বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

কৃষক ও দরিদ্রদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে

??????????????????????????????????????????????????????????

গত চার দশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনেক চিত্রই দৃশ্যমান। শিল্প ও সেবা খাতের নেতৃত্বে প্রবৃদ্ধি প্রতি বছর ৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। সবুজ বিপ্লবের সুবাদে কৃষিতে উত্পাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। রেমিট্যান্স, রাস্তাঘাট ও বাজার অর্থনীতির সংযোগে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। সরকারি ও বেসরকারি হিসাবে দারিদ্র্য রেখার নিচের মানুষের সংখ্যা অনেক কমেছে। তবে সমাজে ন্যূনতম উপকরণবর্জিত মানুষের সংখ্যা এখনো খুব একটা কম না। চরম দরিদ্র এসব মানুষ স্বভাবে নয়, অভাবেই বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ।

সরকারি ও বেসরকারি তথ্য-উপাত্ত বলছে, দেশে দরিদ্র ও কৃষকের মধ্যে আত্মহননের ঘটনা বাড়ছে। ২০১২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশে প্রতি বছর ১০ হাজার লোক আত্মহত্যা করে। কিন্তু ২০১৫ সালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, এ সংখ্যা ১৭ হাজার ছাড়িয়েছে।

২০১৩ সালে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) কয়েকজন গবেষক সরকারি-বেসরকারি সংস্থার তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের জরিপ থেকে দেখতে পান, যারা আত্মহত্যা করছেন, তাদের ৫৫ শতাংশেরই পরিবারের মাসিক আয় ৫০ ডলার বা ৪ হাজার টাকার নিচে। এদের মধ্যে ১৪ শতাংশেরই মাসিক আয় ২৫ ডলার বা ২ হাজার টাকার নিচে। আবার এদের ৪২ শতাংশই নিরক্ষর। অনেকে আবার চিকিত্সা ব্যয় মেটাতে না পেরেও আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন।

আত্মহননকারীদের আয়ের উত্স খুঁজতে গিয়ে সিআইপিআরবির গবেষকরা দেখেন, বড় একটা অংশ কৃষিকাজ বা পারিশ্রমিকবিহীন পারিবারিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। এদের মধ্যে আবার একটা বড় অংশ নারী এবং গৃহবধূ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, চরম হতাশা, সামাজিক বঞ্চনা থেকেই মানুষ মৃত্যুকে বেছে নিচ্ছে। সমাজে বিশ্বস্ত কোনো সহযোগী না পাওয়ার কারণে তারা এ ধরনের বঞ্চনার কথা কারো কাছে প্রকাশ করতে পারে না। এছাড়া বললে সমাধান দিতে পারবে, এমন আস্থাভাজন কাউকে খুঁজেও পায় না। তখন বেঁচে থাকাকেই সমাজের বোঝা মনে করে তারা। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক পরিবর্তন ছাড়া আত্মহত্যা কমানো সম্ভব নয়।

কেন মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে, তা জানার জন্য মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে আক্রান্ত জেলা ঝিনাইদহে অনুসন্ধান চালায় বণিক বার্তা। এতে অনেকগুলো বিপন্ন মানুষের শেষ পরিণতি যে আত্মহত্যা, সে চিত্রই উঠে আসে।

ঝিনাইদহ সদরের ভূপতিপুর গ্রামের দরিদ্র কৃষক কাউছার। স্বল্প জমি এবং কৃষিপণ্যের ব্যবসা দিয়ে চলছিল তার সংসার। কিন্তু মাথায় টিউমার হওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় ব্যবসা ও আয়-রোজগারের অন্যসব পথ। ২০১৩ সালে রোগটি ধরা পড়ার পর কিছু জমি বিক্রি করেও ভালো চিকিত্সা পাননি। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন কাউছার। এর পর জমি থেকেও কমতে থাকে আয়। তখন ধারদেনা করে চিকিত্সা ও সংসার খরচ চালিয়েছেন। কিন্তু গত বছরের শুরুতে মোটা অঙ্কের টাকার প্রয়োজন হলে আর উপায় না পেয়ে বেছে নেন আত্মহত্যার পথ।

একইভাবে অভাবের কারণে আত্মহত্যা করেন জেলার দিনমজুর মনোয়ার হোসেনের স্ত্রী তাসলিমা। তাসলিমার স্বামীর মাসিক আয় ছিল ৪ হাজার টাকার নিচে। বিয়ের পর থেকেই সংসারে নিত্য অভাব-অনটনের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। ফলে প্রায়ই স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া হতো তার। গত বছরের আগস্টে সন্তান শাসনকে কেন্দ্র করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। এর পরই অভিমানে বিষপানে আত্মহত্যা করেন তাসলিমা।

স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সোসাইটি ফর ভলান্টারি অ্যাক্টিভিটিস (শোভা) ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের আত্মহত্যাকারীদের তথ্য সংগ্রহ করে তাদের মৃত্যুর কারণ, মৃত্যুর প্রভাব ও পেশাগত তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। সংস্থাটির তথ্যে এসব মানুষের মৃত্যুর ১১টি কারণ উঠে এসেছে, যেগুলো দারিদ্র্য ও আবেগপ্রবণতাকে ঘিরেই আবর্তিত। আত্মহত্যা করা এসব মানুষ নিজে কিংবা তাদের পরিবার কৃষিকাজ বা ব্যবসায়ে যুক্ত। তবে সিংহভাগের পেশা ছিল কৃষি।

সংস্থাটির তথ্যে, ২০১৫ সালে ঝিনাইদহ জেলায় যে ১ হাজার ৯৪৪ জন আত্মহত্যা করেছেন, তাদের মধ্যে ৬৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ নারী এবং ৩৬ দশমিক ৩২ শতাংশ পুরুষ। এদের অধিকাংশেরই বাস অসচ্ছল উপজেলায়। অপেক্ষাকৃত সচ্ছল উপজেলাগুলোয় আত্মহত্যার হার কম। সংস্থটির হিসাবে, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন আত্মহত্যা করছে প্রায় ২৮ জন।

এ বিষয়ে আইএএসপির বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও শোভার নির্বাহী পরিচালক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, কৃষক ও দরিদ্র পরিবারে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। পরিবারপ্রধান কিংবা মায়ের মৃত্যুতে আরো দরিদ্রতার বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে এসব পরিবার। বিপুল জনগোষ্ঠীকে মূল স্রোতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে না পারলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।

আত্মহত্যা নিয়ে সমগ্র বিশ্বেই উদ্বেগ আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, ১৫-৪৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হলো আত্মহত্যা। সংস্থাটির পূর্বাভাস বলছে, ২০২০ সাল নাগাদ প্রতি বছর সাড়ে ১৫ লাখ মানুষ আত্মঘাতী হবে। আত্মহত্যার চেষ্টা চালাবে এরও ১০ থেকে ২০ গুণ মানুষ। এমন পরিস্থিতির মধ্যে প্রতি বছরের সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’।

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন (আইএএসপি) ‘বিল্ডিংস ব্রিজেস ফর এ নিউ স্টার্ট বিয়ন্ড বর্ডারস’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে এবারো দিবসটি পালন করবে পুরো বিশ্ব। তবে আন্তর্জাতিক মহলে আত্মহত্যা নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও আমাদের সমাজে তা এখনো নীতিনির্ধারকদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান নিতে পারেনি।

এ বিষয়ে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, কৃষক ও দরিদ্রদের আত্মহত্যার প্রবণতা নতুন ধারণার জন্ম দিচ্ছে। তাই এটিকে শুধু একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে সামাজিক মূল্যবোধের জায়গাটা সংকুচিত হয়ে আসছে। তাই বিষয়টিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে দেখতে হবে। কৃষক ও দরিদ্রদের হতাশার জায়গাগুলোকে আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করে সমাধানের উদ্যোগ না নিলে এ ধরনের প্রবণতা রোধ করা যাবে না।

পুলিশের তথ্যে দেখা গেছে, ২০১১ সালে আত্মহত্যায় মৃত্যুবরণ করে ৯ হাজার ৬৪২, ২০১২ সালে ১০ হাজার ১০৮ জন। এছাড়া ২০১৩ সালে ১৬ হাজার ২৮৮, ২০১৪ সালে ১৬ হাজার ৭১৬ এবং ২০১৫ সালে ১৭ হাজার ৬২৩ জন আত্মহত্যা করে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের সহকারী মহাপুলিশ পরিদর্শক (মিডিয়া) মো. জালাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, সারা দেশের পুলিশের কার্যালয়গুলোর তথ্যগুলো একত্র করেই বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়লেও এ বিষয়ে পুলিশ কাজ করছে। সেক্ষেত্রে আঞ্চলিকতা ও শ্রেণী-পেশাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবারগুলোয় কাউন্সেলিংও করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন