বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

ইরাকে যুদ্ধ: আগেই বুশকে কথা দেন ব্লেয়ার

INQUIRY+SLAMS+BLAIR+OVER২০০৩ সালে ইরাকে সেনা অভিযান শুরুর আট মাস আগে তৎকালীণ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ওই সময়কার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে কথা দিয়ে বলেছিলেন, “যাই হোক, আমি আপনার সঙ্গে থাকব।”

টনি ব্লেয়ার ইরাকে বিধ্বংসী অস্ত্রভাণ্ডার থাকার ত্রুটিপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য এবং অসন্তোষজনক আইনি পরামর্শের ওপর নির্ভর করেছিলেন। সাত বছরের চিলকোট তদন্ত প্রতিবেদনে একথা বলা হয়েছে।

ব্লেয়ারের নেতৃত্বের কড়া সমালোচনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকে বিধ্বংসী অস্ত্রভাণ্ডার থাকার হুমকিকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছিল। এছাড়া, অপ্রস্তুত অবস্থায় যুক্তরাজ্যের সেনাদের সেখানে অভিযানে পাঠানো হয় এবং যুদ্ধ পরিবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলার ‘যথেষ্ট পরিকল্পনা’ও গ্রহণ করা হয়নি।

সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরাকের একনায়ক সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল কিনা তা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে।

যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের অংশ গ্রহণের যে সিদ্ধান্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার নিয়েছিলেন সেটির আইনি ভিত্তি এবং প্রয়োজনীয়তা কতটুকু ছিল তা নিয়ে ২০০৯ সালে শুরু হওয়া তদন্ত শেষ হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন জন চিলকোটকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন এবং ইরাক যুদ্ধ নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন।

তদন্ত কমিটি এক বছরের মধ্যে তদন্ত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছর পর বুধবার ব্রিটিশ অনুসন্ধানীমূলক চিলকোট কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনে ক্রুটিপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্যের পর্যাপ্ত মূল্যায়ন ছাড়াই ইরাক অভিযানে অংশগ্রহণ করায় ব্লেয়ারের কড়া সমালোচনা করে বলা হয়েছে, ‘শান্তিপূর্ণ আরও পথ থাকতেও  যুক্তরাজ্য ওই যুদ্ধে জড়িয়েছিল’।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময় ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রভাণ্ডার থাকার অনুমানের ভিত্তিতে ইরাকের একনায়ক সাদ্দাম হোসেন বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছেন বলে যে তথ্য দেওয়া হয় তা ছিল অতিরঞ্জিত। এছাড়া, যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলা করার পরিকল্পনায়ও যথেষ্ট গলদ ছিল।

জবাবে ব্লেয়ার বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ‘সরল বিশ্বাসে’ তিনি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি এখনও বিশ্বাস করেন, ওই সময়ে সাদ্দামকে উৎখাত করাই ছিল সবচেয় ভাল সিদ্ধান্ত।

তবে ব্লেয়ারের সিদ্ধান্তের অনেক সমালোচনা করা হলেও তদন্ত প্রতিবেদনে ইরাক অভিযানের বৈধতা নিয়ে উঠা প্রশ্নের অবসান হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পর চিলকোট বলেন, “পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, ইরাকে সামরিক অভিযানের একটি আইনি ভিত্তি ছিল। যদিও সেটি সন্তোষজনক পর্যায় থেকে অনেকটাই দূরে।”

ইরাক যুদ্ধে প্রায় ১৭৯ জন ব্রিটিশ সেনার মৃত্যু হয়। নিহত সেনাদের পরিবার থেকে ব্লেয়ারের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার অভিযোগ তোলা হয়েছিল।

চিলকোট তদন্ত প্রতিবেদনের পর তাকে ওই অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া উচিত বলে মনে করেন ব্লেয়ার।

এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে ঠকানো, মিথ্যা বলা ও প্রতারণার বাকি যে অভিযোগ ছিল এ তদন্ত প্রতিবেদনে সেগুলো বাতিল হয়ে যাবে।”
“সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের যে সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছিলাম, জনগণ তার পক্ষ নিতে পারে আবার বিপক্ষেও যেতে পারে। আমি সরল বিশ্বাসে ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং ওই সময় আমার বিশ্বাস ছিল এতেই আমার দেশের সবচেয়ে ভাল হবে।”

২০০৩ সালের মার্চে ইরাকে সামরিক অভিযান শুরুর আগের কয়েক মাসে ব্লেয়ার ও বুশের মধ্যে কী আলোচনা হয়েছে এ তদন্ত প্রতিবেদনে তার উপর আলোকপাত করার চেষ্টা করা হয়।

২০০২ সালে ২৮ জুলাই তারিখে ব্লেয়ার বুশকে বলেন, “যাই হোক, আমি আপনার সঙ্গে আছি। কি ধরনের সমস্যা হতে পারে এই মুহূর্তে সেটা পরিমাপ করা দরকার।”

“এটি নিয়ে পরিকল্পনা করা ও কৌশল নির্ধারণ করা সবচেয় কঠিন হবে। কারণ এটি কসোভো নয়। এটি আফগানিস্তান নয়। এমনকি এটি উপসাগরীয় যুদ্ধও নয়।”

চিলকোট বলেন, যুক্তরাজ্যের সমর্থনের প্রস্তাব দিয়ে বুশের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে চেয়েছিলেন ব্লেয়ার।

“ইরাকের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে যতটুকু প্রভাবিত করার ক্ষমতা ব্লেয়ারের ছিল, তিনি নিজেকে তার থেকে বেশি সক্ষম ভেবেছিলেন।”

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যখন ইরাকে অভিযান চালানো হয় তখন সাদ্দামের তরফ থেকে প্রকৃতপক্ষে কোনো হুমকিই ছিল না।

ইরাকে বিশৃঙ্খলার কারণে ওই অঞ্চলে কি হতে পারে সেটিও আগে অনুমান করা উচিত ছিল।

ইরাক যুদ্ধে অন্তত দেড় লাখ ইরাকির মৃত্যু হয়, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। গৃহহীন হয় ১০ লাখের বেশি মানুষ।

আরও পড়ুন