‘এক দফা এক দাবি, আরেফিন তুই কবে যাবি। আরেফিন তুই রাজাকার, এই মুহূর্তে গদি ছাড়।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের বাসভবনের গেটে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে বাইরে থেকে এই স্লোগান দিচ্ছে ছাত্রলীগ।
ইতিহাস বিকৃতিকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমানকে অব্যাহতি দেয়ার পর এবার উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের পদত্যাগের দাবিতে আল্টিমেটাম দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ। উপাচার্যের বাসভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে তার পদত্যাগের দাবিতে ফটকের সামনে অবস্থান করছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
শুক্রবার বেলা সাড়ে চারটার দিকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে দ্বিতীয় দফার বিক্ষোভে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এ পদত্যাগের দাবি জানান। সন্ধ্যার দিকে তারা উপাচার্যের বাসভবনে ঢোকার ফটকে তালা দিয়ে দেন।
ছাত্রলীগের দাবি, আজ (শুক্রবার) রাত আটটার মধ্যে উপাচার্য পদত্যাগ না করলে আগামীকাল শনিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট পালন করবেন তারা। আজ বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিক্ষোভ চলছিল।
এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ৯৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রকাশিত স্মরণিকায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করার প্রতিবাদে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ করছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ। তার গাড়িও ভাঙচুর করেছে ছাত্রলীগ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান বলেন, একটি দায়িত্বশীল পদে থেকে উপাচার্য এ দায় এড়াতে পারেন না। আমরা মনে করি, এ ঘটনার সঙ্গে তিনিও জড়িত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স বলেন, আজ রাত আটটার মধ্যে উপাচার্য পদত্যাগ না করলে আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ঘোষণা করা হবে।
শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে মধুর ক্যান্টিন থেকে মিছিল নিয়ে এসে ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছে ছাত্রলীগ। এর আগে ব্যক্তিগত গাড়িতে করে বাসভবনে যাওয়ার পথে টিএসসির সামনে ভিসির গাড়িতে ভাঙচুর চালিয়েছে তারা। এসময় চালক দ্রুত গাড়ি চালিয়ে তাকে বাসভবনে পৌঁছে দেন। গাড়িটির সামনে কাচ ভেঙে ভিসির গায়েও পড়েছে। তবে তিনি গুরুতর আহত হননি। এর আগে প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারকে তার কার্যালয়ে তালাবন্দি করে রাখাও হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মারকগ্রন্থে জিয়াউর রহমান হলের বর্ণনায় লেখা হয়েছে, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, সাবেক সেনাপ্রধান এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা। এটি লেখেন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমান।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান উদ্বোধন ও শোভাযাত্রা শেষে টিএসসিতে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় বিষয়টির প্রতিবাদ জানান বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই সদস্য সুভাষ সিংহ রায়। পরে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক প্রসপেক্টাসটি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করেন এবং তদন্ত কমিটি গঠন করে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেন।
পরে দুপুরের দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি আবিদ আল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স নেতাকর্মীদের নিয়ে মধুর ক্যান্টিন থেকে একটি মিছিল নিয়ে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে এসে বিক্ষোভ শুরু করেন।
মিছিলে অংশ নেয়া অনেকের হাতে ঝাড়ুও দেখা গেছে।
জানতে চাইলে আবিদ আল হাসান বলেন, যদি এদের বিচার না করা হয় তাহলে আজ থেকে পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকবে।
মোতাহার হোসেন প্রিন্স বলেন, সন্ধ্যার মধ্যে যদি রেজিস্ট্রার পদত্যাগ না করেন তবে তাকে টেনে-হিঁচড়ে নামানো হবে।
এর আগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি আদিত্য নন্দী এবং মেহেদী হাসান রসির নেতৃত্বে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রেজিস্ট্রারকে তার কার্যালয়ে তালাবন্দি করে রাখা হয়।
স্মরণিকায় জিয়াকে প্রথম রাষ্ট্রপতি লেখার বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, ‘এটা ছাপার ভুল।’
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি স্মরণিকা প্রকাশ করে। এই স্মরণিকায় ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৯৫ বছর উদযাপন কমিটির সদস্যসচিব রেজাউর রহমান ‘স্মৃতি অম্লান’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লেখেন। এই লেখায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল পরিচিতি তুলে ধরতে তিনি লিখেছেন, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, সাবেক সেনা প্রধান ও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
জিয়াকে প্রথম রাষ্ট্রপতি বলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের কক্ষে তালা দিচ্ছেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। জিয়াকে প্রথম রাষ্ট্রপতি বলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের কক্ষে তালা দিচ্ছেন ছাত্রলীগের কর্মীরা।বিষয়টি শিক্ষার্থীদের নজরে এলে টিএসসিতে আজকের আলোচনায় সভায় ছাত্রলীগের নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানান। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ওই স্মরণিকা বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে স্মরণিকা কমিটিও বাতিল ঘোষণা করেন।
সভা শেষে দুপুর ১২টা থেকে পৌনে একটা পর্যন্ত ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রেজাউর রহমানকে তার কার্যালয়ে তালাবন্দী করে রাখেন। প্রতিবাদে তারা স্মরণিকায় আগুন ধরিয়ে দেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আমজাদ আলী ঘটনাস্থলে গিয়ে রেজাউর রহমানকে তালামুক্ত করে বের করে নিয়ে যান।
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের মধ্যে থাকা বিএনপি-জামায়াত ইতিহাস বিকৃতির কাজটি করেছে। ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে যারা যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
মুলতবি করার পর আবার বিক্ষোভ শুরুর বিষয়ে জানতে চাইলে সোহাগ বলেন, এটা কোনো ছোট ভুল না। ওই স্মরণিকা প্রকাশের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।


