বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ড. ইউনূস এবং হুগো শ্যাভেজ ও গাদ্দাফি: আমার অভিজ্ঞতা

Jamil D Ahsan-Newsworldbdজামিল ডি আহসান বীর প্রতীক।

একজন ড. ইউনূস। আমি সে ভাবেই তাকে জানি এবং চিনি। ইদানিং তার অলিম্পিক মশাল বহন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগে পক্ষে-বিপক্ষে আবার অনেকে সরব। বেচারা বেশ বিপদেই আছেন। তবে এখনও প্রধান মিডিয়া বা রাজনৈতিক মন্ত্রী, নেতাদের সরবকন্ঠ নজরে আসেনি।

ব্যক্তিগতভাবে তার সাথে পরিচয় নাই বললেই চলে, অন্তত: ২০১১ পর্যন্ত। তাও ক্ষণিকের। দীর্ঘদিনে মিডিয়ার মাধ্যমে তার সম্বন্ধে আমি যতটুকু জানি এবং চিনি।২০১১ সালে এক বন্ধুর পারিবারিক অনুষ্ঠানে ব্যক্তিগত পরিচিতি আর গ্রুপ ছবি তোলায় সীমাবদ্ধ আমাদের পরচয়। ওখানেই শেষ।

আমি তাকে নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা করতে যাছি না। তাকে নিয়ে আমার কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চাচ্ছি।

২০০৫ থেকে ২০০৭ এ আমি লিবিয়ায় রাষ্ট্রদূত ছিলাম। ওই সময়কালে লিবিয়ায় অনেক রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান সফর করেছেন এবং তাদের সাথে সব সময় সৌজন্য সাক্ষাৎকার করতে হয়েছে তাদের আগমন, বিদায়কালে ও সরকারী রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে গাদ্দাফী উপস্থিত থাকতেন। কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে গাদ্দাফীর ছিল ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তার মধ্যে একজন ছিলেন ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধান প্রয়াত হুগো সাভেজ। আমার সময়ে কয়েকবার তিনি লিবিয়া সফরে আসেন। এখানে আমি প্রথমবার তার সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছি।

গাদ্দাফীর সরকারী বাস ভবন ‘বাব এল আজিজীয়া’ ত্রিপলীর কেন্দ্রস্থলে। কঠোর নিরাপত্তাবলয়ে সুরক্ষিত। ( গত গনঅভ্যুথ্থানের পর তা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।) ওখানে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হতো, তবে গাদ্দাফী ওখানে কদাচিৎ থাকতেন! হুগো সাভেজ সফরে এসেছেন। গন্যমান্য ব্যক্তি ও রাষ্ট্রদূতদের সাথে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারের জন্য আমরা বাব এল আজিজীয়ায় সকাল নয়টা থেকে অপেক্ষমান। উল্লেখ্য, লিবিয়ায় সরকারী বা আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে, বিশেষ করে গাদ্দাফীর উপস্থিততে অনুষ্ঠানে, কখনই নির্দিষ্ট সময়সূচী পালন করা হতো না। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বেলা দু’টার সময় শ্যাভেজ আসলেন। গাদ্দাফী হঠাৎ করে ভূঁইফোঁড়ের মত কোথা থেকে যেন উদয় হলেন! আমরা লাইনে সারিবদ্ধ হয়ে দাড়িয়ে। এক সময় সাভেজ আমার সামনে উপস্থিত। আমি খালি মাথায় বেসামরিক স্যুট পড়ে থাকলেও সটান বুকে তাঁকে একটা চৌকোষ সেল্যুট দিয়ে বল্লাম “Gen Jamil D Ahsan, Ambassador of Bangladesh. Salute from the people of Bangladesh, Excellency.”

পর মুহুর্তে তার প্রতিউত্তরে আমি হতচকিত ও অভিভূত! তিনি এক পা পিছনে গিয়ে ততোধিক একটা চৌকোষ সেল্যুট দিয়ে দৃঢ় স্বরে আমাকে বললেন “Seludar Bangladesh.You know Gen, I was a Colonel in the Army and you deserve a salute.” আমি কি বলবো বুঝে ওঠার আগেই আমাকে পরবর্তী প্রশ্ন করলেন “Has my friend Dr. Yunus returned to Bangladesh? ” ওই সময় ড: ইউনুস ইউরোপে সফরে ছিলেন। পাশেই গাদ্দাফী মুচকি হাসছেন, অন্যরা গভীর আগ্রহে আমাদের লক্ষ্য করছেন।

ত্রিপলীতে ২০০৬ এর অক্টোবরের মাঝামাঝি (সম্ভবত: ১৩ই) এক সন্ধ্যায় টিভিতে জানলাম অসলো থেকে ড. ইউনুসের শান্তিতে নোবেল প্রাপ্তির ঘোষণা হয়েছে। স্বভাবত:ই খুব আনন্দিত হলাম। ওই রাতে অনেক রাষ্ট্রদূত আমাকে ফোনে অভিনন্দন জানালেন যা পরবর্তী কয়েকদন পর্যন্ত চললো। পরদিন লিবিয়ার পররাষ্ট্র , অর্থ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ড. ইউনুসের সাথে যোগাযোগের তথ্য জানতে চাইলো। ড. ইউনুসের সাথে তারা কিভাবে কাজ করতে পারে তা জানতে তার আগ্রহী। এ বিষয়ে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করি। পরবর্তীতে বিভিন্ন দূতাবাস ও অনুষ্ঠানে ড. ইউনুস সম্পর্কে জানতে অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করেন। স্বভাবতই হঠাৎ করে কূটনৈতিক অঙ্গনে নিজেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো।

জামিল ডি আহসান: সাবেক রাষ্ট্রদূত, আনসার ও ভিডিপির সাবেক মহাপরিচালক; স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের সাবেক মহাপরিচালক।

(সাবেক সেবা কর্মকর্তা জামিলউদ্দীন আহসান, যিনি জামিল ডি আহসান নামে পরিচিত, একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন ‘বীর প্রতীক’ খেতাব। ২০০৬ সালে মেজর জেনারেল হিসেবে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। প্রেষণে তিনি রাষ্ট্রদূত হিসেবে লিবিয়ায় দায়িত্ব পালন করেন। একাত্তরে জামিলউদ্দীন আহসান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঢাকার কলাবাগান এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করেন। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ২ নম্বর সেক্টরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মেলাঘরে গিয়ে যুদ্ধের সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এর পর জুনের শেষে প্রথম বাংলাদেশ ওয়ারকোর্সে অন্তর্ভুক্ত হন। প্রশিক্ষণ শেষে ৯ অক্টোবর কমিশন লাভ করে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে মুক্তিবাহিনীর ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে ২ ও ৩ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ করেন)

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *