বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বেসরকারি উদ্যোগই গড়ছে ৯৯ শতাংশ মাদ্রাসা

base_1470857529-Madrashah-[Converted]১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু কলেজে মুসলমানরা ছিলেন ব্রাত্য (প্রবেশাধিকার ছিল না)। ক্যালকাটা মাদ্রাসাকেই তাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানরূপে বরণ করে নেন মুসলমানরা। আর এ মাদ্রাসার বেশির ভাগ ছাত্রই ছিলেন পূর্ববঙ্গের। ইংরেজি শিক্ষা তো দূরের কথা, বাংলা ভাষাকেও নিজেদের করে নিতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন তারা।

২০ শতকের প্রথম দশক অবধি বাংলা হরফ চিনতে পারেননি শিক্ষার্থীরা। মুসলমানদের আত্মপরিচিতিতে এ বিভ্রান্তি জারি ছিল ১৯৩০ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাদ্রাসা শিক্ষায় পাঠক্রম পরিবর্তন ও আধুনিকায়নে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও এর ভাবমূর্তিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। চাকরির বাজারেও তাদের সুযোগ অনেক সীমিত। যদিও মাদ্রাসা শিক্ষার ৯৯ শতাংশই গড়ে উঠছে বেসরকারি উদ্যোগে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ‘বাংলাদেশ এডুকেশন স্ট্যাটিসটিকস ২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলছে, বর্তমানে দেশে মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৯ হাজার ৩১৯টি। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান মাত্র তিনটি। সে হিসাবে দেশে মাদ্রাসার ৯৯ দশমিক ৯৭ শতাংশই গড়ে উঠেছে বেসরকারি উদ্যোগে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থা তুলনামূলক দুর্বল। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানরত শিক্ষকদেরও ৮০ শতাংশ অপ্রশিক্ষিত।

মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক একেএম সাইফ উল্যাহ এ বিষয়ে বলেন, দেশের শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম মাদ্রাসা। প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করছে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নেয়া হচ্ছে। জনবলের অভাবে মনিটরিং ব্যবস্থা কিছুটা দুর্বল হলেও তা জোরদারে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ব্যানবেইসের তথ্যমতে, ১৯৪৭-এর আগে বেসরকারি উদ্যোগে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয় ৭০৪টি। আর সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা হয় তিনটি মাদ্রাসা। এ তিন মাদ্রাসাই বর্তমানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। এর পর পাকিস্তান আমলে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয় ১ হাজার ৭৭৬টি। তবে সবচেয়ে বেশি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছে ১৯৭২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সময়ে। এ ১৮ বছরে দেশে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছে ৪ হাজার ৩৭৩টি। এর পর ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত নতুন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয় ১ হাজার ৯৬৭টি। তবে ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার হার অস্বাভাবিক রকম কমে যায়। গেল ১৫ বছরে দেশে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছে মাত্র ৩৯৪টি। ’৪৭-পরবর্তী এসব মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা বেসরকারি উদ্যোগে।

দেশে বিদ্যমান এসব মাদ্রাসায় শিক্ষক রয়েছেন ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৩ জন। এর মধ্যে প্রশিক্ষণ রয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ শিক্ষকের। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দাখিল পর্যায়ের মাদ্রাসায় শিক্ষক সংখ্যা ৬৬ হাজার ৮০১। এর মধ্যে প্রশিক্ষিত শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ২৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আলিম পর্যায়ে ২২ হাজার ৮৮৪ জন শিক্ষকের মধ্যে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ২০ দশমিক ৭২ শতাংশ। এছাড়া ফাজিল পর্যায়ে ১৯ হাজার ৩৭৬ জন শিক্ষকের মধ্যে প্রশিক্ষিত ১৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আর কামিল পর্যায়ে শিক্ষক রয়েছেন ৪ হাজার ৯৭২ জন। এর মধ্যে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার মাত্র ১৭ দশমিক ২৮ শতাংশ।

লক্ষ্মীপুর জেলায় অবস্থিত শতবছরের পুরনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গন্ধর্ব্যপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা। পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদানের জন্য মাদ্রাসাটিতে শিক্ষক রয়েছেন ২২ জন। এর মধ্যে প্রশিক্ষণ রয়েছে মাত্র চারজন শিক্ষকের।
অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকের প্রভাব শিক্ষার্থীদের ফলাফলের ওপর পড়ছে বলে মন্তব্য করেন মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ মাওলানা ওমর ফারুক। তিনি বলেন, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষকরা সৃজনশীল পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারেন না। এছাড়া প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় শিক্ষার্থীদের মানসম্মত পাঠদান সম্ভব হচ্ছে না।

সাধারণ শিক্ষার তুলনায় মাদ্রাসা শিক্ষায় ঝরে পড়ার হারও অনেক বেশি। ব্যানবেইসের হিসাবে, মাদ্রাসার ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী দাখিল (মাধ্যমিক) পর্যায় শেষ করার আগেই ঝরে পড়ে। এছাড়া আলিম (উচ্চ মাধ্যমিক) পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ১৩ শতাংশ। এ পর্যায়ে মেয়েদের ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি। আলিম ধাপ শেষ না করে শিক্ষাজীবন শেষ করছে ৩০ শতাংশ ছাত্রী।

বিজ্ঞানশিক্ষার দিক থেকেও অনেক পিছিয়ে রয়েছে মাদ্রাসা বোর্ডের অধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। ৭৫ শতাংশ মাদ্রাসায় কোনো বিজ্ঞানাগার নেই। এতে বিজ্ঞান বিষয়ে ব্যবহারিক শিক্ষাগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এছাড়া ৪২ শতাংশ মাদ্রাসা এখনো মাল্টিমিডিয়া সুবিধার বাইরে। আর ২৭ শতাংশ মাদ্রাসায় এখনো পৌঁছেনি কম্পিউটার। ইন্টারনেট সুবিধা নেই ৪২ শতাংশ মাদ্রাসায়। বিজ্ঞানশিক্ষার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় দাখিল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানশিক্ষায় অংশগ্রহণের হারও অনেক কম মাত্র ১০ শতাংশ।

মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী সংখ্যা মোট ২৪ লাখ ৯ হাজার ৩৭৩; এর মধ্যে ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই নারী। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট শিক্ষার্থীর ৮ শতাংশই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে।

জানা যায়, ১৯৮৬ সালে সর্বপ্রথম মাদ্রাসা বোর্ডের দাখিল ও আলিম স্তরকে যথাক্রমে এসএসসি ও এইচএসসির সমমান দেয়া হয়। তার পর ২০০৬ সালে ফাজিল ও কামিল স্তরকে যথাক্রমে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সমমান প্রদান করা হয়। তবে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সমমান দেয়া হলেও মাদ্রাসা শিক্ষা সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে অনেক পিছিয়ে। মাদ্রাসা শিক্ষায় মূলত পাঠ্যপুস্তক ও সিলেবাস আধুনিকায়ন করে ধীরে ধীরে এ মাধ্যমকে সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে একীভূত করলে এর শিক্ষার্থীরা সব পেশার জন্য নিজেদের যোগ্যতর হিসেবে তৈরি করার সুযোগ পাবে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষা একটি বিশেষ ধরনের শিক্ষা। খণ্ডিত শিক্ষার ফলে এখান থেকে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারছে না। তাই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থা হতে হবে এক ধারার। সে ধারা হবে মাতৃভাষাভিত্তিক। খণ্ডিত শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের পর্যবেক্ষণ বাড়াতে হবে।

আরও পড়ুন