দেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে ‘আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র’ দেখছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। শুক্রবার সকালে ঢাকায় এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, “আমরা এই জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদকে ঘৃণা করি। এটি একটি জাতীয় সমস্যা, এটা দলীয় সমস্যা নয়। এর পেছনে একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র কাজ করছে, এটা আমাদের অবিশ্বাস করার উপায় নেই।”
আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা বললেও কোন দেশ এর পেছনে রয়েছে- সে বিষয়ে কিছু বলেননি মওদুদ।
অবশ্য দিল্লিতে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ মেন্দি এন সাফাদির সাম্প্রতিক বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে পুলিশও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের সন্দেহের কথা বলে আসছে, যেখানে অভিযোগের তীর ছোড়া হয়েছে বিএনপির দিকেই।
পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম গত ১৪ জুন এক ব্রিফিংয়ে বলেন, “সম্প্রতি আপনারা জানেন, আসলাম চৌধুরী নামের একজন ভদ্রলোক যিনি একটি দলের যুগ্ম মহাসচিব, তিনিও গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের উদ্দেশ্য এবং এদের উদ্দেশ্যে অনেক মিল রয়েছে।
“যেমন মোসাদের সঙ্গে মিটিং করে ইন্ডিয়াকে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছিল যে মাইনরিটি কমিউনিটি অর্থাৎ হিন্দুদের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে এবং এরা (জঙ্গি) সরাসরি হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত।”
২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার ৪০টির বেশি ঘটনা ঘটেছে, যাতে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লেখক, ব্লগার, প্রকাশক যেমন খুন হয়েছেন, তেমনি জঙ্গি কায়দায় হত্যার শিকার হয়েছেন বিদেশি নাগরিক, ভিন্ন মতাবলম্বী মুসলমান,ধর্মীয় সংখ্যালঘু পুরোহিত, পাদ্রি, ভিক্ষু এবং সমকামী অধিকারকর্মী।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দেশে জঙ্গি কর্মকাণ্ড এবং একের পর এক গুপ্তহত্যার পেছনে বিএনপি-জামায়াতের হাত থাকার কথা বলে আসছেন। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘তথ্য আছে’ বলেই তার ওই অভিযোগ।
অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পাল্টায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের রাজনৈতিক মিত্ররাই গুপ্তহত্যায় জড়িত।
আর শুক্রবার সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের উদ্যোগে ‘সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বিএনপি নেতা মওদুদ বলেন, দেশে ‘গণতন্ত্র নেই বলেই’ জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের ‘উত্থান’ সম্ভব হয়েছে।
কেবল ‘পুলিশ ও র্যাব দিয়ে উগ্রবাদ দমন সম্ভব নয়’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সরকারের একার পক্ষে এই জঙ্গিবাদের উত্থান দমন করা সম্ভব নয়। আমি মনে করি, এটার আরও অবনতি ঘটবে। এই পুলিশ ও র্যাব দিয়ে এই জঙ্গিবাদ দমন করা সম্ভবপর হবে না। কারণ তাদের জনবল ও সম্পদ সীমিত।”
এজন্য দুটি কাজ করতে হবে বলে মওদুদ মনে করছেন। প্রথমত, অবিলম্বে একটি ‘সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ’ নির্বাচনের মাধ্যমে ‘জনপ্রতিনিধিত্বশীল জবাবদিহিমূলক’ একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা। এবং দ্বিতীয়ত, সরকারকে ‘সত্যিকার অর্থে’ একটি ‘জাতীয় প্ল্যাটফর্ম’ তৈরি করতে হবে, যেখানে বিএনপিও ‘সহযোগিতা’ দেবে।
“আমরা বিশ্বাস করি, গণতন্ত্র ফিরে এলে জঙ্গিবাদের অবসান অবশ্যই ঘটবে,” বলেন মওদুদ।
১৬ জুন ‘সংবাদপত্রের কালো দিবস’ পালনের অংশ হিসেবে বিএনপি সমর্থক ‘সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ’ এই আলোচনাসভার আয়োজন করলেও সাংবাদিক ইউনিয়ন নেতাদের কাউকে দেখা যায়নি। অনুপস্থিত ছিলেন সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাংবাদিক রুহুল আমিন গাজীও।
১৯৭৫ সালের এই দিনে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে চারটি সংবাদপত্র রেখে বাকি সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয় তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার। বিএনপি ওই দিনটি ‘সংবাদপত্রের কালো দিবস’ হিসেবে পালন করে প্রতিবছর।
সাংবাদিক শফিক রেহমান, মাহমুদুর রহমান, শওকত মাহমুদ, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নাকে ‘মিথ্যা অজুহাতে’ সরকার কারাগারে বন্দি করে রেখেছে অভিযোগ করে সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ বলেন, “যারা বলিষ্ঠ কণ্ঠে এ সরকারের প্রতিবাদ করেছে, তাদেরই কারাবন্দি করা হয়েছে।”
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “আজ গণমাধ্যম আছে, কিন্তু তাদের স্বাধীনতা নেই। তারা নিয়ন্ত্রিত। এজন্যই সাংবাদিক শফিক রেহমান, মাহমুদুর রহমান, শওকত মাহমুদরা আজ জেলে। এটাই ১৬ জুনের বহিঃপ্রকাশ।”
শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের প্রধান অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের সদস্য সচিব অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুল আলম, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ডা. মোস্তাক রহিম স্বপন, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন মেজবাহ, জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক জোটের রফিকুল ইসলাম, বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন।


