থেকে বেরিয়ে যান। আমার মনে হয় সব কিছু ঘটেছে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসারে।

প্রশ্ন: আপনি দেশ ছেড়ে কেন চলে এলেন?
আমি দেশ ছাড়িনি কোনদিন। আমি দেশে নিয়মিত যাতায়ত করি। আমি যুক্তরাষ্ট্রে আসি উনিশ স’ একাশির আগষ্ট মাসে উচ্চশিক্ষার জন্য সরকার প্রদত্ত বৃত্তি নিয়ে। পড়াশোনার পর আমি বিশ্বব্যাংকে একটি চাকুরির অফার পাই। প্রথমে সরকারি চাকুরি থেকে ছুটি নিয়ে কিছুদিন কাজ করার পর বিশ্বব্যাংকে দীর্ঘমেয়াদি কাজ করার সিদ্ধান্ত নেই এবং সরকারি চাকুরি থেকে অসময়ে অবসর নেই।

প্রশ্ন: আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?
বিশ্বব্যাংকে প্রায় ত্রিশ বছর কাজ করার পর অবসর নিয়েছি কিছুদিন হল। বর্তমানে ফ্রিল্যা্ন্স কনসাল্টিং আর কাগজে লেখালেখি করি। এতে অনেক সময় চলে যায়। আরো কয়েকটি বইএর প্রকল্প আছে।

আরও পড়ুন