বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

সিরিয়া-ইরাকে চিকিৎসা দিতে সপরিবারে নিখোঁজ ডা. রোকন!

Khilgaon Dr. Rokon Family Houseরাজধানীর খিলগাঁও চৌধুরীপাড়া থেকে সপরিবারে নিখোঁজ রয়েছেন ডা. খন্দকার রোকন উদ্দিন। গত বছরের জুলাইয়ে স্ত্রী নাঈমা আক্তার, দুই মেয়ে রেজওয়ানা রোকন নাদিয়া ও রামিতা রোকন এবং নাদিয়ার স্বামী সাদ কায়েস শিশিরকে নিয়ে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর তারা আর ফিরে আসেননি। একই পরিবারের এ পাঁচজন কোথায় আছেন সেই তথ্য সঠিকভাবে আত্মীয়-স্বজনরা জানেন না। তবে মাঝেমধ্যে বিদেশী নম্বর থেকে স্বজনদের কারও কারও মোবাইলে ফোন করে কথা বলেন রোকন উদ্দিন। নির্দিষ্ট কোন দেশে আছেন সেই তথ্য দেন না। শুধু বলেন, কোনো একটা মুসলিম দেশে তারা অবস্থান করছেন এবং সিরিয়া ও ইরাকে যুদ্ধাহত শিশুদের চিকিৎসা দেন তিনি। তার বড় মেয়ে রেজওয়ানা রোকন নাদিয়া ও তার (নাদিয়া) স্বামী সাদ কায়েস শিশির নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাকারীরা পরিবার থেকে কয়েক মাস নিখোঁজ থেকে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে পড়ে এমন খবরে ডা. রোকন উদ্দিনের স্বজনরা উৎকণ্ঠিত। স্বজনরা বলছেন, সপরিবারে গত বছরের ঈদুল ফিতর দেশের বাইরে উদযাপন করবেন জানিয়ে রোকন উদ্দিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। ঈদের ৫-৭ দিন পর ফিরে আসার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু এক বছর পার হলেও তারা আর কেউ ফিরে আসেননি।

পারিবারিক সূত্র জানায়, ডা. খন্দকার রোকন উদ্দিন (পাসপোর্ট নম্বর- এএফ১০১৩০৮৮) ঢাকার একটি শিশু হাসপাতালের শিশু চিকিৎসক ছিলেন। তার স্ত্রী নাঈমা আক্তার (পাসপোর্ট নম্বর- বিসি০০০৬৯৩৭) পুরান ঢাকার একটি সরকারি কলেজের শিক্ষক ছিলেন। তাদের বাসা রাজধানীর খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ায়। বাড়ি নম্বর ৪১১/বি। এ বাড়ি পৈতৃক সূত্রে নাঈমা আক্তার ও তার (নাঈমা) বোনের। এ বাড়িতেই রোকন উদ্দিন স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে থাকতেন। রোকনের বড় মেয়ে রেজওয়ানা রোকন নাদিয়া (পাসপোর্ট নম্বর- বিসি০০৩৫১৯৮) নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়ালেখা করতেন এবং ছোট মেয়ে রামিতা রোকন (পাসপোর্ট নম্বর- বিসি০০৪৫৩৩৯) ভিকারুন নিসা স্কুলের ছাত্রী ছিলেন। নাদিয়া নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদ কায়েস শিশিরের (পাসপোর্ট নম্বর বিএফ০৪৮৬৬৪২) সঙ্গে প্রেম করে পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন। শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. রোকন উদ্দিন একটি শিশু হাসপাতালে চাকরি করলেও বাড়ির নিচে নির্ভানা হেলথ সেন্টার নামে একটি ফার্মেসিতে রোগী দেখতেন। ওই ফার্মেসির মালিক মিলন সোমবার যুগান্তরকে বলেন, গত বছরের রমজানের শেষের দিকে (ঈদের ৬-৭ দিন আগে, জুলাইয়ে) রোকন উদ্দিন তাকে বলেছিলেন, দুই মেয়ে, বড় মেয়ের স্বামী ও স্ত্রীকে নিয়ে রোকন দেশের বাইরে ঈদ পালন করতে যাবেন। ঈদের ৫-৭ দিন পর সপরিবারে দেশে ফিরে আসবেন। কিন্তু আর দেশে ফেরেননি।
ডা. রোকনের স্ত্রী নাঈমা আক্তার সর্বশেষ যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় দেড় মাসের ছুটি নেন। বিদেশ যাবেন বলে ছুটি নিলেও তিনি কর্মস্থলে যোগ দেননি। এমনকি কাউকে ফোনও করেছেন। বিষয়টি জানিয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মিজানুর রহমান।

রোকনের শ্যালক ডা. মো. মর্তুজা কামাল বলেন, ‘সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের কারণে রোকনের সঙ্গে আমার কথা হয় না। পারিবারিক ঝামেলা চলছিল। সে সময় অন্যের মুখে শুনেছিলাম, সপরিবারে ঈদ করতে দেশের বাইরে গেছে। ঈদের পর চলে আসবে। কিন্তু তারা আর ফেরেনি।’ তিনি জানান, নাদিয়া ও নাদিয়ার স্বামী শিশির নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।

ডা. রোকন উদ্দিনের বড় ভাই খন্দকার হাফিজ উদ্দিন সোমবার বলেন, ‘মাস দুই আগে ফোনে রোকনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। সে আমাকে বলেছে, সে ভালো আছে। ইরাক ও সিরিয়ায় যুদ্ধাহত সিভিলিয়ান শিশুদের চিকিৎসা দেয় রোকনসহ একটি স্বেচ্ছাসেবক দল। ওই দলে তার মতো অনেক চিকিৎসক আছে। সিরিয়া ও ইরাকে হামলায় আহত শিশুদের কেউ চিকিৎসা দেয় না। রাশিয়ার হামলায় ওইসব দেশের মানুষ চিকিৎসা না পেয়ে মারা যান। আহতাবস্থায় যেখানে-সেখানে পড়ে থাকে শিশুরা। সেসব শিশুদের উদ্ধার করে কোনো হাসপাতালে নিয়ে রোকনসহ তার টিম চিকিৎসা দেয়। তবে কোন দেশে সে অবস্থান করছে, সেটা বলেনি। তার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও মেয়ের জামাই কোন একটি দেশে বাড়ি ভাড়া করে ভালোভাবে আছে বলেও জানিয়েছে রোকন।’

রোকনের স্ত্রীর বোন ডা. হালিমা বলেন, গত বছরের ২৪ রোজার রাতে রোকনদের ফ্লাইট ছিল। যাওয়ার দিন বিকালে আমাকে বলেছেন, তারা দেশের বাইরে যাচ্ছেন। গত এক বছরে তাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে ৩-৪ বার কথা হয়েছে। তারা শুধু বলেছে, তারা একটি মুসলিম দেশে আছে। এছাড়া আর কোনো তথ্য দেয়নি।

রামপুরা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, নিখোঁজের বিষয়ে ডা. রোকনের স্বজনদের কেউ থানায় জিডি করেননি। ফলে বিষয়টি আগে জানা ছিল না। সম্প্রতি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সপরিবারে রোকনের নিখোঁজের বিষয়টি জানা যায়।

ডা. রোকন ছাড়াও গুলশানের সেজাদ রউফ ওরফে অর্ক ওরফে মরক্কো (পাসপোর্ট নম্বর ৪৭৬১৪৫৯৯২) ও বনানীর তাওসীফ হোসেন (পাসপোর্ট নম্বর- বিই০৩৫২৭৬১) নিখোঁজের খবর পাওয়া গেছে। এর আগে গুলশান হামলার দু’দিন পর ১০ জন নিখোঁজের খবর সামনে আসে। তাদের ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ করে তাদের ফিরে আসার আহ্বান জানায় তাদের স্বজনরা। এরপর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও শতাধিক ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়। প্রায় প্রতিদিনই নিখোঁজের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। আইনশৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে নিখোঁজদের ব্যাপারে তথ্য চেয়ে আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দফতর ও র‌্যাব আলাদা ভাবে দুটি সেল খুলেছে। এছাড়া নিখোঁজের পর যারা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছে তাদের বিষয়ে তথ্য পেতে র‌্যাব আলাদা একটি অ্যাপসও চালু করেছে।

আরও পড়ুন