মহিবুল ইজদানী খান, স্টকহলম থেকে।
জেনারেল জিয়াউর রহমানের সামরিক আইনের ভয়ে একসময় বাংলাদেশ ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম। সে তো অনেক দিন আগের কথা এর মাঝে কেটে গেছে অনেক বছর। দেশ ছাড়লেও রাজনীতি আমাকে ছাড়েনি কিংবা আমি রাজনীতিকে ছাড়িনি। তবে বাংলাদেশে থাকাকালীন সময়ের রাজনীতি আর সুইডেনের রাজনীতির মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্যের উপর নির্ভর করে বলতে পারি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসার প্রয়োজন রয়েছে। রাজনৈতিক দল ও নেতা নেত্রীরা এখনো সেই পুরানো ধারাকেই আঁকড়ে ধরে বসে আছেন। যার ফলে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রসারে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিটি দলের রাজনীতিবিদদের এখন গণতন্ত্রের চলার পথকে উম্মুক্ত করে দিতে হবে। ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে আমি সক্রিয় না হলে হয়তো আমার চোখের পর্দা আদৌ খুলতো কি না তাতে সন্দেহ রয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো আসলে চলছে কিভাবে? এখানে দলের নেতৃত্ব নির্বাচিত হয় কিভাবে? দলগুলোর জাতীয় কাউন্সিল হয় কেন? দলের সদস্য যারা তারা কি সদস্য পদ নবায়নের জন্য প্রতি বৎসর ফি পরিশোধ করেন? দল থেকে কাউকে বহিষ্কার করার কি কোনো নীতি আছে? দেশের বিভিন্ন স্থানের নেতৃত্ব ও কমিটি নির্বাচিত হয় কিভাবে? কেন্দ্র থেকে দলের অন্যান্য কমিটিকে স্বীকৃতি দেওয়া আর না দেওয়ার ক্ষমতা কেন রাখা হয়েছে? দল কর্মী নির্ভরশীল না হয়ে নেতা নেত্রীদের উপর কেন নির্ভরশীল? দলীয় প্রধানের ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার অধিকার সদস্য কিংবা অন্যান্ন নেতাদের নাই কেন? জাতীয় কাউন্সিল হয় কিভাবে? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন এখন আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রকৃত গণতন্ত্র আদৌ কি কোনোদিন আসবে?
নব্বইয়ের শুরুতে সুইডেনের মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে এখন মনে হয় আশ্চর্য এক পথে চলছে বাংলাদেশের রাজনীতি। এখানে জবাবদিহিতার কোনো প্রশ্ন নেই। দলের একক নেতা ও নেত্রীদের কোথায় চলছে দল। ভাবখানা এই যে দলীয় প্রধান যা বলবেন তার সব কিছুই ঠিক। তিনি কখনো ভুল করতে পারেন না। দলীয় প্রধানের কথাই দলের কথা। দলীয় প্রধানের একক সিদ্ধান্তই দলের সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে দলের ভেতরে ও বাহিরে থাকা তোষামোদকারী আর চাটুকারীরা নেতা নেত্রীকে খুশি করায় ব্যস্ত। কি আজব এক রাজনীতি চলছে বাংলাদেশে। একে রাজনীতি না বলে রাজনীতির কৌশল বলা যেতে পারে। এ ধরণের রাজনৈতিক কৌশল আর কতদিন চলবে বাংলাদেশ?
গত ৫, ৬, ৭ ও ৮ ই মে অনুষ্ঠিত সুইডিশ লেফট পার্টির জাতীয় কাউন্সিলে স্টকহোল্ম জেলা শাখা থেকে আমরা ৫২ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছিলাম। প্রতি দুই বৎসর অন্তর অন্তর সুইডিশ লেফট পার্টির জাতীয় কাউন্সিল হয়ে থাকে। এধরণের কাউন্সিলে প্রতিনিধিদের সরাসরি ভোটে দলের সভাপতি সহ কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত করা হয়। এই সময় সারা সুইডেন থেকে দলের প্রতিনিধিরা এই জাতীয় কাউন্সিলে অংশগ্রহণ করে থাকেন। চলতি বছরের জাতীয় কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় কমিটির ১১ সদস্য বিশিষ্ট নমিনেশন কমিটিতে আমাকে নির্বাচিত করা হয়। এই নমিনেশন কমিটির দায়িত্ব এখন আগামী ২০১৮ মে মাসে অনুষ্ঠিত দলের জাতীয় কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সহ পূর্ণাঙ্গ কমিটির প্রস্তাব উত্থাপন করা। পরবর্তীতে সম্মেলনে উপস্থিত প্রতিনিধিদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে ২০১৮ – ২০২০ কমিটি। এইসময় নমিনেশন কমিটির দেওয়া প্রস্তাবের পক্ষে ও বিপক্ষে প্রতিনিধিরা মঞ্চে এসে সর্বোচ্চ তিন মিনিট বক্তব্য রাখতে পারেন এবং নিজেদের প্রিয় কেন্ডিডেটের পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য আবেদন জানাতে পারেন। এর পর পর শুরু হয় ভোট। এ পর্যন্ত নমিনেশন কমিটির দেওয়া প্রস্তাব সব সময় পাশ হয়ে এসেছে। তবুও সুযোগ দেওয়া হয় যার যার কেন্ডিডেটের পক্ষে কথা বলার জন্য। তবে কোনো ক্যান্ডিডেটের বিপক্ষে নয়। সারা দেশ থেকে আসা প্রতিনিধিদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয় কেন্দ্রীয় কমিটি। এর নামই হলো গণতন্ত্র।
বাংলাদেশের দুইটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের হয়ে যাওয়া জাতীয় কাউন্সিল দেখে আমাকে অবাক হতে হয়েছে। আমার কাছে বার বার প্রশ্ন জেগেছে দলের জাতীয় কাউন্সিল তাহলে হয় কেন? বাংলাদেশের বড় দুইটি দলের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হলো, কিন্তু সেখানে উপস্থিত প্রতিনিধিদের ভোটের কোনো কিছু আমার দৃষ্টিতে পড়লো না। একটি দল অনেকদিন পরও এখন পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটির নাম ঘোষণা করতে পারেনি। মিডিয়ার মতে দলীয় কর্মীরা ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে আছেন। ম্যাডাম যাদের নাম ঘোষণা করবেন তারাই হবেন কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা। ইতিমধ্যে মহাসচিব সহ কিছু কিছু গরুত্বপূর্ণ পদে যারা দায়িত্ব পালন করবেন ম্যাডামের নির্দেশে তাদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। বাকিরা এখনো অপেক্ষায় আছেন। অগণতান্ত্রিক পথে দায়িত্ব পাওয়া এসকল নেতারা পরবর্তীতে দেশে গণতন্ত্র কায়েমের জন্য সংগ্রাম করার কথা বলছেন। রাজনীতির নামে চলছে এক আজব কৌশল।
অন্য দলের অবস্থাটাও একই। কাউন্সিল হয়েছে কিন্তু কোনো কমিটি করা হলো না। কবে নাগাদ দলের সাধারণ সম্পাদক সহ পূর্ণাঙ্গ কমিটির নাম ঘোষণা করা হবে তা কেউ বলতে পারে না। সকলেই চেয়ে আছেন একজন ব্যাক্তির দিকে, আর তিনি হচ্ছেন নেত্রী। তার মানে নেত্রীর একক নির্দেশে নেতারা পাবেন তাদের স্ব স্ব দায়িত্ব। জাতীয় কাউন্সিল হয়েছে কিন্তু প্রতিনিধিদের ভোটে কোনো কমিটি নির্বাচিত হলো না। এধরণের রাজনৈতিক দলকে কি আমরা কখনো গণতান্ত্রিক দল বলে আখ্যায়িত করতে পারি? দলের ভেতরেই যদি গণতান্ত্রিক সিস্টেম চালু না থাকে তাহলে দেশ পরিচালনায় গণতান্ত্রিক ভূমিকা আসবে কি করে? বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের জাতীয় কাউন্সিল তাহলে হয় কেন? সারা দেশ থেকে দলীয় প্রতিনিধিদের কেন ঢাকায় ডেকে আনা হয়? লোক দেখানো এই জাতীয় কাউন্সিলে কেন খরচ করা হয় এই বিশাল অর্থ? প্রতিনিধিদের ভোটের মাধ্যমেই যদি নেতৃত্ব ও কমিটি নির্বাচিত না করা হয় তাহলে কিসের জন্য হয় এই জাতীয় সম্মেনলন?
সুইডেনের জাতীয় সংসদে অবস্থানরত প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের জাতীয় কাউন্সিলের মধ্যে দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি নির্বাচিত করে থাকে। এমনকি বর্ণবৈষম্যবাদী রাজনৈতিক দল সুইডিশ ডেমোক্রেটেও রয়েছে একই নীতি। গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনৈতিক দলগুলো না চললে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ দলের নিবন্ধন বাতিল করার নিয়ম রয়েছে। কারণ দল রেজিস্ট্রেশনের সময় সেখানে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকতে হবে কি নিয়মে চলবে দল। যতটুকু জানি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বেলায়ও রয়েছে একই নিয়ম। ডক্টর ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন অস্থায়ী সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলোতে একটা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। জানি না সে নিয়মগুলো এখনো বহাল আছে কি না।
ইউরোপের সবগুলো রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক নিয়মে পরিচালিত হলেও বাংলাদেশে বেলায় নিয়মগুলো শুধু স্ব স্ব দলের গঠনতন্ত্রের পাতায় সীমাবদ্ধ। ইউরোপে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব কর্মীদের উপর নির্ভর করলেও বাংলাদেশের রাজনীতি নেতা নেত্রীর উপর নির্ভর করে। যার কারণেই দলের ভেতরে ও বাহিরে রয়েছে অশংখ্য চাটুকার। কারণ নেতা নেত্রীর কৃপার উপর নির্ভর করে অন্নান্যদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। এভাবে একক নেতৃত্বের উপর নির্ভর করলে দলে কোনো দিন গণতন্ত্র আসবে না। আর দলে গণতন্ত্র না আসলে দেশ পরিচালনায়ও গণতন্ত্র আসতে পারে না।
অন্যদিকে দলীয় প্রধানের সমালোচনা করার সাহস কারো নেই। কারণ করলেই তখন তাকে দলে কর্নার করে রাখা হয়। কিংবা চাটুকাররা দলীয় নেতা নেত্রীদের খুশি করার জন্য দলীয় প্রধানের সমালোচনা করা নেতাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। এই কারণে ইচ্ছা থাকলেও কোনো নেতা দলীয় প্রধানের ভুল ধরার সাহস পায় না। একে আমি গণতন্ত্র বাংলাদেশি স্টাইল বলে আখ্যায়িত করতে পারি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে আর কতদিন চলবে গণতন্ত্রের নামে এই অগণতান্ত্রিক সিস্টেম?



Leave a Reply