‘বন্ধু রঙ্গিলা রঙ্গিলা রঙ্গিলারে, আমারে ছাড়িয়ারে বন্ধু কই রইলারে’ মনে পড়ে গ্রামীণফোনের সেই বিজ্ঞাপনের কথা। কালজয়ী এই ফোক গানটি নতুন করে প্রাণ পায় ২০১০ সালে। গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপনচিত্রে ব্যবহৃত এই গানটি তখন মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। এই বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজেকে সবার কাছে পরিচিত করে তুলেছিলেন বীথি রাণী সরকার। ছোটপর্দার নিয়মিত এই শিল্পীর ক্যারিয়ারে বিজ্ঞাপনের সংখ্যা মাত্র হাফ ডজন। তবে করেছেন অসংখ্য নাটক। চলচ্চিত্রেও রয়েছে ব্যস্ততা। কিন্তু বিথী রানী সরকারকে সবাই এখনো গ্রামীনফোনের বিজ্ঞাপনের সেই গ্রাম্যবধূ হিসাবেই মনে রেখেছেন। দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়া এই সুন্দরী মডেলকে নিয়েই এ প্রতিবেদন।
‘বন্ধু রঙ্গিলা রঙ্গিলা রঙ্গিলারে, আমারে ছাড়িয়ারে বন্ধু কই রইলারে’ কালজয়ী এই ফোক গানটি কোন কণ্ঠশিল্পীর অ্যালবাম বা কোন ছবিতে গানটি ব্যবহারের জন্য নয়। একটি বিজ্ঞাপনচিত্রে ব্যবহৃত গানটি তখন মানুষের মুখে মুখে ফিরতে থাকে। পূরণ এই গান নতুন করে এতো আলোড়ন তোলার কারণ শুধু হাবিব ওয়াহিদের অনবদ্য সঙ্গীত আর ন্যান্সির সুমিষ্ট কণ্ঠ নয়, আরো দুটি মানুষ জড়িত ছিল এই অলিখিত ইতিহাস তৈরির পিছনে। একজন দেশের অণ্যতম গুণী বিজ্ঞাপন নির্মাতা অমিতাভ রেজা আর অন্যজন হলেন বিথী রাণী সরকার। আজকে বিথীকে সবাই ছোট ও বড়পর্দায় নিয়মিত অভিনয় করতে দেখলেও এটাই ছিল একটা আনকোরা মেয়ে বিথীর প্রথম কাজ। এক মাসের মাথায় একটি সাধারন মেয়ে হয়ে উঠেছিলেন রিতীমতো তারকা। শুধু তাই নয়, হাজারো তরুণের স্বপ্নকণ্যার আসন করে নেওয়া মেয়েটি দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি গ্রামীনফোনের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসাবেও দায়িত্ব পেয়ে যান। এই গল্প যেকোন দিবাস্বপ্ন বা ডিজনি ওয়ার্ল্ডের কোন মায়ার চেয়ে কম ছিল না বিথীর কাছে। কেননা ছোটবেলা থেকে নায়িকা হতে চাওয়া মেয়েটি হুট করেই এমন সুযোগ পেয়ে যাবেন তা নিজেও ভাবতে পারেননি।
কিভাবে মডেলিংয়ে আসা যায় তা জানতে নিজেই গিয়েছিলেন অমিতাভ রেজার হাফ স্টপ ডাউনে। ভাবনাতেও ছিল না ওই দিন তাকে দেখে স্বয়ং অমিতাভ রেজা ফোন করে এই ঐতিহাসিক বিজ্ঞাপনে তাকে সুযোগ দেবেন। ঐতিহাসিক বলা এই অর্থে যে মাত্র এক মিনিটের একটি টিভিসির শুটিং হয়েছিল টানা ১১ দিন ধরে। যেখানে মাত্র একটি মেয়ে অভিনয় করবেন। বিথী অনেকটা দৃঢ়তার সঙ্গেই বললেন, ‘অন্তত এগার বছর যাতে মানুষ টিভিসিটি মনে রাখে এজন্যই হয়ত ১১ দিন ধরে শুটিং করতে হয়েছিল। কল্পনা করতে পারেন টানা ১১দিন আমি একটি মাত্র মানুষ ক্যামেরার সামনেই ছিলাম। দম ফেলারও যেন ফুসরত ছিল না। কারণ এর শুটিং লোকেশনও ছিল মাত্র দুটি। প্রথমে ১০ দিন কাজ হয় দিনাজপুরের একটি প্রত্যন্ত পল্লীতে। পরে পানির নিচে আমার ডুবে যাওয়ার দৃশ্যটি আলাদা করে ধারন করা হয় বিএফডিসির সুইমিং পুলে।’ বিথীর জীবনের প্রথম শট হয়েছিল এক টেকেই ওকে। ‘এখানে কোন কিছু কৃত্রিম ছিল না। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশে কাজ করেছি। রোদের প্রখর তেজ-ঝড়ো বাতাস-হারিকেনের আলো-বৃষ্টি-খালের ঘোলা জল-ঘাসের ওপর শিশির বিন্দু সবই প্রাকৃতিক। আমার প্রথম শটটি ছিল বাতাসে চুল ওড়ানো। এক টেকেই ওতে হয়, এরপর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তারপর তো পুরো কাজ অনেক সুন্দর করে শেষ করি। ফল কি তা সবার জানা, বিগত কয়েক বছরের সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভিসি ছিল এটি’ বললেন বিথী। এত বড় একটি কাজ হবে আর একটু ঝামেলা থাকবে না তা কি হয়? শোনা যাক বিথীর মুখেই, ‘সবচেয়ে কঠির ছিল এফডিসিতে শুটিং করা। আমি সাতার কাটতে পারি না। তারমধ্যে এক্সপ্রেশনসহ আমাকে পানির নিচে ডুবে যাওয়ার শট দিতে হয়েছিল। ওই এক শট ওকে করতে কত যে পানি খেতে হয়েছিল তার ইয়ত্তা নেই’ বললেন বিথী।
একটি মন খারাপের ঘটনাও ঘটেছিল তার। বললেন, ‘একটি দৃশ্য ছিল ঝড় আসার আগেই আমি মুরগীর বাচ্চাগুলোকে ঘরে নিতে তাড়া করছি। শটের আগেই কেন যেন মনে হচ্ছিল পায়ের নিচে পড়ে না যায় বাচ্চাগুলো। ঠিকই তাই হলো, শট শেষে দেখি একটা বাচ্চা আমার পায়ে পিষ্ট হয়ে মরে গেছে। এই ঘটনার পর দুই ঘন্টা আমি শুধু কেদেছি। শুটিংয়ে মনই দিতে পারছিলাম না।’
এই টিভিসিতে শহরে থাকা কর্মজীবী স্বামীর জন্য একজন গ্রাম্যবধূর যে অপেক্ষা, কথা না বলতে পারা-প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার যে আকুলতা তা বোঝানো হয়। এজন্য বিথীকে মেক আপের বদল মেক ডাউন করে কালো করা হয়। এজন্য নাকি তাকে সাধারন দর্শক দেখলেও চিনতে পারত না। দেখা যাচ্ছে একই বাসে তার পাশে বসে ওই টিভিসিতে তার অভিনয় বা রূপমাধূর্য্যরে প্রসংসা করছে কেউ, অথচ তাঁকে চিনতেই পারছে না। শুধু সাধারন দর্শক নয়, গুণী অভিনেতা-নির্মাতা গাজী রাকায়েত তার ছবি ‘মৃত্তিকা মায়া’ করার আগে বিথীকে কালো ভেবে অভিনয়ের প্রস্তাবও দেন। পরে তাঁকে সামনে এতোটা গ্ল্যামারাস দেখে অবাক হন। তবে বিথীর এই গ্লামারের ছটাও দেখা গেছে আরএফএল দুরন্ত সাইকেল, আরএফএল করফারেন্স চেয়ার বা একটি ফেসওয়াসের টিভিসিতে। মাত্র হাফ ডজন বিজ্ঞাপন করেছেন এ পর্যন্ত, কিন্তু সবগুলোই লোকপ্রিয়। কারণ বিথী চাননা প্রথম কাজেই যে ভালোবাসা মানুষের কাছ থেকে পেয়েছেন, তা যেনতেন কাজ করে হারিয়ে ফেলতে। তিনি লম্বা রেসের ঘোড়া হয়ে আজীবন মিডিয়াতে টিকে থাকতে চান একজন জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা ও নন্দিত মডেল হয়ে।


