বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

দেশে বিদেশির নিরাপত্তায় নানা পদক্ষেপ, কোথাও হিমশিম পুলিশ

Security Gulshanবাংলাদেশে বিভিন্ন কারণে অবস্থানরক বিদেশীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এছাড়া দূতাবাস ও বিদেশী সংস্থাসহ দেশীয় ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেছে।

বিদেশীরা বাংলাদেশের এয়ারপোর্টে নামার পর থেকে দেশটিতে তাদের কাজ শেষ করা পর্যন্ত ‘ক্লোজড প্রটেকশন’-এ থাকবে পুলিশ। বিদেশীদের কর্মস্থল ও বাসভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য র‌্যাব ও পুলিশ সারা দেশে ইতিমধ্যে নজরদারি শুরু করেছে। সারা দেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিস ও প্রতিষ্ঠানে কত সংখ্যক বিদেশী কর্মরত আছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান জানা না গেলেও আইনশৃংখলা বাহিনী সম্ভাব্য সব বিদেশীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। তবে সিলেটে ঘন ঘন আসা-যাওয়া করা প্রায় ৫৬ হাজার বিদেশী নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে স্থানীয় পুলিশসহ আইনশৃংখলা বাহিনী রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে বলে জানিয়েছে তারা।

সূত্র জানিয়েছে, ঢাকাস্থ জাতিসংঘ অফিস, দূতাবাস, বিদেশী সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংক, গুরুত্বপূর্ণ অফিস এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ এ পর্যন্ত ৪৩টি প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। ক্রীড়াঙ্গনের বিদেশী কোচ ও খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্যও আবেদন করা হয়েছে। এসব আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইতিমধ্যে আইনশৃংখলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাছাড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে জাইকার একজন বিশেষজ্ঞ ঢাকায় এসেছেন। তিনিও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করে জাপানি নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। গত ১০ জুলাই থেকে ১৮ জুলাই পর্যন্ত জাতিসংঘ ও বিদেশী সংস্থাসহ ২৩টি রাষ্ট্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ ২০টি প্রতিষ্ঠান নিজেদের নিরাপত্তা বাড়াতে আবেদন করেছে। ক্রীড়াঙ্গনে ৬৩ জন বিদেশী কোচ ও খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবেদন জমা দিয়েছে। বেসরকারি পর্যটন সংস্থাগুলোও বাংলাদেশে বেড়াতে আসা বিদেশীদের নিরাপত্তার জন্য স্ব স্ব অবস্থান থেকে বিভাগীয় শহরে ডিআইজি ও জেলা শহরে এসপির কাছেও আবেদন জানিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল টেলিফোনে বলেন, ‘বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দূতাবাস তাদের আশংকার কথা ব্যক্ত করে চিঠি দিয়েছে। আমরা নিরাপত্তা বাড়িয়ে দিয়েছি। পুলিশকে সহায়তা করার জন্য আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার অন্যান্য সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে যেসব বিদেশী নাগরিক কর্মরত রয়েছেন, তাদের নিরাপত্তার বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পুলিশ ও র‌্যাবকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, যেসব দেশের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবেদন করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, জাপান, ডেনমার্ক, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সিয়েরালিয়ন, নরওয়ে, সুইডেন, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, আফগানিস্তান, তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া ও থাইল্যান্ড। এ ছাড়া জাতিসংঘ বাংলাদেশে অবস্থিত তাদের ২৩ অফিস এবং ইউএনডিপির কনসালট্যান্ট ড. রাম এ শর্মার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবেদন করেছে। অবশ্য গুলশান হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশের রাষ্ট্রদূতরা তাদের দূতাবাস ও বাসভবনের নিরাপত্তা বাড়াতে আবেদন করেছিলেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তারক্ষীদের নিজস্ব অস্ত্র দেয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষীদের অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি না দেয়া হলেও সন্তোষজনক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে।

এ ছাড়া নিরাপত্তা জোরদার করতে আবেদন করেছে- বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় জাদুঘর, পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ঈশ্বরদী ইপিজেড, পদ্মা সেতু প্রকল্প, মেট্রোরেল প্রকল্প, কর্ণফুলী সার কারখানা (কাফকো), জামালপুরের যমুনা সার কারখানা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি), ঢাকা অফিসার্স ক্লাব, সাভারের বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি), বাংলাদেশে অবস্থিত জাপানিজ স্কুল, যমুনা সেতু, কাঁচপুর সেতু, বুড়িগঙ্গা সেতু, কর্ণফুলী সেতু, ভৈরব সেতু, মেঘনা সেতু, নবম গ্লোবাল ফোরাম ফর মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (জিএফএমডি) সম্মেলন এবং ২৩ জুলাই অনুষ্ঠিত জনপ্রশাসন পদক প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজকরা। উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত বিদেশীদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানানো হয় আবেদনে। এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- সিলেট অঞ্চলের বিবিয়ানা, জালালাবাদ, মৌলভীবাজার এবং কুমিল্লার বাঙ্গুরা গ্যাসক্ষেত্র।

রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বে থাকা পুলিশের সহকারী কমিশনার (চেন্সারি) আবদুল্লাহ আল মাসুদ এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, গুলশানের কূটনৈতিক জোনে ৪৯টি দূতাবাস রয়েছে। তাদের চাহিদা অনুযায়ী সব দূতাবাস ও বাসভবনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর আরও কিছু দেশ নিরাপত্তা বাড়ানোর ডিমান্ড দিয়েছে। ইতিমধ্যে চাহিদা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও তাদের বাসভবনের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

এর আগে ইতালীয় নাগরিক সিজারি তাভেল্লা ও জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য আবেদন জানান। এ ইস্যুতে তারা একাধিকবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে দেখা করেছেন। এমনকি নিরাপত্তার জন্য ঢাকার মার্কিন দূতাবাস অস্ত্র ব্যবহারের মতো প্রস্তাবও দেয়।

এয়ারপোর্ট থেকেই শুরু বিদেশীদের নিরাপত্তা : গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর থেকে গুলশান, বারিধারা ও বনানীর কূটনৈতিক এলাকাসহ সব বিদেশীর নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি এ এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশও মাঠে কাজ করছে। দেশে আসা বিদেশী বায়ার, বিদেশী অতিথি, খেলোয়াড়, বিদেশী টুরিস্টদের জন্যও নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশীরা বাংলাদেশের এয়ারপোর্টে নামার পর থেকে দেশটিতে তাদের কাজ শেষ করা পর্যন্ত ‘ক্লোজড প্রটেকশন’-এ থাকবে পুলিশ। বিদেশীদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজর রাখা হচ্ছে। প্রতিদিন তাদের বাসা ও অফিসে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারা। এ ছাড়া কোনো বিদেশী নিরাপত্তা চাইলে পুলিশ তাকে স্কটও দেবে।

১ জুলাই গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কে হলি আর্টিজান বেকারি অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে ও ঈদের দিন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদগাহে হামলার ঘটনার পর থেকেই এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃংখলা বাহিনী। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ আইনশৃংখলা রক্ষায় পেট্রলিং, চেকপোস্ট, ব্লক রেইড, তল্লাশি অভিযানসহ দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান পুলিশি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি স্থায়ী চেকপোস্ট করে সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করা হচ্ছে। বিভিন্ন দূতাবাস, ঢাকাস্থ আন্তঃসংস্থার স্থানীয় কার্যালয়, দূতাবাস সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যালয় ও কূটনৈতিক আবাসিক এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

কূটনৈতিক নিরাপত্তা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) জসিম উদ্দিন বলেন, গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যরা মাঠে আছেন। কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তায় পুলিশের গুলশান বিভাগ ও কূটনৈতিক বিভাগ পুলিশের সঙ্গে বিশেষায়িত টিম সোয়াত ও এপিবিএন সমন্বয় করে কাজ করছে। পুরো কূটনৈতিক এলাকায় চেকপোস্ট আছে। গাড়ি তল্লাশি করা হচ্ছে। পুরো এলাকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে পুলিশের পেট্রল টিম থাকছে। গুলশান-২ নম্বরে এপিসি গাড়ি স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি। গুলশান পুলিশ, ডিপ্লোমেটিক ডিভিশন, এপিবিএন, র‌্যাবসহ কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা মনিটরিং করছে। ডিসি বলেন, পুরো গুলশান ও বারিধারার বেশিরভাগ শাখা রোড বন্ধ করে দেয়া হবে। বিশেষ করে যেসব সড়কে মানুষের চলাচল কম এবং নিরিবিলি সেগুলো বন্ধ থাকবে। বারিধারার জন্য একটি সড়ক খোলা থাকবে। তিনি জানান, দূতাবাসগুলো কিংবা ব্যক্তিগতভাবে কোনো বিদেশী নিরাপত্তা চাইলে নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের স্কটও দেয়া হবে।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের ডিআইজি আবদুস সালাম বলেন, বিদেশী বায়াররা বাংলাদেশের এয়ারপোর্টে নামার পর থেকেই তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা আছে। আমরা বিজিএমইএ, বিকেএমইসহ যারা বিদেশী বায়ারদের আসা-যাওয়ার বিষয়টি দেখভাল করে তাদের বলেছি, বিদেশী বায়াররা এয়ারপোর্টে নামার আগেই আমাদের বলার জন্য। বিদেশীরা এয়ারপোর্ট থেকে নামার পর মাঠে তাদের কাজকর্ম শেষ করা পর্যন্ত সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দেয়া হবে। বিএসআরএম স্ট্রিল মিল কর্তৃপক্ষসহ অনেকেই তাদের বিদেশী বায়ার বা তাদের অতিথির জন্য নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করেছে। তাদের বিদেশী বায়ার বা অতিথি এলেই আমরা এয়ারপোর্ট থেকে তাদের সব জায়গায় নিরাপত্তা দেব। এমন বিদেশী বায়ারদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

টুরিস্ট পুলিশের ডিআইজি সোহরাব হোসেন বলেন, বিদেশী টুরিস্টদের ‘ক্লোজড প্রটেকশন’ দেয়া হয়। তাদের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিদেশী টুরিস্টরা কোনো টুর অপারেটর কোম্পানির মাধ্যমে দেশে আসে। এসব কোম্পানি টুরিস্ট পুলিশকে বিষয়টি জানায় এবং তখন টুরিস্টদের থাকার হোটেল, বেড়ানোর জায়গা এমনকি গাড়িতেও সার্বক্ষণিক পুলিশ দেয়া হয়।

নিরাপত্তা পর্যালোচনায় ঢাকায় জাইকা কর্মকর্তা : বাংলাদেশে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রকল্পে কর্মরতদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি গুলশানের জঙ্গি হামলায় জাপানের নাগরিক হত্যার ঘটনার পর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে জাইকা। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ-আলোচনার পর মেট্রোরেলসহ বাস্তবায়িত প্রকল্পে কর্মরত বিদেশী নাগরিকদের বাসা ও অফিসে বিশেষ নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে পদ্মা সেতু প্রকল্প জঙ্গি হামলার টার্গেট হতে পারে বলে মনে করছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

সূত্র জানায়, নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে জাইকার প্রধান কার্যালয়ের সিনিয়র স্পেশাল অ্যাডভাইজার মাসাকি কাতো বর্তমানে বাংলাদেশ সফর করছেন। গত রোববার ও সোমবার দু’দিনের সফরে তিনি সরকারের উচ্চপর্যায়ে বৈঠক করছেন বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে জাইকা অফিস বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) তথ্য জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, জঙ্গি হামলায় নিহত ৬ জনের পরিবারের কাছে ইতিমধ্যে মেট্রোরেল প্রকল্পের পক্ষ থেকে শোক ও সমবেদনা জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক কায়কোবাদ হোসাইন। এ ছাড়া এমআরটি-১ ও ৫-এ কর্মরত যারা নিহত হয়েছেন তাদের বদলে শিগরিগই নতুন কর্মকর্তা যোগ দিচ্ছেন বলেও জানান তিনি। তবে কবে যোগ দিচ্ছেন তা জানাতে পারেননি।
বর্তমানে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পে কতজন বিদেশী কর্মরত রয়েছেন তা জানা না গেলেও চলমান এমআরটি-৬ প্রকল্পে চারটি দেশের ১৮ জন বিদেশী কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে। যারা বর্তমানে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন না। অফিসে বসেই নির্ধারিত কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাদেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।

বিদেশী কোচের নিরাপত্তায় আবেদন : গুলশানের স্প্যানিশ হোটেল হলি আর্টিজানে জিম্মি-কাণ্ডের পর নড়েচড়ে বসেছেন ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর কর্মকর্তারা। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী কোচ ও খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দারা সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন। পাশাপাশি সরকারের কাছে বাড়তি নিরাপত্তার জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। বর্তমানে দেশে ৬৩ জন বিদেশী কোচ ও খেলোয়াড় রয়েছেন। সর্বাধিক ৫০ জন বিদেশী রয়েছেন ফুটবলে। এদের মধ্যে পাঁচজন কোচ ও ৪৫ জন ফুটবলার। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ক্রিকেট। ছয়জন কোচ রয়েছেন এই ডিসিপ্লিনে। এ ছাড়া শুটিংয়ে চারজন এবং তায়কোয়ানডো, সুইমিং ও আরচারিতে একজন করে বিদেশী কোচ রয়েছেন। কোচ ও কোচিং স্টাফদের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে বিসিবি।

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, চট্টগ্রামে বিদেশীদের নিরাপত্তায় নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। এমনকি বিদেশীদের কর্মস্থল ও বাসভবনের সামনে মোতায়েন করা হয়েছে সশস্ত্র পুলিশ। চলাফেরায়ও বিদেশীদের সঙ্গে থাকছেন আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ব্যবসার প্রয়োজনে যেসব বিদেশী চট্টগ্রামে আসছেন বিমানবন্দর থেকে তাদের পৌঁছে দেয়া হচ্ছে গন্তব্যে। চট্টগ্রাম শিল্পাঞ্চল পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদেশীদের নিরাপত্তায় আগের চেয়ে সতর্ক রয়েছে পুলিশ। নগর পুলিশের পাশাপাশি শিল্পাঞ্চল পুলিশও বিদেশীদের নিরাপত্তায় কাজ করছে। সিএমপির এডিসি (মিডিয়া) আনোয়ার হোসেন বলেন, বিদেশীদের বসবাসস্থল বিশেষ করে খুলশী, হালিশহর ও সুগন্ধায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিদেশী নাগরিক কর্মরত কারখানাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। এদিকে সীতাকুণ্ডের সব কারখানা থেকে বিদেশী নাগরিকদের তালিকা চেয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম ভুইয়া।

রাজশাহী : রাজশাহী ব্যুরো জানিয়েছে, গুলশানে জঙ্গি হামলায় ১৭ বিদেশী নাগরিককে হত্যার পর রাজশাহীতে অবস্থানকারী ৭৮ বিদেশী নাগরিকের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তাদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তায় নিয়োজিত রাখা হয়েছে পুলিশের বিশেষ দল ও ও র‌্যাব সদস্যদের। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র ও রাজপাড়া জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) ইফতে খায়ের আলম বলেন, ‘আমরা বিদেশীদের পুলিশের মোবাইল ফোন নম্বর দিচ্ছি। এ ছাড়া তারা যেসব এলাকায় যাচ্ছেন বা যাবেন সেসব এলাকায় গোয়েন্দাদের নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।’ রাজশাহীর পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।’

সিলেট : বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে হিমশিম খাচ্ছে সিলেটের পুলিশ। এর মধ্যে তাদের নেই প্রয়োজনীয় যানবাহন ও জনবল। এসব সমস্যা সমাধানে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে দফায় দফায় আবেদন-নিবেদন জানানো হলেও তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এ অবস্থার মধ্যে থেকেই নিশ্চিত করতে হচ্ছে বিদেশী নাগরিক, সংখ্যালঘু, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনার নিরাপত্তা। সিলেটে ঘন ঘন আসা-যাওয়া করা প্রায় ৫৬ হাজার বিদেশী নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃংখলা বাহিনী। তাছাড়া সিলেট বিভাগের চার জেলা পাহাড়, টিলা, হাওরবেষ্টিত। এ বিভাগের প্রায় ৭০টি উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্পটেও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিতে পারছে না পুলিশ।

বগুড়া : বগুড়া ব্যুরো জানায়, বগুড়ায় অধ্যয়নরত ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২০২ জন বিদেশী নাগরিক ভালো আছেন। গুলশান হামলার পর তাদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। তাদের সতর্কভাবে চলাফেরা করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ঘর বা কর্মস্থলের উদ্দেশে বের হলেই নিরাপত্তার স্বার্থে সাদা পোশাকে পুলিশ তাদের অনুসরণ করছে।

কুমিল্লা : কুমিল্লা ব্যুরো জানায়, কুমিল্লায় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৪৫৬ জন বিদেশীকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দিচ্ছে পুলিশ। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মো. শাহ আবিদ হোসেন বলেন, ‘কুমিল্লায় কর্মরত ৪৫৬ জন বিদেশী এখন আমাদের নিরাপত্তার ভেতরে রয়েছেন।’ তিনি বলেন, এসব বিদেশীকে নিয়ে শংকার কোনো কারণ নেই।

খুলনা : রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় বিদেশীদের জিম্মি করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে খুলনা নগরীতে অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের ২৩০ জন বিদেশী নাগরিক বর্তমানে খুলনার বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) একটি সূত্র। কেএমপির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার শেখ মনিরুজ্জামান মিঠু জানান, খুলনায় অবস্থানরত ২৩০ জন বিদেশী নাগরিকের ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে।

ময়মনসিংহ : ময়মনসিংহে অধ্যয়নরত বিদেশী শিক্ষার্থী ও কর্মরত বিদেশী নাগরিক ও পর্যটকদের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার মঈনুল হক। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৃথক পুলিশ কেন্দ্র রয়েছে।

যশোর : যশোরে অবস্থানরত ৪৮ জন বিদেশী নাগরিকের নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। যশোর ডিএসবি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, বিদেশীদের নিরাপত্তায় পুলিশ বিশেষ নজরদারি করছে। যশোরের সহকারী পুলিশ সুপার ভাস্কর সাহা বলেন, বিমানবন্দর, থাকার হোটেল ও কাজে নিয়োজিত থানা এলাকায় বিদেশীদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
রংপুর : রংপুর ব্যুরো জানায়, রংপুরে জেলাসহ এ বিভাগের সব কটি উপজেলায় জঙ্গি তৎপরতার জন্য পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার নিরাপত্তা কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। রংপুর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল ফারুক (অপরাধ শাখা) জানান, বিভিন্ন দেশের মুসল্লিরা তাবলিগ জামাতে এসে যেসব মসজিদে অবস্থান করছেন তাদের এবং কাদিয়ানি মসজিদে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তাদের জন্য সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন পুলিশ, র‌্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।

বরিশাল : বরিশাল নগরীসহ বিভাগে কর্ম ও পড়াশোনা করতে ১১৭ বিদেশী অবস্থান করছেন। তাদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। বরিশাল মহানগর পুলিশের (বিএমপি) মুখপাত্র সহকারী কমিশনার (ডিবি) মো. ফরহাদ সরদার জানান, বিদেশীদের কর্মস্থলে পৌঁছে দেয়াসহ সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রধারী পুলিশ দেয়া হয়েছে। কোনো বিদেশীকে একা একা চলাচল করতে দেয়া হয় না।

আরও পড়ুন