বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ঈদের সেমাই খেয়ে কিলিং মিশনে যায় জঙ্গিরা

Sholakia houseঈদের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদগাহের কাছে টহলরত পুলিশের ওপর বোমা, গুলি ও চাপাতি নিয়ে জঙ্গি হামলা হয়। এতে দুই পুলিশসহ চারজন নিহত হন। আহত হয়েছেন ১০ পুলিশ সদস্যসহ ১৩ জন। হামলাকারীদের মধ্যে একজন গুলিতে নিহত হন। তার নাম আবির রহমান। তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। আরেক হামলাকারী শফিউল ইসলাম নামের আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ বলছে, হামলাকারীরা সবাই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্য।

জানা গেছে, হামলার কয়েকদিন আগেই তারা কিশোরগঞ্জে একটি মেস বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করে। জেলা শহরের শোলাকিয়া নীলগঞ্জ সড়কের ‘পরশমণি’ নামের বাড়িটির মালিক অবসরপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা মো. আবদুস সাত্তার। ১ জুলাই বাড়ির নিচতলার দুটি কক্ষ মাসিক ৬ হাজার টাকায় ভাড়া নেন কিশোরগঞ্জে হামলায় নিহত জঙ্গি আবীর রহমান। ভাড়া নেওয়ার সময় আবীর নিজেকে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল সরকারি কলেজে ইংরেজি বিভাগের ছাত্র বলে পরিচয় দেয়।

বাড়ির মালিককে নিহত জঙ্গি আবীর জানায়, তারা চার বন্ধু বাসায় থাকবে। ঈদের দিন সকালে বাড়ির মালিকের স্ত্রী শামসুন্নাহার স্বামীকে চার তরুণের খোঁজ নিতে নিচে পাঠান। আবদুস সাত্তার নিচে গেলে কক্ষের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে আবীর রহমান। আবদুস সাত্তার জানতে চান বাবারা, তোমরা কতজন আছ? আবীর উত্তর দেয় চারজন। মালিক বলেন, ঈদে বাড়ি যাওনি কেন? উত্তরে আবীর বলে, আঙ্কেল, শোলাকিয়া বড় ঈদের জামাতে কখনও নামাজ পড়িনি। তাই প্রথমবারের মতো নামাজ পড়ে বাড়ি চলে যাব। তখন মালিক বলেন, ঈদের দিন কিছু খেয়ে নামাজে যাও।

পরে আবদুস সাত্তার চারজনের জন্য সেমাই-পিঠা নিয়ে গেলে আবীর রহমান দরজার সামেন থেকে তা গ্রহণ করে ভেতরে নিয়ে যায়। কিছু সময়ের মধ্যে সেমাই-পিঠা খেয়ে খালি প্লেট আবীর নিজেই দ্বিতীয় তলায় মালিকের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়। তাদের এমন বিনয় ও ভদ্রতা দেখে মালিকের স্ত্রী বেশ খুশি হন। এরপর সকালে কখন তারা বাসা থেকে বের হয়ে যায়, তা জানতে পারেননি বাড়ির লোকজন। দুটি কক্ষে আসলে কতজন ছিল তাও জানতে পারেননি তারা। পরে জানতে পারেন, শোলাকিয়ায় ভয়াবহ হামলাকারী আবীর তাদেরই বাসার ভাড়াটে।

চারজনেই গুরুদয়াল কলেজের সম্মান শ্রেণির শিক্ষার্থী। দু’জন ইংরেজি বিভাগ এবং দু’জন অর্থনীতির। বাসা ভাড়ার জন্য আবীর দুই হাজার টাকা অগ্রিম প্রদান করে। আবীর নিজের নাম বলে জয়নাল আবেদিন। একটি ভুয়া ফোন নম্বরও দেয় মালিকের কাছে। আবীর তার বাড়ি অসিমবাজার, ফুলবাড়িয়া, জেলা ময়মনসিংহ বলে পরিচয় দেন। বাড়ি ভাড়া নেওয়ার পরদিন মালিকের চাচা জয়নাল আবেদীন মারা গেলে আবদুস সাত্তার কটিয়াদীর ধুলদিয়ায় গ্রামের বাড়িতে চলে যান। ঈদের দু’দিন আগে তারা সপরিবারে শহরের ‘পরশমণি’ বাড়িতে ফেরেন। গণমাধ্যমে জঙ্গি হামলার ঘটনা দেখলেও প্রথমে তারা বুঝতে পারেননি তাদের বাসার ভাড়াটিয়া যুবকই সেই জঙ্গি। রাতে পুলিশ-র‌্যাব এসে বাড়ি তল্লাশি করলে তারা বুঝতে পারেন, সেই ভদ্রবেশী যুবকই জঙ্গিদের একজন।

গতকাল রোববার ঢাকা থেকে অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি দল ওই বাড়ি সরেজমিন পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত জব্দ করে। এ সময় তারা কক্ষের ভেতরের একাধিক ছবি তোলে। কিশোরগঞ্জ মডেল থানার ওসি মীর মোশারফ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে, শোলাকিয়ায় হামলাকারী সন্দেহে আজিমউদ্দীন উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে থেকে গ্রেপ্তার করা জাহিদুল হককে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গত শুক্রবার কিশোরগঞ্জ শহরের মনিপুরঘাট এলাকায় জাহিদুলের বাড়িতে গেলে তার পরিবার তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে দাবি করে। তারা বলেন, বছর দুয়েক আগে মা মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি অসুস্থ। এক বছর আগে হঠাৎ পড়াশোনা ছেড়ে দেন তিনি। এরপর থেকে তিনি বাসাতেই থাকতেন। প্রায়ই বাসা থেকে কাউকে কিছু না বলে দু’একদিনের জন্য বের হতে যেতেন। তিনি কিশোরগঞ্জের ওয়ালি নেওয়াজ খান কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ঢাকায় তিতুমীর কলেজে ইংরেজিতে স্নাতক (সম্মান) পড়ছিলেন। অসুস্থতার কারণে তিনি পড়াশোনায় নিয়মিত ছিলেন না।

আরও পড়ুন