ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে হতবিহ্বল হয়ে বসে ছিলেন মেহবুবা হাসান। রাতভর কেঁদে কেঁদে তার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। অধিক শোকে যেন পাথর হয়ে গেছেন তিনি। হওয়ারই কথা, চোখের সামনে আগুনে দগ্ধ হয়েছেন স্বামী প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসান। কাচঘেরা আইসিইউতে দেখেছেন তার করুণ মৃত্যু। প্রিয়জনের দগ্ধ নিথর দেহখানি চোখের সামনেই নেওয়া হয়েছে গ্রামের বাড়ি বগুড়ায়। কিন্তু সঙ্গে যেতে পারেননি তিনি। এই বার্ন ইউনিটেই এখনও যে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে তার অতি আদরের দুই শিশুসন্তান। জীবনে এমন নির্মম পরিস্থিতির জন্য কারই বা প্রস্তুতি থাকে!
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের ট্রপিক্যাল আলাউদ্দিন টাওয়ার নামের শপিং কমপ্লেক্সের লিফট ও অগি্ন দুর্ঘটনায় ট্রপিক্যাল হোমসের এজিএম মাহমুদুল হাসান, তার দুই সন্তান মেহেনাজ হাসান মাইশা (১০) এবং ৮ মাসের ছেলে মুত্তাকিন দগ্ধ হয়েছিলেন। গতকাল শনিবার ভোরে আইসিইউতে মারা যান মাহমুদুল। এ নিয়ে ওই দুর্ঘটনায় ছয়জন মারা গেলেন। মাইশা ৫৫ ভাগ ও মুত্তাকীন ২৩ ভাগ দগ্ধ হয়েছে। তারা এখনও বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন।
এদিকে ট্রপিক্যাল আলাউদ্দিন টাওয়ারের লিফট দুর্ঘটনা ও অগি্নকাণ্ডের পর সৃষ্ট বিস্ফোরণের কারণ এখনও উদ্ঘাটন করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। বিস্ফোরণের ঘটনাটিকে রহস্যজনক বলছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। দুর্ঘটনার পর গতকালও শপিংমলটি বন্ধ ছিল। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের আগে এমন দুর্ঘটনা এবং দোকান বন্ধ রাখায় তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, গত রোজায়ও শপিং কমপ্লেক্সের একটি লিফট ছিঁড়ে পড়েছিল। তবে তাতে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। মার্কেট কর্তৃপক্ষের নানা অব্যবস্থাপনার কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন বলে তাদের অভিযোগ।
বাবার সঙ্গে ঈদ করা হলো না সন্তানদের :মাহমুদুলের মেয়ে মেহেনাজ হাসান মাইশা উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। ছোট্ট শিশুটি বায়না ধরেছিল, এবার বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দি গিয়ে ঈদ করবে। ৮ মাস বয়সী মুত্তাকিনকেও জন্মের পর গ্রামে নেওয়া হয়নি। তাই বাবাও সায় দিয়েছিলেন মেয়ের আবদারে। কিন্তু কী নিষ্ঠুর নিয়তি! মাইশার সেই বাবা মেয়ের আবদার পূরণ না করেই চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। মেয়ে আর ছেলেও এখন হাসপাতালে। গতকাল সকালে বার্ন ইউনিটের সামনে বসে স্বজনরা এসব স্মৃতি হাতড়ে অঝোরে কাঁদছিলেন।
মাহমুদুলের ছোট ভাই সুমন জানান, ভোর ৪টার দিকে তার ভাইকে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। এরপর পারিবারিক সিদ্ধান্তে ভাবিকে হাসপাতালে দুই সন্তানের পাশে রেখে ভাইয়ের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন পার্থ শঙ্কর পাল জানান, ৮০ ভাগ দগ্ধ অবস্থায় মাহমুদুল মারা যান। তার দুই সন্তানের অবস্থাও সংকটাপন্ন। তাদের চিকিৎসায় বার্ন ইউনিটের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আবুল কালামকে প্রধান করে আট সদস্যদের চিকিৎসা বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
স্বজনরা জানান, দুর্ঘটনাকবলিত টাওয়ারের প্রথম বেজমেন্টে ভবন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ট্রপিক্যাল হোমসের জোনাল অফিস। এর দায়িত্বে ছিলেন নিহত মাহমুদুল। শুক্রবার ওই অফিসে ইফতার অনুষ্ঠান ছিল। এতে তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে এসেছিলেন। ইফতারে তার স্ত্রী, মা-বাবারও যোগ দেওয়ার কথা ছিল। তারা আসার আগেই দুর্ঘটনাটি ঘটে।


