স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন সবচেয়ে বড় সমবায় প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটা। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার প্রভাব খাটিয়ে তিনি চারদলীয় জোট সরকারের আমলে মিল্ক ভিটায় বাড়তি সুবিধা ভোগ করে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ক্ষতি করেছেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এ সংস্থায় তার দাপট একই রকম।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন সবচেয়ে বড় এই সমবায় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটিতেও নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। সব পরিচালকের সঙ্গে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এখন মিল্ক ভিটার একজন প্রভাবশালী পরিচালক হিসেবে গত তিন বছরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ জমা হয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে।
তিনি একাধারে মিল্ক ভিটার মার্কেটিং কমিটি এবং বাজারদর যাচাই-বাছাই কমিটির আহ্বায়ক এবং সবচেয়ে বড় টেন্ডার কমিটি টেক-১-এর সদস্য। তাঁর কথার বাইরে কোনো কেনাকাটাই হয় না। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সমবায়ী প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটার সব টেন্ডার তিনি একাই নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
যার বিরুদ্ধে এতোসব অভিযোগ, তিনি শামসুল আরেফিন প্যাটেল।
মিল্ক ভিটার ব্যবস্থাপনায় জড়িত একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
কোকোর ব্যবসায়িক অংশীদার পরিচয় ভাঙিয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে প্যাটেল বাঘাবাড়ীতে ২৪ কোটি টাকার কনডেন্সড মিল্ক প্লান্ট সরবরাহের কাজ বাগিয়ে নিয়েছিলেন। একই সঙ্গে ওই প্লান্টের জন্য আরো ২৬ কোটি টাকার ক্যান মেকিং প্লান্ট সরবরাহের কাজও তিনি পেয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ওই প্লান্ট উদ্বোধন করেন, কিন্তু কোটি কোটি টাকার মেশিন মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় অকেজো হয়ে পড়ে। দীর্ঘ ১১ বছরেও সেটি চালু করা যায়নি। বর্তমান চেয়ারম্যান শেখ নাদের হোসেন লিপুও চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। এই সরকার আমলে ওই প্লান্টটি পরিষ্কার করার জন্য দুই কোটি টাকার ক্যান ওয়াশিং মেশিন কেনার দায়িত্বও পান সেই প্যাটেল ও তোফাজ্জল হোসেন। অভিযোগ রয়েছে ওই দুটি প্লান্ট চালু করার নামে বিনা দরপত্রে আরো ৮৮ লাখ টাকার যন্ত্রাংশ সরবরাহের কাজ দেওয়া হচ্ছে একটি চক্রকে। এ ছাড়া আরো ৬০ লাখ টাকার যন্ত্রাংশ বিনা টেন্ডারে সরবরাহ করার কার্যাদেশ দেওয়ার পরেও চালু করা হয়নি ওই দুটি প্লান্ট।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন শামসুল আরেফিন প্যাটেল। বর্তমানে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। খালেদা জিয়ার ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ও ভাগনে শাহরিন ইসলাম তুহিনের সঙ্গে অ্যাডভার্টাইজিং ফার্মসহ বিভিন্ন ব্যবসায় অংশীদারিত্ব ছিল তাঁর। এ কারণে প্যাটেল সে সময় থেকেই বেপরোয়া। মিল্ক ভিটার ব্যবসা তিনিই নিয়ন্ত্রণ করতেন। আর বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার আমলেও মিল্ক ভিটার পরিচালক পদ পেয়ে তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি আরো বেড়েছে।
কোকোর সঙ্গে পরিচিতির কথা বললেও ব্যবসায়িক অংশীদারির কথা স্বীকার করেননি প্যাটেল। বলেন, তিনি আসলে কোনো দলই করেন না। তবে খালেদা জিয়ার ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। কোকোর প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল অ্যাডভান্স অ্যাড আর তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম সাইন ভিশন। একই সঙ্গে প্যাটেল তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, একটি মহল এ বিষয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এমনকি যাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছেন, তাঁদের তিনি চেনেন না। তাঁরাও তাঁকে চেনেন না। তবে ডায়নামিক করপোরেশনের মালিক তোফাজ্জল হোসেন তাঁর পূর্বপরিচিত বলে জানান তিনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কিভাবে একজন বিএনপি নেতা বা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পরিবারের ব্যবসায়িক পার্টনার মিল্ক ভিটার মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হলেন সে বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গাও বিস্মিত। তিনি বলেন, ‘মিল্ক ভিটার বিষয়টি সেখানকার চেয়ারম্যান লিপু সাহেব ভালো বলতে পারবেন। সেখানে একজন বিএনপি নেতা কিভাবে পরিচালক হলেন, তা আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।’
একই বিষয়ে পরে মিল্ক ভিটার চেয়ারম্যান শেখ নাদির হোসেন লিপু বলেন, ‘আমি দেড় বছর আগে প্রথম মিল্ক ভিটা পরিচালনায় গঠিত আহ্বায়ক কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিই। ১২ সদস্যের সব পরিচালককেই মন্ত্রণালয় মনোনীত করেছিল। তাঁদের মধ্যে কে বিএনপি বা অন্য দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তা আমার জানা নেই।’
তবে মিল্ক ভিটার বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত মেনেই পরিচালকদের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে জানিয়ে লিপু বলেন, ‘আমরা প্রতিষ্ঠানটির স্বার্থরক্ষায় সচেতন আছি বলেই অনিয়ম হওয়া একটি টেন্ডারের কার্যাদেশ দেওয়ার পরও বাতিল করেছি।’
গত ঈদের আগে পরিচালকদের মেয়াদ শেষ হওয়া সাপেক্ষে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। আরো চারজন পরিচালক নিয়োগ দেবে মন্ত্রণালয়। এবারও সেই প্যাটেল নতুনভাবে মিল্ক ভিটার পরিচালক হতে জোর লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা তাঁর জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
মিল্ক ভিটা সূত্র জানায়, মেয়াদ পূর্তির শেষ সময়ে এসে একে একে বেরিয়ে আসছে প্যাটেলের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও টেন্ডারে অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা কামানোর তথ্য। সূত্র জানায়, চিল্ড ওয়াটার প্ল্যান্ট সরবরাহেও ছিল তাঁর হাত। এই প্ল্যান্ট সরবরাহ করা হয়েছে ১৯ কোটি টাকায়। অথচ এটির সর্বোচ্চ মূল্য আট থেকে ৯ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে প্যাটেল-তোফাজ্জল গং প্রভাব খাটিয়ে সব টেন্ডার নন-রেসপন্ডিং দেখিয়ে শুধু তাঁদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ডায়নামিক করপোরেশনকে রেসপনসিভ করে ক্রয়াদেশ দেয়। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির আপত্তি সত্ত্বেও সেই কার্যাদেশ বাতিল করেনি মিল্ক ভিটা। অভিযোগ রয়েছে, এই প্ল্যান্টটি চীনে বানিয়ে বেলজিয়ামে স্থানান্তর করে দেশে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু পারচেজ কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী এটি ইতালি থেকে সরবরাহ করার কথা ছিল। মিল্ক ভিটার প্রিশিপমেন্ট কম্পানি কন্টিনেন্টাল জানিয়েছে, তাদের না জানিয়ে ডায়নামিক করপোরেশন প্ল্যান্টটি চুপিসারে দেশে শিপমেন্ট করেছে। এসব অনিয়ম করে এরই মধ্যে ডায়নামিক করপোরেশন প্ল্যান্ট সরবরাহের বিপরীতে ১১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তবে চেয়ারম্যান নাদির হোসেন লিপু অভিযোগ পেয়ে বাকি বিল আটকে দিয়েছেন।
নিজের গরু-বাছুর বা খামার না থাকলেও প্যাটেল কিভাবে সমবায়ী এ প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হলেন, এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে মিল্ক ভিটায়। বাজার মনিটরিং কমিটির প্রধান হিসেবে তিনি প্রতি মাসে বিভিন্ন জেলা সফরের নামে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। নিয়েছেন পাজেরো জিপ। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির কোনো উন্নতি হয়নি। এখনো বাজারে মিল্ক ভিটার তরল দুধ ঠিকমতো পাওয়া যায় না। সরবরাহ করা হচ্ছে ভেজাল ও পচা দুধ। ফলে মিল্ক ভিটা বাজারে আস্থা হারাচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ে প্যাটেলের বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সমবায়ীরা। সিরাজগঞ্জের বাচরা মধ্যপাড়া দুধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি বাবুল হোসেন, শাহজাদপুরের শিবরামপুর সমিতির সভাপতি ঈমান আলী ও ফেচুয়ামারা পূর্বপাড়া সমিতির সভাপতি শেখ সাদিসহ অনেক সমবায়ী প্যাটেলের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
জানতে চাইলে মিল্ক ভিটার সাবেক পরিচালক সাজ্জাদ হায়দার বলেন, দুর্নীতি মিল্ক ভিটার প্রধান সমস্যা। ভেজাল দুধ পাওয়ায় এরই মধ্যে অনেক সমিতিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এখন মিল্ক ভিটা পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত হয়েছে, সে কথা বলব না। তবে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি।’ তিনি বলেন, এখানে একটি সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা কাজ করতে দেয় না। তবে মিল্ক ভিটায় নতুন আহ্বায়ক কমিটির এই পরিচালকের বিরুদ্ধেই বিস্তর দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। পরিচালক প্যাটেল সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, অনিয়ম এত বেশি যে এক কথায় তা বলা যাবে না। তদন্ত করলেই সব বেরিয়ে আসবে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও দুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে শাহজাদপুরের বাঘাবাড়ীতে গড়ে ওঠে বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড বা মিল্ক ভিটা। বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বাজারে এখন প্রতিষ্ঠানটির সেই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে বাজারের সেরা দুধ হিসেবে স্বীকৃতি পায় মিল্ক ভিটা। ভোগ্যপণ্যের মান ও জনপ্রিয়তার ওপর এক জরিপে মিল্ক ভিটাকে বাজারের সেরা দুধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠান মিলওয়ার্ড ব্রাউন ও বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের যৌথ উদ্যোগে সারা দেশে চার হাজার ভোক্তার ওপর এ জরিপ চালানো হয়। মিলওয়ার্ড ব্রাউন বাংলাদেশসহ পৃথিবীর ৫৯টি দেশের ব্র্যান্ড ও বিপণন নিয়ে গবেষণা করে।


