বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

মিতু হত্যার ফুটেজ পুলিশের হাতে, খুনের কায়দায় ‘মিল’

Mithuচট্টগ্রামের আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে হত্যা করতে দুর্বৃত্তরা সময় নিয়েছে মাত্র ৫০ সেকেন্ড। এই সময়ের মধ্যেই মিতুর মৃত্যু নিশ্চিত করে তিন হত্যাকারী নির্বিঘ্নে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে সক্ষম হয়। ওই হত্যাকাণ্ড এবং হত্যাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে জিইসি মোড়ের ওয়েল ফুড সেন্টার সংলগ্ন কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরায়। এসব সিসিটিভি ফুটেজ এখন পুলিশের হাতে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং সিসিটিভির ভিডিও দেখে চট্টগ্রামের পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গত দুই বছরে উগ্রপন্থিরা দেশে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তার সঙ্গে পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যার মিল পাচ্ছেন তারা।

রোববার সকাল পৌনে ৭টায় ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে নগরীর জিইসি মোড়ে যাওয়ার সময় খুন হন মিতু।

মোটর সাইকেলে করে আসা তিন হামলাকারী জিইসি মোড়সংলগ্ন মিষ্টির দোকান ওয়েল ফুডের সামনে মাহমুদা আক্তার মিতুকে প্রথমে ছুরি মারে এবং পরে মাথায় গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে যায়। পুরো কাজ শেষ করতে তারা খুবই অল্প সময় নেয় বলে তদন্তকারীদের ভাষ্য।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) উপ-কমিশনার (উত্তর) পরিতোষ ঘোষ বলেন, “ওই সড়কের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে হত্যাকারীরা তিনজই ছিল। মোটর সাইকেল নিয়ে তারা আগে থেকেই ওই এলাকায় অবস্থান করছিল বলে ভিডিও দেখে মনে হয়েছে। তারা মাহমুদা আক্তারের শরীরের বিভিন্ন অংশে স্ট্যাব করে। তারপর মাথার বাঁ দিকে গুলি করে মোটর সাইকেলে করে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে তিনটি বুলেটও পাওয়া গেছে, যার মধ্যে দুটি অব্যবহৃত।”

পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে কিছুদিন আগে ঢাকার পুলিশ সদরদপ্তরে যোগ দেওয়ার আগে গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (এডিসি) হিসেবে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উত্তর-দক্ষিণ জোনের দায়িত্বে ছিলেন বাবুল আক্তার।

গত দুই বছরে চট্টগ্রামে জঙ্গি দমন অভিযানে সহসিকতার জন্য প্রশংসিত হয়েছেন বাবুল আক্তার। বলা হয়, তার তদন্তের জোরেই পুলিশ জেএমবির একটি আস্তানার খোঁজ পায়, গ্রেপ্তার করা হয় ওই জঙ্গি দলের সামরিক শাখার প্রধানকে।

তার স্ত্রী খুন হওয়ার পর সন্দেহের তীর জঙ্গি সংগঠনগুলোর দিকে থাকলেও সব ধরনের সম্ভাবনা মাথায় রেখেই পুলিশ এ ঘটনার তদন্ত করছে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা পুলিশের উপ কমিশনার মোক্তার আহমেদ।

হত্যাকাণ্ডের সময় মিতুর সঙ্গে থাকা তার ছয় বছর বয়সী ছেলে যে বক্তব্য দিয়েছে, তা সিসিটিভি ফুটেজে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলে গেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

প্রথম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলেটি বলেছে, মোটর সাইকেলে যারা এসেছে তারা প্রথমে তাকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে যায়। এরপর একজন তার মাকে ছুরি মারে এবং পরে গুলি করে।

হত্যকাণ্ডে ৭ দশমিক ৬৫ বোরের পিস্তল ব্যবহার করা হয় বলে জানান পুলিশের তদন্ত ব্যুরোর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিদর্শক কবীর হোসাইন।

চলতি বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রেজাউল করিম সিদ্দিকী, টাঙ্গাইলে হিন্দু দর্জি নিখিল চন্দ্র জোয়ারদার, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে সন্তগৌরীয় মঠের অধ্যক্ষ যজ্ঞেশ্বর রায়, এবং গতবছর আশুলিয়ায় পুলিশ হত্যা, দিনাজপুরে ইতালীয় এক পাদ্রীকে হত্যা চেষ্টার ঘটনাতেও হামলাকারী ছিল তিনজন। মোটর সাইকেলে আসে, অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ছুরি, চাপাতি, পিস্তল।

এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ ও র্যা ব। বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “দেশের কয়েকটি জেলায় মোটর সাইকলে করে এসে যেভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তার সঙ্গে এর মিল রয়েছে। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলোর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না- তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিতোষ ঘোষ বলেন, “বাবুল আক্তার জঙ্গি গোষ্ঠী দমনে কাজ করেছে। আমরা বিষয়গুলো মাথায় রেখেই তদন্ত করছি। হত্যাকারীদের ধরতে র্যা ব-পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে।”

গত এপ্রিলে পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি পান চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার বাবুল আক্তার। পদোন্নতির পর গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় পুরিশ সদর দপ্তরে যোগ দেন তিনি। র‌্যাবে দায়িত্ব পালনের পর ২০০৮ সালে সিএমপির কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার হিসেবে বদলি হয়ে আসেন বাবুল আক্তার। এরপর চট্টগ্রামের হাটহাজারি সার্কেলের এএসপি, কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পালন শেষে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার হিসেবে যোগ দেন।

মিতু হত্যার ঘটনায় জঙ্গিদের দিকে সন্দেহের আঙুল তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও বলেছেন,“বাবুল আক্তার একজন দক্ষ, সৎ অফিসার এবং জঙ্গি দমনে প্রচুর কাজ করেছে। তাই তাকে না পেয়ে তার স্ত্রীকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে।”

আরও পড়ুন