সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে উদারপন্থী, নাস্তিক, বিদেশি নাগরিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব হামলার বেশির ভাগেরই দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস) ও আল কায়েদা। তবে বাংলাদেশের পুলিশের দাবি, এই দুটি জঙ্গি সংগঠনের কোনওটাই বাংলাদেশের এসব হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত নয়। বাংলাদেশ পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বৃহস্পতিবার এ সম্পর্কিত এক বিস্ফোরক তথ্য দিয়ে বলেছেন, “শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর বরখাস্ত হওয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এক মেজর জিয়াউল হক এসবের পেছনে জড়িত।” বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মনিরুল ইসলাম এই দাবি করেন।
উদারপন্থী, নাস্তিক, বিদেশী, সমকামী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর জঙ্গি হামলার হার এতই বেড়েছে যে গত কয়েক মাসে নিহত অন্তত ৩০ জনের হত্যার দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট ও আল কায়েদা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বরাবরই দাবি করা হয়েছে, এই দুই আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী বাংলাদেশের কোনও সহিংসতার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। কিন্তু হিন্দু মিশনে হামলার হুমকির প্রেক্ষিতে পুলিশ জানিয়েছে, স্থানীয় সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠনগুলোও আল-কায়েদার পদ্ধতিতে সহিংস কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। ফলে হামলার ঝুঁকির মধ্যে সত্যতা রয়েছে। তারা আরও জানায়, এক সাবেক সেনা সদস্য ২০১১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়েছেন।
গোয়েন্দা সংস্থা জানায়, জিয়াউল হক একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কোর থেকে এসেছেন এবং তিনি বিশেষ অভিযান চালানোর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এক সেনা মুখপাত্র জানান, জিয়াউল হককে পাঁচ বছর আগে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। সেই থেকে তার কোনও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানে না সেনাবাহিনী।
আনসারের সঙ্গে জিয়াউল হকের সংশ্লিষ্ট থাকার প্রমাণ প্রথম ২০১৩ সালে পাওয়া যায় বলে জানায় পুলিশ সূত্র। জিয়া জঙ্গিদের যুদ্ধ ও বোমা তৈরি ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন বলে জানায় পুলিশ।
নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে আনসার আল-ইসলাম বাংলাদেশ (এবিটি) ও জামাত উল-মুজাহিদিন (জেএমবি) নামের দুটি স্থানীয় জঙ্গি দল রয়েছে যারা এই ধরনের হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। এদের মধ্যে আল কায়েদার সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে বলে এবিটি দাবি করে থাকে। এবিটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ও ভয়াবহ একটি দল। সিটিটিসি ইউনিট প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এতদিনে এবিটির সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা হয়ে গিয়েছে। তাদের নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কেও আমরা জানতে পেরেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এবিটি আল কায়েদার আদর্শের অনুসারী। তাদের নেতারা বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে আসা শিক্ষিত মানুষ। এই দল উপমহাদেশে আল-কায়েদার শাখার সঙ্গে মৈত্রী ঘোষণা করেছে। আল কায়েদার নেতা আয়মান আল-জাওয়াহরির নেতৃত্বও স্বীকার করেছে।’
আনসার আল-ইসলামের এই আকস্মিক উত্থানের সঙ্গে এক সাবেক সেনা কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও উদ্বিগ্ন পুলিশ প্রশাসন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা মেজর সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক ২০১১ সালে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর থেকেই আত্মগোপন করে আছেন। এ বিষয়ে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সন্দেহ, এই প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তাই এদের নেতা। তিনি আত্মগোপন করে আছেন, কিন্তু আমরা তার ক্ষমতার মাত্রা জানি। তিনি যদি আনসারের সঙ্গে থাকেন তবে তা তাদের জন্য একটি বড় শক্তির জায়গা হবে।’


