বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

শেষ ধাপেও সহিংসতা-অনিয়ম, কেড়ে নিলো ৩ প্রাণ

last upইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের শেষ (ষষ্ঠ ) ধাপের ৭১০ ইউপিতে ভোটগ্রহণ শনিবার শেষ হয়েছে। এখন চলছে গণনা। আগের পাঁচ দফার মতো শেষ দফায়ও সংঘাত-সহিংসতা, গোলাগুলি, কেন্দ্র দখল, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ভোট বর্জনসহ নানান অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। যদিও প্রতিবারের ন্যায় শেষ ধাপেও নির্বাচন কমিশন বলেছিলো ‘সর্বোচ্চ সতর্ক’ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এরপরও কেন্দ্র দখল এবং প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ময়মনসিংহ, ফেনী ও নোয়াখালীতে তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে কমপক্ষে ৫০ জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলিবর্ষণ ও লাঠিচার্জ করে।

দেশের ৪৬ জেলার ৯২ উপজেলায় শনিবার (৪ জুন) সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়, চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। মোট ৭১০ ইউপির সাড়ে ছয় হাজার কেন্দ্রে ১ কোটি ১০ লাখের বেশি ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর-

ময়মনসিংহ: বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে জেলার গফুরগাঁও উপজেলার সালতিয়া ইউনিয়নের পুকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র দখল নিয়ে সদস্য প্রার্থী মোশারফ হোসেন ও আব্দুল করিমের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এসময় পুলিশ ও বিজিবি লাঠিচার্জ ও গুলিবর্ষণ করে। এ সময় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় পড়ে সদস্য প্রার্থী মোশারফ হোসেনের বড় ভাই শাহজাহান মিয়া (৫২) নিহত হন।

ময়মনসিংহ পুলিশ সুপার (এসপি) মঈনুল হক দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, কেন্দ্র দখলকে কেন্দ্র করে দুই সদস্য প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এসময় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় একজন নিহত হয়েছেন।
তিনি জানান, পরিস্থিতি শান্ত করবে পুলিম ও বিজিবি লাঠিচার্জ এবং ‍গুলিবর্ষণ করে।

ফেনী: ফেনীর সোনাগাজীতে কেন্দ্র দখল নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থকদের সংঘর্ষে মো. সুমন (৩০) নামে যুবক নিহত হয়েছেন। উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের চর ভৈরব হাজী তোফায়েল আহমেদ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে শনিবার সকাল ১০টার দিকে ভোট চলাকালে এ ঘটনা ঘটে।

কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার জয়নাল আবদীন জানান, ভোট চলাকালে কেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মোশারফ হোসেন মিলন ও বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী শামসুদ্দিন খোকনের সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মো. সুমন নিহত এবং আরও ৮ জন আহত হন। তাদের সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পর ওই কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়।

এদিকে, নিহত সুমনকে নিজের কর্মী বলে দাবি করেছেন বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী শামসুদ্দিন খোকন। তিনি জানান, সুমন চর ভৈরব ওয়ার্ড যুবদলের কর্মী। আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকদের গুলিতে তিনি নিহত হয়েছেন।

এদিকে, ফেনীর সোনাগাজীর মতিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইকবাল হোসেন নামে বিএনপির এক সমর্থক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

সকাল ৭টার দিকে ভোট শুরুর আগেই আধিপত্য বিস্তারে মতিগঞ্জ এলাকায় ইকবালের বাড়িতে গিয়ে তাকে গুলি করে প্রতিপক্ষ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী বদিউজ্জামানের লোকজন ইকবালকে গুলি করেছে। তিনি ওই ইউপি নির্বাচনে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী দোলনের সমর্থক। তাকে গুরুতর অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

নোয়াখালী: শেষ ধাপের ইউপি নির্বাচনে নোয়াখালীর সদর উপজেলায় নির্বাচনী সহিংসতায় ইয়াছিন আরাফাত (২৭) নামে এক ছাত্রলীগ নেতা নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছে।

শনিবার দুপুরে উপজেলার বেলানগর মোহম্মদিয়া ইবতেদায়ী মাদরাসা কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ইয়াছিন আরাফাত নেয়াজপুর ইউনিয়ন ৩নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

স্থানীয়রা জানান, শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নেয়াজপুর ইউনিয়নের বেলানগর মোহম্মদিয়া ইবতেদায়ী মাদরাসা কেন্দ্রে মেম্বার প্রার্থীর বাচ্চু ও কামালের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসময় প্রতিপক্ষের লোকজন মেম্বার প্রার্থী বাচ্চুর ভাতিজা ইয়াছিন আরাফাতকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

সুধারাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন জানান, বেলানগর কেন্দ্রে দুই মেম্বারপ্রার্থী বাচ্চু ও কামালের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আহত আরাফাতকে ঢাকা নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়েছে।

নোয়াখালী, নড়াইল ও গাইবান্ধায় ভোট বর্জন

দখল, জাল ভোট ও কারচুপির অভিযোগে নোয়াখালী ও গাইবান্ধায় বিএনপি প্রার্থী ও নড়াইলে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

শনিবার সদর উপজেলার ৮নং এওজ বালিয়া ইউনিয়নের বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. শাহজাহান ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।
এদিকে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কামালেরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোট বর্জন করেছেন বিএনপির মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মতলুবর রহমান রেজা। শনিবার সকাল ১০টার দিকে ইউপির বারকোনা উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে তিনি এ ঘোষণা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, ভোটগ্রহণের শুরু থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোট কারচুপি ও ব্যালটে ছিল মেরেছে সরকারদলীয় প্রার্থীর লোকজন। কিন্তু প্রশাসন কোনো ভূমিকা পালন করেনি।

এছাড়া, নড়াইলের লোহাগড়ার প্রতাপুল ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী খান জাহাঙ্গীর নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা করেছেন। শনিবার সকাল ৮টার দিকে নির্বাচন শুরু হওয়ার পর আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এ ঘোষণা দেন।

গত ৫ ধাপে সহিংসতা-অনিয়মের সমালোচনার মুখে নতুন কোনো পদক্ষেপ না নিলেও আগের চেয়ে ভালোভাবে নির্বাচন শেষ করার আশা প্রকাশ করেছে ইসি। আগের ধাপগুলোতে শতাধিক প্রাণহানীসহ আহত হয়েছেন বহু মানুষ। এ ছাড়া ভাঙচুর করা হয়েছে কয়েকশ’ ঘরবাড়ি ও দোকানপাট।

ষষ্ঠ ও শেষ ধাপে চেয়ারম্যান পদে ৩ হাজার ২২৩ জন, সাধারণ সদস্য পদে প্রায় ২৫ হাজার এবং সংরক্ষিত সদস্য পদে প্রায় ৫ হাজার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ২৭ জন প্রার্থী ইতোমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

আরও পড়ুন