একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনও মোঃ নুরুজ্জামান। তার কার্যালয় উপজেলা পরিষদে হলেও হাজির থাকেন না নিয়মিত। অফিস করেন সরকারী বাসভবনে বসে। তবে বাইরে রাস্তাঘাটে বেরুলে ঘোরেন গাড়ির সাইরেন বাজিয়ে।
তিনি রাজশাহীর পুঠিয়ার ইউএনও। কারণে-অকারণে ধরে ধরে নিজেই মানুষজনকে পেটান। ফলে উপজেলা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে আসীন এই কর্মকর্তা এখন সাধারণ মানুষের কাছে মূর্তমান আতঙ্কের নাম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নুরুজ্জামান গত বছর ১৪ আগস্ট পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু তিনি নিয়মিত অফিসে না এসে উপজেলার বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজ করেন বাস ভবনে বসে। ফলে নানা কাজে আসা লোকজন তার দেখা পান না।
তিনি এখানে যোগদানের কয়েকদিন পরই উপজেলা মার্কেটের এক ঔষধ ব্যবসায়ী ও এক মুদি দোকানের কর্মচারীকে পিটিয়ে আলোচনায় আসেন।
গত ১২ মে ফুলবাড়ী এলাকায় বিলের পানির স্রোতের কারণে পুকুর খনন বন্ধের প্রতিবাদ করায় ভালুকগাছি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শান মোহাম্মদ কালুকে মারধর করে জেলে পাঠান।
গত ২৯ মে ছেলের ভ্রাম্যমান আদালতের সাজার কাগজপত্র আনতে গিয়ে গণ্ডগোহালী গ্রামের আশরাফুল মণ্ডলকে অফিস থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন ইউএনও নুরুজ্জামান। পরে তিনি এর প্রতিবাদ জানালে তাকেও জেল-হাজতে পাঠানোর হুমকি দেন।
এর জের ধরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গত ২৬ জুন আশরাফুল মণ্ডলের উপজেলা মার্কেটের ভাড়াটিয়াকে মারধর করেন।
গত ১ জুন বানেশ্বর বাজার এলাকায় গিয়ে সড়কে ভ্যান-অটো রিক্সা ও দোকান দেখে গালিগালাজ শুরু করেন। এ সময় বানেশ্বর সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান দবির উদ্দীনের ছেলে প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর করা হয়।
পুকুরের কিছু অংশ খাস থাকায় গত ২৫ জুন সাতবাড়ীয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সেকেন্দার আলীকে মারধর করে তার পুকুরের মাছ ধরে বিক্রি করে দেন ইউএনও।
গত ২৮ জুন পুঠিয়া শিব মন্দিরের সিঁড়ির নিচে মোটরসাইকেল রাখায় পুঠিয়া বাজার এলাকার হেলাল স্বর্ণকারের দোকানে ঢুকে কর্মচারীকে তিনি রড দিয়ে পিটিয়ে আহত করেন।
উপজেলার জিউপাড়া-মধুখালি গ্রামে অর্পিত জমিতে থাকা আমসহ বিভিন্ন ফলের গাছ আইনী প্রক্রিয়া ছাড়াই কেটে বিক্রি করে দেন নির্বাহী কর্মকর্তার কথিত ভাই মানিক।
ইউএনওর হাতে নির্যাতিত ভালুকগাছি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শান মোহাম্মদ কালু বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমাদের এলাকায় বিলের পানি প্রবাহের মূখে পুকুর খনন বন্ধ করায় প্রতিবাদ করেছিলাম। এর তিনদিন পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমাকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে মারধর করেন।’
তিনি বলেন, ‘পরে পরিবেশ নষ্টের অজুহাতে আমার একটি মুরগীর খামারের আমাকে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে তিন মাসের সাজা দেন। বর্তমানে আমি জামিনে এসেছি।’
পুঠিয়া উপজেলা রিকসা-ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এমরান আলী বলেন, ভ্যান চালকরা পেটের দায়ে সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে। তারা সড়কে চলাচল করে। কিন্তু ইউএনও নুরুজ্জামান নিজেই বিভিন্ন সময়ে আমাদের প্রায় অর্ধশত চালককে মারধর ও ভ্যানগাড়ী ভাংচুর করেছেন।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই কর্মকর্তা কাজই হলো সাধারন মানুষ পেটানো।
তাদের অভিযোগ, তিনি ঘটনাস্থলে না গিয়েও সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়াই অফিস অথবা বাসায় ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে সাজা দিচ্ছেন। এতে করে সরকার এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।
তবে সব অভিযোগই অসত্য দাবি করে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুরুজ্জামান মঙ্গলবার বলেন, সাধারণ মানুষের শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য আমি ভূমিদস্যু ও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাদেরকে আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উচ্ছেদ করেছি। এ কারণে কারো স্বার্থেরহানি হয়ে এসব অভিযোগ করতে পারে।
এবিষয়ে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী আশরাফ উদ্দীন বলেন, পুঠিয়া ইউএনওর বিরুদ্ধে মানুষ পেটানোর লিখিত কোনো অভিযোগ আমি পাইনি। এরকম করারও কথা নয়। তবে আমি তাকে সতর্ক করে দেবো।


