শনিবার ৭ নভেম্বর ২০২৬

গুলশানের রেস্টুরেন্ট ও শপিংমলগুলো খাঁ খাঁ

Gulshan Restaurantরাজধানী ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিসান বেকারি রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলার ১৩দিন পেরিয়ে গেলেও এথনও গোটা এলাকায় পরিবেশ স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। গুলশানের সর্বত্রই বিরাজ করছে থমথমে পরিবেশ। মার্কেটের দোকান-পাট, রেঁস্তোরাগুলো প্রায় ক্রেতাশূন্য। বেশ কয়েকটি শপিংমল ঈদের পর আর খোলেনি। রাস্তায় রাস্তায় চেকপোস্ট-তল্লাশি, র‌্যাব-পুলিশের ঘন ঘন টহল, রিক্সাসহ গণপরিবহনের চলাচল বন্ধ রাখা – সবমিলিয়ে তৈরি হয়েছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি।

গুলশান একসময় ছিল পুরোপুরিই অভিজাত শ্রেণীর আবাসিক এলাকা। পরে এখানে বিদেশি মিশন ও দূতাবাস গড়ে ওঠায় এটি কূটনৈতিক পাড়া হিসেবে পরিচিতি পায়। হালে অবশ্য বহু বড় বড় মাল্টিন্যাশানাল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট অফিসও প্রতিষ্ঠিত হয়েছ এ এলাকায়। দেশি-বিদেশি অভিজাত শ্রেণির মানুষের আনাগোনায় মুখর গুলশানে উচ্চবিত্ত মানুষের রসনা বিলাসের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে ছোটবড় নানা ধরনের রেস্তোঁরা। চাইনিজ, থাই, স্প্যানিশ. জাপানি ও ইন্ডিয়ান খাবারের জন্য এসব রেষ্টুরেন্ট বিখ্যাত। মাঝারি মানের একটি রেস্তোরায় প্রতিদিন গড়ে লাখ টাকার ওপরে বিক্রি হয়। গত ১ জুলাই গুলশানের স্প্যানিশ রেস্টুরেন্ট হলি আর্টিজানে হামলা-জিম্মি ও হতাহতের ঘটনার পর এর প্রভাব পড়েছে ওই এলাকার রেষ্টুরেন্টগুলোতে।জঙ্গি হামলার ঘটনার পর এসব রেষ্টুরেন্টে আসার পধ যেন ভুলে গেছেন অতিথিরা।লোক সমাগম হচ্ছে না বললেই চলে, ব্যবসা নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোঠায়।

গুলশানের পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিনে অাগেই বুকিং থাকায় গ্রাহক সমাগমে সরাসরি প্রভাব পড়েনি বলে জানালেন হোটেলটির পাবলিক রিলেশন অফিসার সেলিনা মোমেন। এর প্রভাব পড়তে পারে আরো ১৫ দিন পর। যদি বিদেশী ব্যবসায়ী, পযটক আসা কমে যায়। তবে সেরকম আশা নেই বলে তিনি বলেন ওয়েস্টিনে যারা থাকতে বা ভেন্যু ভাড়া করেন সেইসব গ্রাহকরা অনেক আগে থেকেই বুকিং দিয়ে থাকেন। তবে হ্যাঁ এই মূহুর্তে আমরা নিরাপত্তার বিষয়টিতে খুব জোর দিয়েছি।

ওয়েস্টিনের মাত্র ১শ গজ দূরত্বে টপকাপি রেস্টুরেন্ট গিয়ে। কাস্টমার না থাকায় ভেতরের আলো নিভিয়ে রাথা গয়েছে। অন্যান্য দিন এখানে টেবিল ফাঁকা পাওয়া কঠিন। প্রতিদিন যেখানে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার ব্যবসা হয় এই কয়দিনে সেখানে কোনোদিন ৮ হাজার তো কোনোদিন শূণ্য বলে জানান রেস্টুরেন্টের জেনারেল ম্যানেজার নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিদেশীরা তো আসছেই না, উচ্চবিত্তরাও আসছে না আবার আশপাশ থেকে কিছু গ্রাহক আসেন তারাও নেই। আতঙ্কের পাশাপাশি এ সময় হ্যারাজমেন্ট হওয়ার ভয়ও কাজ করছে মানুষের মধ্যে। তিনি শঙ্কার সঙ্গে বলেন এভাবে মাস খানেক চল্লে রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দিতে হবে।

একই অবস্থা হান্ডি রেস্টুরেন্টে। ১ জুলাইয়ের পর তিন দিন তাদের কোনো বিক্রি ছিল না। শেষের দুই রোজার ইফতার টুকিটাকি হলেও সেহরিতে কোনো কাষ্টমার আসে নাই। ঈদের পর মঙ্গলবার রেস্টুরেন্ট খোলা হয়েছে। এখনো বোঝা যাচ্ছে না বলে জানান হান্ডির ক্যাপ্টেন ফয়সাল আহমেদ। কোনার টেবিলে ৫ জন ক্রেতার দিকে তাকিয়ে বলেন সারাদিনে মাত্র এনারা এসেছেন।

মুভ এন পিক, আইসক্রিম আর কফি পার্লার হিসেবে এই এলাকার মানুষদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এখানে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাঝ বয়সী ৪ ব্যবসায়ী বন্ধু এসেছেন কফি খেতে। তাদের মতে একটা প্যানিক চলছে। অল্প কয়দিনে সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে সব সময় জোরদার সিকিউরিটি থাকা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। এই দোকানের ক্রু মেম্বার সাজ্জাদ হোসেন সোহেল জানান, ঈদেও দোকান খোলা ছিল। কিন্তু সেল ছিল না। সেল অর্ধেকের নীচে নেমে গেছে।

এদিকে ডিসিসি মার্কেটের অবস্থাও একই রকম। বিকেল ৬ টায় সুনসান নিরবতা। পাশাপশি দুটি ছোট স্নাকসের দোকান, যেখানে সব সময়ের জন্য উপচে পড়া ভিড় থাকে। সেখানে, ৪/৫ জন করে ক্রেতা। কিউর অপটিকসের স্বত্তাধিকারী ফয়জুল ইসলাম ক্ষোভের সাথে পূর্ব পশ্চিমকে বলেন, ৫ জন জঙ্গি ১৬ কোটি মানুষের পেটে লাথি মেরেছে। আমাদের এ সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে জাতীয় ঐক্য দরকার। গরিবের পেটে লাথি। বেচা বিক্রি না হলে চালাবো কিভাবে চলবো কিভাবে। এ দোকান ঠিক মতো চালাতে না পারলে কতগুলো মানুষ বেকার হবে। রিক্সা চলেনা, গাড়ি চলছে না, মানুষ আসতে পারছে না বলে অভিযোগ করেন এই ব্যবসায়ী। এই মার্কেটের এক কোনায় ২২ বছর ধরে তোয়ালে বিক্রেতা নজরুল ইসলাম এর আগে এমন ভীতিকর অবস্থা কবে হযেছে বলতে পারেন না বলে জানান। বিদেশী তো দুরে এখন দেশী মানুষরাও মার্কেটে কম আসছে।

আবাসিক এলাকায় অবস্থিত সকল রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দেওয়া দরকার। বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে ওঠা এসব প্রতিষ্ঠান থেকে নানা অসামাজিক কর্মকান্ড হয়ে থাকে বলে জানালেন বনানী সুপার মার্কেটের সেক্রেটারী মাহমুদ হাসান সাজ্জাদ। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা ধৈর্যের সাথে সকল সমস্যা মোকাবেলা করছেন। ঈদের ছুটির কারণে মার্কেট ফাঁকা। আরো সপ্তাহ খানেক লাগবে বুঝতে। তবে ঈদের ব্যবসা হয় সাধারণত শেষ ৫/৬ দিন-যা হয় নাই। রিটেইলাররা বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন বলে জানান তিনি।

বনানী মার্কেটের উর্বশী কসমেটিকসের মালিক ফারুক হোসেন বলেন, দোকানের ভাড়া ৩০হাজারের উপর। বাসা ভাড়া আছে, সেই সাথে কর্মচারীদের বেতন, সামনের মাসে কিভাবে চলবো ভাবছি। এমনিতেই এ বছর বেচা বিক্রি ছিল কম তার উপর এই সমস্যা আমাদের মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা হয়েছে। ঈদের বিক্রি থেকে যে লাভ হয় তাই দিয়ে ৩ থেকে ৪ মাস চলে যায়, এবার তো এই মাসই চলে না। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাজারমুখী হচ্ছেন না বলেও জানান এই ব্যবসায়ী।

বনানী থেকে গুলশান ২ এর আশেপাশের কাপড়, গয়না, জুতা, ফল ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে দেখা যায় সবাই হতাশ কবে এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে এ নিয়ে। তাদের অনেকের মতে, রিক্সা, বাস বন্ধ হওয়া, অতিরিক্ত সিকিউরিটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করছে।
নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে এই এলাকার ছোট বড় সকল ব্যবসায়ী ও মার্কেট কর্তৃপক্ষ জোরদার করেছে তাদের সিকিউরিটি ব্যবস্থা। দোকান ও মার্কেটের ভেতরে বাইরে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনছেন। আবার অনেকেই দেশের বাইরে থেকে আনিয়ে নিচ্ছেন বিশেষ ক্ষমতার ক্যামেরা।

এদিকে রিক্সা চালক ইমান আলী ব‌লেন, সন্ধ্যার পর লোক জন নাই। তার উপর রাস্তা বন্ধ। কোন‌দি‌কে যাই, কোন‌দি‌কে পু‌লিশ ধরে, ভ‌য়ে ভ‌য়ে এখন রিক্সা চালাই। এই সু‌যো‌গে কিছু ফায়দাবাজ রিক্সা ওয়ালা ডাবল ভাড়া হাঁক‌ছে। গুলশান-২ গোল চত্ত্বর থে‌কে বনানী বাজার ২০টাকার ভাড়া ৮০টাকাও নি‌চ্ছে কোনো কোনো রিক্সাচালক।

আরও পড়ুন