বাংলাদেশসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে জঙ্গিদের হামলা চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই একটি প্রশ্ন ইনিয়ে বিনিয়ে করছেন- মুসলিমরাই কেন তাহলে শুধু জঙ্গি হচ্ছে? এর জবাবে যাওয়ার আগে কিছু বিষয় আলোচনা প্রয়োজন।
নবীজী (সঃ) অক্ষর জ্ঞানহীন ছিলেন। তিনি ঘর ছেড়ে হেরা গুহায় ধ্যান করলেন ১৫ বছর, এলো ইসলাম, পৃথিবীর সমস্ত গুপ্ত–প্রকাশ্য জ্ঞান ধরা দিল তাঁর কাছে। যীশুখ্রিষ্টের আরেক নাম ঈসা (আঃ)। তিনিও কৈশোরের পর জীবনের একটা বড় সময় কোথায় ছিলেন কেউ জানেনা। এখন অনেকে ই বলে, তাঁর ওই সময়টা কেটেছে নালন্দা বিহারে জ্ঞান চর্চা করে! কিন্তু তিনি নালন্দায় পড়লে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার করতেন; খ্রিস্টান ধর্মের না! গৌতম বুদ্ধ যুবরাজ সিদ্ধার্থ থেকে গৌতম বুদ্ধ হলেন ঘর ছেড়ে দীর্ঘ কাল ধ্যান সাধনা করে। শ্রী কৃষ্ণ ও তাই। বনী ঈসরাইলদের নবী মূসা (আঃ)ও তাই। আসলে তাঁরা কেউ আনুষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেননি। আমরা বলছিনা, আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কেবল সনদপত্র দেয়, সে শিক্ষায় মনুষ্যত্বের শিক্ষা খুব কম থাকে, এটা আমরা বলছিনা। কিন্তু আজকের বাস্তবতা বলে…! তাছাড়া তাঁরা কেউ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা ইহুদী হয়ে পৃথিবীতে আসেননি। এসেছিলেন মানব সন্তান হয়ে…এসেছিলেন অন্যায়, পাপাচার আর দূর্ণীতিতে ভরা একেকটা জনপদে! পারিবারিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ভুল ও যুক্তিহীন দিকগুলো তাঁদের ভাবিত করেছিল। কঠোর ধ্যান সাধনার মধ্যদিয়ে তাঁরা আগে নিজেদের চিনেছেন, সত্যকে জেনেছেন। তারপর মানুষকে ডেকেছেন সেই সত্যের পথে।
আজ আমরা জন্ম নিই মুসলিম হয়ে, হিন্দু হয়ে, খ্রিষ্টান হয়ে, বৌদ্ধ হয়ে কিংবা ইহুদী হয়ে। বাবা–মা, ধর্মগুরুরা আমাদের যা শেখান, যা পড়ি, সারা জীবন আমরা সেটাই বিশ্বাস করি। আমাদের মনে কোনও প্রশ্ন জাগে না। নবী রাসূলগণও কোনও না কোনও পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা পারিবারিক শিক্ষায় আবদ্ধ থাকেননি। সত্যের সন্ধান করে ছিলেন, নিজের বিবেককে প্রশ্ন করে ছিলেন কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল, কি করা উচিত, কি করা উচিত নয়, কেন করা উচিত নয়। তাঁরা সত্যকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন, তাই আল্লাহ তাদের পথ দেখিয়েছিলেন। তাদের হাত ধরে মানবতার মুক্তি এসেছিল।
আর আমরা অন্ধের মত বিশ্বাস করি, তাই আমাদের ব্রেইনওয়াশ করা সহজ হয় ওদের জন্য। কাদের জন্য? তাদের জন্য যারা ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দেয়। কারা ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দেয়? যে কোনও মানুষ দিতে পারে, সে যে কোনও ধর্মের হতে পারে। কারণ, আমাদের চোখে আমার ধর্ম সেরা। অন্যরা ভুল! আসলে সঠিক কে? আমরা জানি না! আমরা আজ দলে দলে বিভক্ত। আমরা মানুষ নই! আমরা মানুষ হয়ে উঠার আগেই ছোট বেলাতেই মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা ইহুদী হয়ে যাই। তাই আমাদের জন্য মানুষ হবার চেয়ে আইএস হওয়া সহজ, জঙ্গি হওয়া সহজ! এটা শুধু মুসলমানদের জন্য নয় পৃথিবীর যে কোনও ধর্মের মানুষের জন্য একই ব্যাপার।
কারণ, সিরিয়া বা ইরাকের মত কোথাও মুসলিমরা মারা গেলে অন্য মুসলিমদের যেমন কষ্ট লাগে, তারা সেখানে যুদ্ধ করতে যেতে চায়; তেমনি অন্য ধর্মাবলম্বিদেরও হয়। তা না হলে আফগানিস্তানে বুদ্ধ মূর্তি ধ্বংস হওয়ায় শেষের দিকে জাপান কোয়ালিশন বাহিনীতে যোগ দিত না। বাংলাদেশে হিন্দুরা মারা গেলে ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করতো না! ফিলিস্তিনীরা একজন ইহুদী মারলে জবাবে হাজার হাজার ফিলিস্তিনী মারতো না! এটা খুবই স্বাভাবিক।
এখন প্রশ্ন হল মুসলিমরাই কেন তাহলে শুধু জঙ্গি হচ্ছে?
কারণ, তাদের জঙ্গি হবার পরিবেশ তৈরী হয়েছে। মুসলমানদের কি আছে– সম্পদ, জীবন, আর ঈমান ছাড়া? না প্রযুক্তি জ্ঞান, না উদ্ভাবনী কার্যক্রম, না বাজার ব্যাবস্থার উপর দখল! নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ বেঁচে বেঁচে তারা অন্যেরা যা বানাচ্ছে সেটা খাচ্ছে, অন্যেরা যে প্রযুক্তি আনছে সেটা ব্যাবহার করছে! সেটা আর কত দিন? কিন্দু এখন এই মুসলিমদের সম্পদ অন্যদের দরকার। তারা তো সেই সম্পদ দিবে না। তাই যুদ্ধ চাপিয়ে দাও। যুদ্ধ তো সারা জীবন করা যাবেনা। আবার এমনি ছেড়ে দিলে তারা আবার দেশকে গুছিয়ে নিবে! তাই তাদের দলে দলে বিভক্ত করে দাঙ্গা লাগিয়ে রাখ, নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখ! ব্যাবসা হবে চতুর্মূখী! তোমাদের সম্পদ আমাদের হল, অস্ত্র গোলাবারুদ সব আমারাই দিব, তোমরা শুধু মার আর মর!
পরিস্থিতি আজ এমন যে মুসলিমদের আজ এক হওয়া প্রায় অসম্ভব! তারা মরতেই থাকবে। ধর্মীয় নেতারা এসব দেখে ফতোয়া দেবেন, যুবকদের জীবন দিতে উৎসাহ দিবেন; বলবেন তোপ চালাও! কতল কর! কিন্তু এইটা বলবেননা, যে- হে মেধাবী যুবকেরা, তোমরা জাতিকে সবনির্ভর করে তোল। যাতে অন্যদের পণ্য ব্যবহার করতে না হয়।
চাল, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন থেকে শুরু করে শিক্ষা, চিকিৎসা, সমর প্রযুক্তি সব দিক থেকে পরনির্ভরশীল একটা জাতির মেধাবী যুব সমাজ আজ চলল জীবন দিতে, জীবন নিতে। কে এই মেধাবী যুব সমাজকে বোঝাবে, তোমাদের অপার সম্ভাবনাময় মেধাকে কাজে লাগাও, দেশকে সবনির্ভর কর; তোমাদের গায়ের জোরকে নয়, মেধাকে ব্যাবহার কর। বেদনাকে শক্তিতে পরিণত কর; নিজেদের রাগকে সবংবরন কর! এটাই হবে তোমাদের শ্রেষ্ঠ আত্মত্যাগ। এটাই তোমাদের যুদ্ধ। জীবন দিতে বা জীবন নিতে সবাই পারে; কিন্তু একটা মানবতার শিক্ষায় আলোকিত সবনির্ভর জাতি গড়তে সবাই পারেনা। এর জন্য শক্তি লাগে, সাহস লাগে, আদর্শ লাগে, যা তোমাদের আছে। ওরে শুধু তোমাদেরই আছে।
তাই তোমরা আর ধর্ম ব্যাবসায় জড়িওনা, ব্যবসায়ী ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের হাতের পুতুল হইয়ো না! তোমরা যখন ধর্মের নামে নিজেদের অকাতরে বিলিয়ে দাও ওরা তখন তোমাদের নিয়ে উপহাস করে! তোমরা কি উপহাসের পত্র হতে পার?
মানুষ নিয়ে ব্যবসা, ধর্ম নিয়ে ব্যাবসা অতি পুরাতন ব্যবসা!
যদি তাই না হতো, তাহলে প্রতিটা ধর্ম এতো ভাগে বিভক্ত কেন?
এই যে, মুসলিমদের প্রধান ২ টি ভাগ শিয়া আর সুন্নি। এর ভেতরে আবার ভাগ আছে ৪টি- হানাফি, শাফীই, মালিকী ও হানবালী। এখানেই শেষ না। নতুন সংযোজন সালাফী; এই সালাফিদের আবার উপ-গোত্র আছে – জিহাদি সালাফী ও নব্য সালাফী। আবার আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাসী সূফীবাদ তো আছেই। আবার আছে ইখওয়ান বা Muslim Brotherhood, তাবলীগে জামায়াত, হিজবুত তাহরির। আর কাদিয়ানী, খারিজীদের কথা আর নাইবা বললাম। এরা সবাই মনে করে ইসলাম ধর্ম পৃথিবীর সেরা ধর্ম। আর ইসলাম ধর্মের মধ্যে তাঁদের নিজেদের ধারাটাই সহি। বাকিরা ভ্রান্ত।
শুধু মুসলিমদের এই অবস্থা নয়। খ্রিস্টান ধর্মে ভাগ আছে আরও বেশি- ক্যাথলিক, অর্থডক্স, লুথেরানস, আঙলিকান্স বা ব্যাপ্টিস্ট। যাদের আবার বহু উপ ধারা আছে। যারা সবাই মনে করে খ্রিস্টান ধর্ম পৃথিবীর সেরা ধর্ম। আর খ্রিস্টান ধর্মের মধ্যে তাঁদের নিজেদের ধারাটাই সহি। বাকিরা ভ্রান্ত।
ইয়াহূদীদের ও ভাগ আছে। ইসরাইলী মানেই সব এক না। সবচেয়ে পুরনো ভাগ অর্থোডক্স জুডাইসম, তারপর এলো কঞ্জেরভাটিভ জুডাইসম, তারপর এলো রিফর্ম জুডাইসম। এই ধর্ম সম্পর্কে আমরা সবচেয়ে কম জানি। অথচ ওরা আমাদের সম্পর্কে ঠিক ততখানি জানে যত খানি জানে একজন ক্যান্সার গবেষক ক্যান্সার সম্পর্কে।
বৌদ্ধ ধর্মের ভাগ গুলো হল– থেরেভাদা, মহায়ানা ও ভজ্রাসানা। এর মধ্য আরও কিছু জটিল ব্যাপার আছে। এরাও সবাই মনে করে বৌদ্ধ ধর্ম শান্তির ধর্ম, পৃথিবীর সেরা ধর্ম। আর ধর্মের মধ্যে তাদের নিজাদের ধারাটাই সহি।
হিন্দু ধর্ম বর্তমান পৃথিবীর প্রধান ধর্মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো। ইসলাম ধর্ম পৃথিবীতে আসার প্রায় ছয় হাজার বছর আগে এই ধর্মের আবির্ভাব। সবচেয়ে পুরনো বলে এর ভাগের সংখ্যাও বেশি। খুব জটিল অবস্থা। যাই হোক, প্রধান ভাগ গুলো হল– Vaishnavism, Shaivism, Shaktism, Smartism ।
হিন্দু ধর্মের আরও অনেক অনেক ধারা উপধারা আছে, যা অনেক গবেষণা সাপেক্ষ। সব ধারাই ভাবে তারাই সঠিক, অন্যদের মাঝে ভুল আছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, লক্ষ্য করলে দেখা যায় উপরের আলোচনা করা ধর্মগুলো সবাই মানুষের ভালোর কথা বলছে। মানুষের জন্য ধর্ম, মানুষের ভালোর কথাই তো বলবে, সৃষ্টি কর্তা তো সেটাই চেয়েছেন; এতে অবাক হবার কি আছে? তাই তো! আমরা অবাক হচ্ছি কেন?
কিন্তু প্রশ্ন হল– পৃথিবীতে এতোগুলো ভালো ভালো ধর্ম থাকার পরও আমরা মানুষরা ভালো নাই কেন? এতো সমস্যা কেন চারিদিকে?
কারণ আমরা শ্রেষ্ঠ হইতে চাই! আমার ধর্ম সেরা, অন্যরা ভুল। তো ঠিক আছে, ভুল করছে করুক না। না সেইটাও হতেই দেব না। হিন্দুর ঘামও অপবিত্র, যবনের হাতে ভাত খেলে জাত যাবে, খ্রিষ্টানদের সাথে মিশলে বিধর্মী হয়ে যাবা, ইহুদীদের তো নাম নেয়াও পাপ! ওদের মাঝে কি ভালো মানুষ নাই? ধার্মিক নাই?
আসলে, আমরা ভাবিনা, শুধু শুনি, পড়ি আর মান্য করি। বিচার করি না। মানুষ হবার আগেই আমরা ধর্মাবলম্বী। তাই কেউ যখন বলে, “বিধর্মী মারো, জান্নাতে দাখিল হও”- আমরা ভাবিনা। কারণ চরদিকের অনেক সমস্যায় আমরা জর্জরিত। তাতে আমরা দিশেহারা।
আল্লাহ যেই মানুষটির জন্য সারা বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তাঁকে সত্যকে জানতে, দেখতে, ১৫ বছর সাধনা করতে হয়েছে হেরা পর্বতের গুহায়, একাকী। আল্লাহ তাঁর পূর্ব মনোনীত বন্ধুকে নবুওয়াত দিয়েছেন ৪০ বছর বয়সে, তার আগে নয়। জীবন সম্পর্কে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা হবার আগে আল্লাহ তাঁর কোন মনোনীত মানুষকেই পূর্ণতা দেননি।
মানুষ তার বয়স বাড়ার সাথে সাথে শিখতে থাকে। কিন্তু আল্লাহ সৃষ্টির শুরুতেও জ্ঞানী ছিলেন আজও আছেন। তিনি স্থির, চিরন্তন। তিনি আজ এক কথা কাল আরেক কথা বলেন না। যদি তাই হয়, ১০৪ খানা আসমানী কিতাবের প্রথমটিতে তিনি তাকে পাবার যে পথ দেখিয়েছেন শেষ কিতাব কুরআনেও একই পথ দেখিয়েছেন। কারণ ঈসা (আঃ), মূসা (আঃ)— এর আল্লাহ ভিন্ন নন, একই আল্লাহর কথা বলেছিলেন তারা।
গৌতম বুদ্ধ আর শ্রী কৃষ্ণের কথা জানি না, কিন্তু ঈসা ও মূসা (আঃ) এর কথা তো কুরআনেই উল্লেখ আছে। তাঁরা আল্লাহ (সোঃ) প্রেরিত নবী রাসূল। ইসলামে এও উল্লেখ আছে আল্লাহ ১ লক্ষ ২৪ হাজার মতান্তরে ২ লক্ষ ২৪ হাজার নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন যুগে যুগে মানুষকে হেদায়েত করার জন্য। তাদের কয়জনের নামইবা আমরা জানি? বতর্মান সময়ের শ্রেষ্ঠ মুসলমানও বোধহয় ১০০ জনের নামও বলতে পারবে না। অন্য ধর্মের কারও পারার কথা নয়! ঈসা (আঃ) খ্রিস্টানদের জেসাস হয়ে গেছেন, মুসা (আঃ) হয়ে গেছেন ইহুদীদের মোজেস, বাকি নবী রাসূলগণ কে জানে, কে কোথায় কেমন আছেন!
হায়রে ধর্মযুদ্ধ! হায়রে শ্রেষ্ঠত্ব!! হায়রে মানবতা!!!
ইয়া আল্লাহ তুমি আমাদের পথ দেখাও।



Leave a Reply