বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

কিছু পারসোনাল প্রবলেম ছিল, এ নিয়ে কথা বলতে চাই না: গুলতেকিন

gultekin_shakkhatkar2আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি লেখক হুমায়ূন আহমেদের সাবেক স্ত্রী গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার কোনোরকম মন্তব্য বা বিশ্লেষণ ছাড়াই ছাপা হচ্ছে।

গুলতেকিনের জীবনের না জানা কথা নিয়ে সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন। সাক্ষাতকার নিয়েছেন আতিক রহমান পূর্ণিয়া।

আজ দ্বিতীয় পর্ব।

গুলতেকিন বললেন…

পারিবারিক কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে লিটারেচারটা ভালভাবে পড়তে পারিনি। একসময় কবিতার প্রেমে পড়ে গেলাম। প্রচুর ইংরেজি কবিতা পড়তাম। অনেক কবির। একটা জিনিস খেয়াল করে দেখবেন, হুমায়ূন সবসময় তার লেখায় বাংলায় কোটেশন ব্যবহার করত। কখনও কখনও শেক্সপিয়ারের কিছু কোটেশন দিয়েছে। তবে বেশিরভাগই বাংলা কোটেশন ছিল। ৮৯ সালের পর আমার কাছ থেকে ইংরেজি কোটেশন ব্যবহার শিখেছে। সে রাত জাগত। একটু পরপর চা খেত। আমি বসে বসে কবিতা পড়তাম। তখন কোনো কবিতা ভাল লাগলে তার কাছে নিয়ে আসতাম। পড়ে শোনাতাম। সেই সব অনেক কবিতা থেকে হুমায়ূন তার লেখায় ইংরেজি কবিতার কোটেশন ব্যবহার করেছে।

আমার মনে আছে, আমাদের ছেলে হয়েছিল। আগে থেকেই নাম ঠিক করে রেখেছিলাম রাশেদ হুমায়ূন। মেয়ে হলে কী নাম হবে তাও ঠিক করা ছিল। রাশেদ হুমায়ূন জন্মের তিনদিন পর মারা যায়। এর তিন-চার দিন পর হুমায়ূনের ইউএসএ যাওয়ার কথা তিন মাসের জন্য। তারও তিন-চার দিন পর আমার ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল। হুমায়ূন ইউএসএ যাওয়ার আগে তার ‘ভক্তা-ভক্তিরা’ এসেছিল। ভক্তির সংখ্যাই বেশি। সারারাত তাদের সময় দিল। আমি অভিমান করেছিলাম। বললাম, চলে যাবে তবু আমাকে সময় দিলে না। আমার বাচ্চাদের বাবা রেগে গেল। বলল, তোমার জন্য বাচ্চা মারা গেছে। তুমি বাচ্চা চাওনি।

তারপর কী হল? আপনি পরীক্ষা দিয়েছিলেন?
হুমায়ূন চলে গেল। আবার আমারও পরীক্ষা। আমি পরীক্ষা দেব সিদ্ধান্ত নিলাম। কাঁদতে কাঁদতে পরীক্ষা দিতে গেলাম। আমার নিকট আত্মীয় রিংকুকে সাথে নিয়ে পরীক্ষার হলে গেলাম। রিংকু আমার সামনের সিটে বসার কথা। তাকে বললাম, পরীক্ষার সময় তুমি পেছনে তাকাবে না। কারণ আমি পরীক্ষা না দিয়ে বেরও হয়ে যেতে পারি। তখন তোমার পরীক্ষা খারাপ হবে।

তখন এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের কারণে একটা পরীক্ষা হবার পর আর হলো না। পরে আমিও ইউএসএ চলে গেলাম।

পড়াশুনাটা কীভাবে সম্পন্ন করেছেন?
তখন আমরা এলিফেন্ট রোডের বাসায় চলে এসেছি। আমার শাশুড়ি আমাকে অনেক বেশি হেল্প করেছেন। তিনিই নুহাশকে দেখতেন।

নুহাশের বয়স তখন মাত্র দুই বছর। আমি দরজা বন্ধ করে পড়তাম। নুহাশ গিয়ে বারবার দরজা ধাক্কাতো, ডাকত। আমার শাশুড়ি সামলাতেন। মাস্টার্সেও ভালভাবে পড়তে পারিনি। কিছু পারসোনাল প্রবলেম ছিল। এ নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমার পড়ালেখাটা বড় একটা স্ট্রাগল। নুহাশ ছোট। তার বাবা খুব ব্যস্ত।  ফুলটাইম কোনো কাজে যোগ দিতে পারছিলাম না। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএ (টিচার্স অ্যাসিসট্যান্ট বা শিক্ষকের সহকারী) হিসেবে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। চিন্তা করলাম। এটাতো পুরোপুরি শিক্ষকতা না, শিক্ষক যা বলবেন তাই করতে হবে। আমার একজন বান্ধবী পরামর্শ দিল যে এ কাজটা ভাল হবে না। ১৯৯৮ সাল থেকে স্কলাসটিকা স্কুলে শিক্ষকতা করছি। এখনও আছি। মাঝে ব্যক্তিগত কারণে এক বছর গ্যাপ দিয়েছিলাম।

হুমায়ূন আমার ক্লাস বা টিউটোরিয়াল থাকলে বলত, এখানে যাব, ওখানে যাব। আমি বলতাম, আমার টিউটোরিয়াল আছে। ক্লাস আছে। সে বলত, স্যারকে বলে ম্যানেজ করে নাও। পরে দিয়ে দিও। আমি না করতাম। সে চলে যেত। সে তার বন্ধু, ওই যে অয়োময়ের হানিফ (মোজাম্মেল হোসেন) ভাইকে নিয়ে একবার ইন্ডিয়া চলে গেল। একে ওকে নিয়ে ঘুরতে চলে যেত। ঘুরে এসে বলত, বন্ধুদের সাথে বেড়ানোতে কী যে মজা!

আমি জাতিসংঘে কাজ করতে পারতাম। এতদিনে অনেক বড় পদে থাকতে পারতাম।

আমার স্কুল বছরে একবার এক মাসের ছুটি হত। তখন ঘুরতে যেতে চাইতাম। কিন্তু সে সময় হুমায়ূন রাজি হত না। আমি বাচ্চাদের নিয়ে বা গ্রুপে পরে নিজেই ঘুরতে বের হতাম। ক্লাস ফ্রেন্ডরা আমাকে গুল ডাকত। জিনাত আপা (আত্মীয়) বললেন, প্রত্যেকবার কলকাতায় যাই, এবার ব্যাংকক যাব। প্রথমবার ব্যাংকক গিয়ে খুব এনজয় করেছি।

ব্যাংকক থেকে স্যান্ডেল কিনলাম। আমার আর হুমায়ূনের পায়ের মাপ এক ছিল। আমি জানতাম। একশ’-দেড়শ’ ডলার দিয়ে সবচেয়ে দামি স্যান্ডেলটা বাচ্চাদের বাবার জন্য কিনলাম। দেশে এসে তাকে দিলাম। একদিন হুমায়ূন বাজারে গেল। বাজার থেকে ফেরার পর দেখি তার পায়ে ঐ স্যান্ডেল। বলল, বাজারে পরার জন্য জুতাটা খুব আরামের।

একবার আমার সাবেক স্বামীকে বললাম, কী যেন একটা কাজে আমি গাজীপুর যাব। সে বলল, তুমিতো এখন বড়লোক। তোমার এখন বড়লোক ফ্রেন্ড। তুমি দেশ-বিদেশ যাবে।

আমার ফ্ল্যাট বিক্রি করে মালয়েশিয়া, ব্যাংকক অনেক দেশে বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। এ জন্য আমার কোনো গিল্টিনেস নেই। সামনের সেপ্টেম্বরে ইটালি-জার্মানি-ফ্রান্স যাব ভেবেছিলাম। ইটালিতে একটু কাজও ছিল। ইউরোপে ঘুরে আসার ইচ্ছা। এখনতো দেখি ফ্রান্সেও জঙ্গি হামলা। তাই ক্যান্সেল করেছি।

বিদেশ ভ্রমণের বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতার কথা…
২০০২ সালে আমার বড় মেয়ে বলল, সে স্থায়ীভাবে ইউএসএ চলে যাবে। আমার তখন মনে হল চার বাচ্চাকে নিয়ে আবার কবে ঘুরতে যাব? আমরা মালয়েশিয়া গেলাম। রোজা আর ঈদের সময় বাচ্চারা মালয়েশিয়া যেতে একদমই রাজি ছিল না। গিয়ে ওদের সে কি আনন্দ! বাচ্চারা প্রচুর কেনাকাটা করল। খুব এনজয় করল। ঈদের দিন আমি ওদের ৫০ ডলার করে সালামি দিলাম। ওরা আরো খুশি। ওরা আরো কেনাকাটা করল। দেশে ফিরে দেখি সব জিনিস র‌্যাপিং পেপারে মোড়াচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, বলল, সব কেনাকাটা ফ্রেন্ডদের জন্য করেছে। ফ্রেন্ডদের গিফট করবে। আসলে ওদেরতো কাছের তেমন কেউ নেই। ইকবাল ভাই (জাফর ইকবাল) সিলেটে থাকেন। আহসান হাবীব সেই পল্লবীতে।

আবার ওদের নিয়ে ব্যাংকক গেলাম। অবশ্য যে এজেন্ট ব্যাংককের ট্যুরটা ম্যানেজ করেছিল সে হোটেলটা খুব বাজে দিয়েছিল। বাঙালি ম্যানেজমেন্ট ছিল। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, টাকা যাই লাগুক, আমি বাচ্চাদের নিয়ে ওয়েস্টিনে উঠে গেলাম।

বিদেশে একসময় ঈদের দিন আমি বাচ্চাদের বললাম, তোমরা বাবাকে ফোন কর। আমি রুম থেকেই ফোন করার ব্যবস্থা করে দিলাম।

সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব: হুমায়ূন আহমেদ আমাকে খুব আন্ডারএস্টিমেইট করত: গুলতেকিন

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *