বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ভুয়া দলিলে দখল করা বাড়ি ছাড়তে হচ্ছে ব্যরিস্টার মওদুদকে

Mowdud+houseবিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ ঢাকায় তিন দশক ধরে যে বাড়িতে বসবাস করে আসছেন, সেই বাড়ি তার ভাই মনজুর আহমদের নামে মিউটেশন (নামজারি) করে ডিক্রি জারি করতে হাই কোর্টের দেওয়া রায় আপিল বিভাগে বাতিল হয়ে গেছে।

সেই সঙ্গে মওদুদের বিরুদ্ধে সরকারি বাড়ি আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের করা মামলাও আর টিকছে না।

সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়ের ফলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা মওদুদ আহমদকে গুলশান-২ নম্বর সেকশনের ১৫৯ নম্বর প্লটের ওই বাড়ি হারাতে হচ্ছে। রাজউক এখন বাড়িটি নিজেদের তত্ত্বাবধানে নেবে বলে জানিয়েছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একরামুল হক টুটুল।

হাই কোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাজউক ও রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল মঞ্জুর করে প্রধান বিচারপতি নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ মঙ্গলবার এই রায় দেয়।

পাশাপাশি ওই বাড়ি নিয়ে দুদকের দায়ের করা মামলায় অভিযোগ আমলে নেওয়াকে বৈধতা দিয়ে হাই কোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে মওদুদ ও তার ভাইয়ের করা আপিলও সর্বোচ্চ আদালত মঞ্জুর করেছে। ফলে সে মামলাটি বাতিল হয়ে গেছে।

আপিল বিভাগে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একরামুল হক টুটুল।

আর মওদুদের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ও মাহবুব উদ্দিন খোকন। মওদুদ নিজেও শুনানিতে অংশ নেন।

রায়ের পর টুটুল বলেন, মওদুদের ভাইয়ের নামে ওই প্লটের বায়না চুক্তিতে তারিখ দেখানো হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ১০ অগাস্ট। কিন্তু ওই বাড়ির মালিক অস্ট্রিয়ার নাগরিক ইনজে মারিয়া প্লাজ মারা যান ১৯৮৫ সালের ৩০ মার্চ। অর্থাৎ বায়নানামাটি ছিল ‘ভুয়া’।

এক বিঘা ১৩ কাঠা জমির ওপর ওই বাড়ি অবৈধভাবে দখল ও আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর গুলশান থানায় মওদুদ ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে এই মামলা করেন দুদকের উপ-পরিচালক হারুনুর রশীদ।

দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা ২০১৪ সালের ২৬ মে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে এ মামলার অভিযোগপত্র দিলে ওই বছর ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের বিচারক তা আমলে নেন।

অভিযোগে বলা হয়, গুলশানের যে বাড়িটিতে মওদুদ আহমদ ও তার পরিবার থাকছেন, তার প্রকৃত মালিক ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক মো. এহসান। ১৯৬০ সালে তৎকালীন ডিআইটির কাছ থেকে এই বাড়ির মালিকানা এহসান পান। ১৯৬৫ সালে বাড়ির মালিকানার কাগজপত্র এহসানের স্ত্রী অস্ট্রিয়ার নাগরিক ইনজে মারিয়া প্লাজের নামে নিবন্ধন করা হয়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এহসান স্ত্রীসহ ঢাকা ত্যাগ করেন। তারা আর ফিরে না আসায় ১৯৭২ সালে এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত হয়।

ওই বছর থেকেই মওদুদ পরিবার নিয়ে ওই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। এরপর ১৯৭৩ সালের ২ অগাস্ট তারিখে তিনি ইনজে মারিয়া প্লাজের নামে একটি ‘ভুয়া’ আমমোক্তারনামা তৈরি করান এবং নিজেকে তার ভাড়াটিয়া হিসেবে দেখিয়ে ওই বাড়িতে বসবাস করতে থাকেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।

কবি জসীমউদ্দীনের জামাতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মপক্ষ সমর্থন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তাকে বাংলাদেশের প্রথম পোস্ট মাস্টার জেনারেল করা হয়।

অবশ্য পরে দেশের প্রথম সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগ দেন মওদুদ। জিয়া তাকে মন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। জিয়ার মৃত্যুর পর মওদুদ সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের হাত ধরেন। এরশাদের নয় বছরের শাসনামলে তিনি মন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর মওদুদ বিএনপিতে ফেরেন এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

দুদকের মামলায় বলা হয়, জিয়ার সরকারের উপ প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে মওদুদ ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে গুলশানের ওই বাড়ি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর ধারাবাহিকতায় মাত্র ১০০ টাকা মূল্য  দেখিয়ে ১৯৮০ সালে প্লটটি তিনি বরাদ্দ নেন।

পরে তিনি একটি বায়নানামা হাজির করেন, যেখানে দেখানো হয়, ওই বাড়ির মালিক ইনজে মারিয়া প্লাজ জনৈক মহসিন দরবারকে আমমোক্তার বানিয়েছেন এবং সেই মহসিন দরবার ১৯৮৫ সালে বাড়িটি মওদুদের সহোদর ভাই মনজুর আহমদের নামে বায়না করে দিয়েছেন।

মওদুদ ওই অভিযোগ আমলে নেওয়ার আদেশের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেন। শুনানি নিয়ে গতবছর ২৩ জুন হাই কোর্ট তা খারিজ করে দেয়।

হাই কোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে মওদুদ আপিলের আবেদন করলে আপিল বিভাগ তা মঞ্জুর করে। এর ধারাবাহিকতায় আপিল বিভাগে মওদুদের আপিলের শুনানি হয়।

এদিকে মওদুদের এক আবেদনে ২০১০ সালের ১২ আগস্ট হাই কোর্ট গুলশানের ওই বাড়ি তার ভাই মনজুর আহমদের নামে মিউটেশন এবং ডিক্রি জারি করতে নির্দেশ দেয়।

রাজউক হাই কোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চাইলে ২০১৪ সালের ৯ মার্চ আপিল বিভাগ তা মঞ্জুর করে। এরপর চলতি বছর শুনানি নিয়ে আদালত বিষয়টি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে।

আপিল বিভাগ মঙ্গলবার দুটি বিষয়ের রায় একসঙ্গে ঘোষণা করে।

আরও পড়ুন