বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ত্রাসের রাজা বনে যাওয়া এক আওয়ামী লীগ নেতা

Awami League Leader Taher copyআট বছরে আওয়ামী লীগ নেতা বনে যাওয়া এক ব্যক্তি ‘ত্রাসের রাজা’ উপাধি পেয়েছেন।

খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাময়িক বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবু তাহেরের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে। রিমোট কন্ট্রোলের মতো তিনি দূরে থেকে বাহিনী দিয়ে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। সম্প্রতি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরদিন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আগুন দেয় তাঁর বাহিনী।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত রিকশা চালাতেন মো. হানিফ মিয়া। তাঁর বড় ছেলে আবু তাহের একটি তামাক কম্পানিতে চাকরি করতেন। দেখতে দেখতে তাহের উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ ছাড়া ছোট ছেলে তোফাজ্জল হোসেন উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। দুই বছর আগে তাঁদের বাবা হানিফ উল্টাছড়ি গুচ্ছগ্রামের প্রকল্প সভাপতি হন। এর পর থেকে অল্পদিনে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে পরিবারটি। তাহের এখন প্রাইভেট কার (করলা) চালান। আছে কয়েকটি মোটরসাইকেল। বিপুল সহায়-সম্পত্তির মালিক তিনি। খাগড়াছড়ি, পানছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় তাঁর জমিজমা রয়েছে। তোফাজ্জল নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে বর্তমানে কারাগারে।

খয়রাতি রেশন আত্মসাৎ : খাতা-কলমে উল্টাছড়ি গুচ্ছগ্রামের (পুনর্বাসিত বাঙালি) প্রকল্প সভাপতি হানিফ। কিন্তু সবই করেন তাঁর ছেলে তাহের। রেশন কে পাবেন আর পাবেন না, নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গত এপ্রিল, মে ও জুনের ডিওর অন্তত ১০০ জন কার্ডধারীকে রেশন দেওয়া হয়নি; যাঁদের মধ্যে ২৫ জন গত ২৬ জুন জেলা প্রশাসককে লিখিতভাবে অভিযোগ করেছেন।

৫১২৫ নম্বর কার্ডধারী কসর আলী অভিযোগ করেন, ‘৯ মাস ধরে আমাকে রেশন দেওয়া হচ্ছে না।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কার্ডধারী অভিযোগ করেন, ‘এই গুচ্ছগ্রামে ৫০৫টি রেশন কার্ড রয়েছে। প্রত্যেক কার্ডধারীকে প্রতি তিন মাসে ৫০ কেজি গম ও ৩৫ কেজি হারে (মোট ৮৫ কেজি) চাল দেওয়ার কথা। এখানে গত দেড় বছরের মধ্যে এক কেজি গমও কোনো কার্ডধারী পাননি। তাহের খাদ্যগুদামের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে চট্টগ্রামেই সব বিক্রি করে দেন। প্রকল্পের তদারক কর্মকর্তা কখনো রেশন বিতরণকালে যান না। উেকাচ নিয়ে অনিয়মে চুপ থাকেন তিনি। প্রকল্প চেয়ারম্যানের দুই ছেলে রেশন বিতরণকালে কার্ড ইস্যু ও তাতে বাবার স্বাক্ষর করেন।’

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, কার্ডধারীদের জোরপূর্বক চালে কেজিপ্রতি ১১ টাকা ও গমে ৯ টাকা করে নিতে বাধ্য করা হয়। চাল দিলেও পাঁচ থেকে আট কেজি কম। প্রতিবাদ করলে নির্যাতন করা হয়। মিথ্যা মামলার হুমকি দেওয়া হয়।

এ ছাড়া পানছড়ি উপজেলার গমের সিন্ডিকেট তাহেরের হাতে। তিনি ছাড়া ভিন্ন কেউ এক কেজি গমও কিনতে পারেন না। এদিকে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কারণে সারের ডিলারশিপ প্রত্যাহার করার পরও প্রভাব খাটিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে পুনরায় তা পেয়েছেন।

হাটবাজার ইজারা নিয়ন্ত্রণ : পানছড়ি বাজারের খাজনা নিয়ন্ত্রণ করে তাহেরের পরিবার; যদিও বাজার তহবিলে ওই পরিবারের কারোর নাম নেই। কিন্তু দিব্যি বছরের পর বছর ধরে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ইচ্ছামাফিক কর আদায় করছেন তাঁরা।

বিভিন্ন পণ্য পরিবহনকারী ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্ধারিত মূল্যের কয়েক গুণ বেশি কর আদায় করা হয়। প্রতিবাদ করলেই মারধর, এমনকি ভয়ভীতি দেখানো হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আম ব্যবসায়ী বলেন, ‘তাহের ইচ্ছামতো টোল আদায় করছেন। কথা বললেই মারধর ও মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হয়।’

ক্ষুদ্র জাতি ও ক্লাবের জমি দখল : উল্টাছড়ি ইউপি সদস্য শিবুজয় ত্রিপুরা বলেন, ‘আমাদের এক একর ধানিজমি দখল করে রেখেছেন তাহের। ওখানে লেক করে মত্স্য চাষ করা হয়েছে বলে শুনেছি। তবে প্রতিবাদের সাহস পাচ্ছি না। যদি মারধর করে?’ এ ছাড়া ওই ইউনিয়নের অনির্বাণ যুব সংঘের প্রায় দেড় একর জমির গাছগাছালি কেটে বাড়ি নির্মাণ করেছেন তিনি।

বিশেষ বাহিনী : সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলেছেন তাহের। হাটবাজারের ট্যাক্স আদায়, ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিবাদকারীদের দমনে এই বাহিনীর সদস্যরা মুখ্য ভূমিকা পালন করে। বিগত ইউপি নির্বাচনে উল্টাছড়িতে চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়নে ব্যর্থ হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন তিনি। তাই তাঁকে উপজেলা আওয়ামী লীগ সাময়িক বহিষ্কার করে। ভোটে পরাজিত হওয়ার পর আরো হিংস্র হয়ে ওঠেন তিনি।

আওয়ামী লীগকর্মী আহির উদ্দিন বলেন, ‘নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরদিন থেকে তাহের ও তাঁর বাহিনীর হামলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অন্তত ১৫ নেতাকর্মী আহত হয়। নির্বাচনে তাঁর পক্ষে কাজ না করায় স্থানীয় আওয়ামী লীগকর্মী আবু বকর সিদ্দিকসহ কয়েকজন ভয়ে ঘরবাড়িতে থাকতে পারছে না।’

পানছড়ি সদর ইউপি চেয়ারম্যান নাজির মাহমুদ বলেন, ‘তাহের পরিবারের ভয়ে অনেকে মুখ খুলতে সাহস করে না। এটা চলতে থাকলে পানছড়ির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।’

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : অভিযুক্ত আবু তাহের বলেন, ‘মাস্টাররোল তৈরিসহ প্রকল্পের বিভিন্ন কাজে বাবাকে সহযোগিতা করি। রেশন আত্মসাতের অভিযোগ সঠিক নয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে একটি মহল আমাদের বিরুদ্ধে এমন ষড়যন্ত্র করছে।’ এলাকায় প্রভাব বিস্তার, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং সন্ত্রাসী বাহিনী লালনের তথ্যকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে উল্লেখ করেন তিনি। ক্ষুদ্র জাতির জমি ও অনির্বাণ সংঘের জমি দখলের অভিযোগও অস্বীকার করেন।

এ বিষয়ে পানছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. বাহার মিয়া বলেন, ‘তাহের এখন বহিষ্কৃত। তাঁর অপকর্মের দায় আওয়ামী লীগ নেবে না।’

পানছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ হোসেন সিদ্দিক বলেন, ‘উল্টাছড়ি গুচ্ছগ্রামের রেশন আত্মসাতের বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। নোটিশ করে তদন্ত করা হবে। দোষী সাব্যস্ত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন