ঢাকার কূটনৈতিকপাড়া গুলশান ও ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহে জঙ্গি হামলার সাথে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথের শিক্ষার্থীদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার পর বেশ সমালোচনা শুরু হয়েছে। এজন্য জঙ্গিবাদ ও শিক্ষার্থীদের বিপথে যাওয়া রুখতে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরব রাজনীতি চালুর কথা বলছে ছাত্রসংগঠন, রাজনীতিকসহ অনেকেই।
দেশে প্রায় দুই যুগে ৯০টির মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সরকারি অনুমোদন পেলেও এখন পর্যন্ত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রকাশ্য ছাত্র রাজনীতি চালু করা হয়নি। রাজধানীর অদূরে কেবলমাত্র একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নামমাত্র ছাত্র সংসদ চালুর কথা বলা হলেও সেটির প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা ছাত্ররাজনীতিতে জড়িত হবেনা এই মর্মে মুচলেকা দিয়েই তাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়। বিরাজনীতিকরণের এই প্রক্রিয়া নিয়ে দেশের প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আপত্তি তুলে ধরে প্রকাশ্য রাজনীতির দাবি জানিয়ে আসছিল। তবে শনিবার জঙ্গিবাদ ইস্যুতে এক সভায় সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ নেতারাও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরব রাজনীতি চালুর পক্ষে বক্তব্যে রাখার পর অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতারা এব্যাপারে একমত পোষণ করেন।
রাজধানীর কৃষিবিদ ইনষ্টিটিউটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে আয়োজিত ওই সভায় ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ প্রশ্ন রেখে বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কী আসলেই রাজনীতি মুক্ত? সেথানে সরব রাজনীতি নেই, তবে নীরব রাজনীতি আছে। আর নীরব রাজনীতি মানে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে হিযবুত তাহ্রীরের সংগঠন আছে।” তিনি বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবশ্যই সরব রাজনীতি থাকতে হবে।” অনুষ্ঠানে একই দাবি জানিয়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি উন্মুক্ত হোক। ছাত্ররাজনীতি করতে পারবে না-এই মুচলেকা দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়। এ সিদ্ধান্ত ছাত্রসমাজ মানে না, মানবে না।”
এ বিষয়ে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকী আক্তার বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে রাজনীতি নিষিদ্ধের নাম দিয়ে আদতে এখানে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী রাজনীতির আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে। প্রগতিশীল সংগঠনগুলোকে এখানে সুযোগ না দিলেও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ছত্রছায়ায় জঙ্গিবাদের লালন করা হচ্ছে। লাইব্রেরিতে জঙ্গিবাদি বই রাখা হচ্ছে। পাঠচক্রের মাধ্যমে উগ্রবাদে দীক্ষিত করা হচ্ছে। মূলত বিরাজনীতিকরণই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গিবাদ উস্কে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক চর্চা এবং ছাত্র সংসদ নির্বাচনই পারে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জঙ্গীবাদ রুখতে; সুস্থ রাজনৈতিক চর্চাই জঙ্গীবাদ, সাম্প্রদায়িকতা দূরীকরণের মোক্ষম উপায়।”
“বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি চালু করা খুব জরুরি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘নো পলিটিক্স, নো স্মোকিং’ লিখে বড় বড় সাইনবোর্ড ঝোলালেও ভেতরে মূলত মুরগীর ফার্মের মত বদ্ধ পরিবেশে জঙ্গিবাদেরই চাষ হচ্ছে। নর্থ সাউথ, ব্র্যাক, মানারাত এসব বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।” বললেন ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি আবল কালাম আজাদ। বামপন্থী এই ছাত্রনেতা প্রশ্ন তোলেন, “কয়টা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সব শর্ত পূরণ করে অনুমোদন পেয়েছে? ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা কম বেশি সবাই কোন না কোন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। রাজনীতির ফোঁক ফোকর দিয়েই সব শর্ত পূরণ না করেই তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পেয়েছেন।”
জঙ্গিবাদ রুখতে সব প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনকে একসাথে কাজ করা উচিত বলেও মনে করেন এই ছাত্রনেতা। তবে ছাত্রলীগের চাওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এ ছাত্রনেতা বলেন, “ছাত্রলীগ কেন সেখানে সরব রাজনীতি চাইছে, কী উদ্দেশ্যে রাজনীতি করতে চাইছে, সেটা তারাই ভাল বলতে পারবে। সেটা কতটা সৎ উদ্দেশ্যে হবে, সেটাও সময়ই বলে দেবে। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জঙ্গিবাদ রুখতে মুক্তবুদ্ধি চর্চা জারি রাখতে হবে। সেজন্যে ছাত্ররাজনীতি তথা ছাত্র সংসদ চালু করার বিকল্প নেই।”
জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের সভাপতি সামশুল ইসলাম সুমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি চালু করার ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই উল্লেখ করে বলেন, “এখন পর্যন্ত যেসব জঙ্গি ধরা পড়েছে, এদের অধিকাংশই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। এরা অনেকটাই ফার্মের মুরগীর মত। যারা বাংলাদেশ, বাঙালি জাতির ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এসব নিয়ে পড়াশুনারই সুযোগ পায়নি। ফলে এক শ্রেণির উগ্রবাদী গোষ্ঠী সেসবের সুযোগ নিচ্ছে, তাদেরকে জঙ্গিবাদে দীক্ষিত করছে অনায়াসেই। এক্ষেত্রে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তুলতে পারে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোই। কিন্তু সেজন্য প্রকাশ্য রাজনীতি জরুরি। তবে এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকেই বড় ভূমিকা রাখতে হবে।”
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসিরউদ্দিন বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অবশ্যই সক্রিয় ছাত্র রাজনীতি থাকা দরকার। বদ্ধ পানিতে যেমন শেওলা জন্মায় তেমনি এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বদ্ধ পরিবেশ ও পিছিয়ে পড়া চিন্তার জন্ম দেয়। সমাজবিচ্ছিন্নতা সংকীর্ণ চিন্তার পথকে প্রশস্ত করে, সংবেদনশীলতা নষ্ট করে দেয়। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সক্রিয় রাজনীতি এদের সমাজ সচেতন করবে, মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল করবে। অধিকার বোধ ও মর্যাদাবোধ তৈরি করবে।”
তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মালিকদের প্রতি প্রশ্ন রেখে বলেন, “মালিকদের যদি সমিতি থাকতে পারে তবে আমি মনে করি ছাত্রদের অবশ্যই ছাত্র সংসদ থাকা উচিত।”


