বাড়িওয়ালারা নানা আশঙ্কা থেকে ব্যাচেলরদের বাড়ি ভাড়া দিতে চান না। এটা নতুন কথা নয়। এই পুরোনো বিষয়টির সঙ্গে এখন নতুন ব্যাপার যুক্ত হয়েছে—জঙ্গিবাদের ভীতি। সম্প্রতি কল্যাণপুরের একটি মেসে জঙ্গিদের আস্তানায় পুলিশি অভিযানের পর বাড়িওয়ালাদের মধ্যে এই ভীতি প্রকট হয়েছে।
এতোদিন ব্যাচেলররা মজা করে বলতেন, বাড়িওয়ালার তরুণী মেয়ে আছে তো, সে জন্য ভাড়া দিতে চান না।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যাঁরা চাকরিবাকরি ও পড়াশোনার জন্য ঢাকায় আসেন, তাঁদের মধ্যে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যাঁরা এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হননি।
এমনিতেই ঢাকার অনেক আবাসিক এলাকার বাড়ির সামনে দেখা যায়, ‘ব্যাচেলরদের বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয় না’—এ জাতীয় কথা লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে। আবার কোনো বাড়িতে সে রকম সাইনবোর্ড না থাকলেও ভাড়ার ব্যাপারে কেউ প্রশ্ন করলে প্রথমেই জানতে চাওয়া হয়, তিনি ব্যাচেলর কি না। উত্তরে তিনি যদি ‘হ্যাঁ’ বলেন, তাহলে বাড়িওয়ালা বা কেয়ারটেকার এমন ভাব করবেন যে সেই ব্যক্তির মনে হবে, ব্যাচেলর হয়ে তিনি মহাপাপ করে ফেলেছেন।
এটাও ঠিক, অনেক বাড়িওয়ালা ব্যাচেলরদের ভাড়া দিয়ে ঝামেলায় পড়েছেন।
কিন্তু সামগ্রিকভাবে ব্যাচেলরদের প্রতি বাড়িওয়ালাদের নাক সিটকানো মনোভাব রয়েছে। আর ব্যাচেলর নারীদের অবস্থা তো আরও করুণ। আজিমপুর কলোনিসহ বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত পরিবারগুলো খরচ কমানোর জন্য বাসার একটি ঘর মেয়েদের সাবলেট দিয়ে থাকে। আবার মেয়েদের কিছু হোস্টেলও আছে। সেখানে অনেক মেয়েই থাকেন, কিন্তু সেখানে তাঁদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয় বলে অভিযোগ আছে। তাঁরা কখন মেসে ফেরেন, তা নিয়ে তাঁদের অপদস্থ করা হয়। তবে মেয়েদের জন্য সরকার কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল বানিয়েছে। বলা বাহুল্য, সেটা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। আবাসনের সঙ্গে পুষ্টিগুণসম্পন্ন খাবারের সমস্যাও প্রকট।
এই তরুণ-তরুণীরা এত কষ্ট করে থাকলেও এ জন্য তাঁদের যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করতে হয়। এ বয়সটা চূড়ান্ত কর্মোদ্যমের বয়স। অথচ এ সময়টা আবাসন-শঙ্কায় কাটাতে এবং নিম্নমানের খাবার খেতে হয় বলে তাঁদের জীবনীশক্তি কমে যায়, যেটা আমাদের জন্য মোটেও ভালো ব্যাপার নয়। এরপর তাঁদের বিয়ে করার সময় আসে। ফলে সব মিলিয়ে এ সময়টা নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত তরুণদের জন্য খুব ভালো যায় না। কিন্তু আশ্চর্যজনক কথা হলো, এ ব্যাপারে সরকারের যেন কিছু করণীয় নেই। কোনো সরকারই এ বিষয়ে কোনো দিন মাথা ঘামায়নি।
আর এবার তরুণ ব্যাচেলরদের চিরস্থায়ী দুর্ভোগের সঙ্গে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। এখন যদি বাড়িওয়ালারা পুলিশের হয়রানির ভয়ে ব্যাচেলরদের বাড়ি ভাড়া না দেন, তাহলে এঁরা যাবেন কোথায়। ব্যাপারটা যেমন তাঁদের জন্য অমানবিক, তেমনি এর আরেকটি দিকও আছে। এই সুযোগে যদি জঙ্গি সংগঠনগুলো ব্যাচেলরদের থাকার ব্যবস্থা করে তাদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করে, তাহলে কিন্তু অনেকেই তাদের দলে যোগ দেবেন—ঠিক যেভাবে ইসলামী ছাত্রশিবির দলভুক্ত করার কাজটা করে থাকে। ফলে এতে হিতে বিপরীত হবে। সরকার যদি বিষয়টি এখনই আমলে না নেয়, তাহলে নতুন সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।
– প্রথমআলো অবলম্বনে




Leave a Reply