ঢাকার কূটনৈতিক পাড়া গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে বন্দুকধারী জঙ্গিদের হাতে ১১ ঘণ্টা জিম্মি সঙ্কটের পর সামরিক বাহিনীর কমান্ডো দল উদ্ধার অভিযান শুরু করে। শুক্রবার রাত পেরিয়ে যাওয়ার পর শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার পর এই অভিযান শুরু হয়। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া যায় ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ। শুরুতেই সেনা সদস্যরা নারী ও শিশুসহ পাঁচজনকে উদ্ধার করে নিরাপদে সরিয়ে নেয়।
সাড়ে ৭টার পরপর সোয়াতের একটি দল একটি অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে ওই রেস্তোরাঁ দিকে এগোতে থাকে। এর পর পর কয়েক দিক থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সমন্বিত অভিযান শুরু করে।
শনিবার সকাল ৭টা ২০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর বড় পাঁচটি ট্রাক, ছোট জিপ ১০টি, নয়টি ট্যাংকের মতো দেখতে সাজোয়া যানসহ বিশাল বহর আসে।
এদিকে সেনাবাহিনী আসার কিছুক্ষণ পরই অর্থাৎ সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে মূল অভিযান শুরু করা হয়। সেনা সদস্যদের সঙ্গে অভিযানে অংশ নেয় নৌবাহিনীর কমান্ডো, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাবের বিশেষ বাহিনী।
অভিযান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রেস্টুরেন্টের ভেতর থেকে অস্ত্রধারীরা গুলি ছুড়ে। এসময় পাল্টা গুলি চালায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। তবে জিম্মিদের জীবিত উদ্ধারে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে তারা। অন্যদিকে আকাশেও হেলিকপ্টর দিয়ে টহল দেয়া হচ্ছে।
অস্ত্রধারীরা যাতে রেস্টুরেন্টের পাশে থাকা লেক দিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে, সে জন্য নৌ বাহিনীর একটি কমান্ডো টিম মোতায়েন করা হয়েছে। সাথে রয়েছে ফায়ার সার্ভিসের টিমও। রাতে তাদের স্পট লাইট বসানো হয়। ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছেন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু বেলাল মো. শফিউল হক। সেই সঙ্গে আছেন বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান।
এর আগে শুক্রবার মধ্য রাত থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রস্তুতিতে নিতে শুরু করেন। ভোর পাঁচটার দিকেই তাদের প্রস্তুতি শেষ হয়। পরে আশপাশে অবস্থান নেওয়া সংবাদকর্মীদের পুলিশ নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দেয়।
শনিবার সকাল ৬টার দিকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি সেখানে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। সকাল সাতটায় সাতটি সাঁজোয়া যাসহ সেনাবাহিনীর একটি দল ওই এলাকায় অবস্থান নেয়।
এর আগে শুক্রবার রাত পৌনে নয়টার দিকে গুলশানের ৭৯ নম্বরের আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ৮ থেকে ১০ জন যুবক অতর্কিত হামলা চালায়। এরপর তারা ওই রেস্তোরাঁয় থাকা লোকজনকে জিম্মি করে। জিম্মিদের মধ্যে অন্তত ২০ জন বিদেশি নাগরিকসহ ৩০-৩৫ জন আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর থেকে পুরো চার কিলোমিটার এলাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘিরে রাখে।
আর্টিজান বেকারি নামের ওই রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার কিছুক্ষণ পর পুলিশের অগ্রগামী দলের দুই কর্মকর্তা জঙ্গিদের গুলি ও বোমায় নিহত হন। আহত হন অন্তত ৪০ জন পুলিশ সদস্য। নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তা হলেন, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিন।
গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতাল সূত্র জানায়, ওই হাসপাতালে মোট ৩৬ জন আহত ব্যক্তিকে নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে দুজন মারা গেছেন। এখন ভর্তি আছেন ২৪ জন। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
জঙ্গি হামলা চালিয়ে দেশি-বিদেশি নাগরিকদের জিম্মি করার ঘটনায় দায় স্বীকার করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)।
এই ধরনের অতর্কিত হামলা চালিয়ে মানুষজনকে জিম্মি করার ঘটনা বাংলাদেশে এটাই প্রথম।


