বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

গ্রাহকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য সরাসরি পাবে না র‌্যাব-পুলিশ

bangladeshi bank Listগ্রাহকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরাসরি র‌্যাব-পুলিশ বা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে দেওয়ার বিধান আপাতত করা হচ্ছে না। প্রচলিত পদ্ধতি মেনেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ব্যাংক থেকে সন্দেহভাজনদের তথ্য নিতে হবে। ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখা এবং গ্রাহকদের হিসাবের গোপনীয়তা রক্ষা করতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সেখানে ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে এবং তাদের হিসাবের গোপনীয়তা রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও কঠোর অবস্থানে গেছে। এখন থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও দেশীয় কোনো সংস্থার অনুরোধে ব্যাংক থেকে কোনো গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করে কোনো সংস্থাকে দেবে না। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে অর্থায়ন প্রতিরোধে যেসব তথ্য সংড়গ্রহ করবে সেগুলো থেকে কারো কোনো তথ্যের প্রয়োজন হলে প্রচলতি আইন মেনে সেগুলো সবরাহ করা হবে না। আইনের বাইরে গিয়ে কারো অনুরোধে তারা কাউকে কোনো তথ্য দেবে না। তবে আদালতের নির্দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আদালতের কাছে এসব বিষয়ে তথ্য দেবে। এছাড়া মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে অর্থায়ন প্রতিরোধে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অন্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রচলিত নিয়মে তথ্যের আদান-প্রদান করবে। এর বাইরে তারা গ্রাহকের গোপনীয়তার বিষয়টি কঠোরভাবে রক্ষা করবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, বিশ্বব্যাপী ব্যাংক গ্রাহকের গোপনীয়তা রক্ষা করা একটি আইনসিদ্ধ বিষয়। সব দেশই এটি কঠোরভাবে মেনে চলে; এখানেও তাই করতে হবে। এর বাইরে গিয়ে কোনো কিছু করলে ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকের আস্থায় চিড় ধরতে পারে। তখন পুরো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে গ্রাহকের তথ্য যেভাবে চাওয়া হয়েছে তা প্রচলিত আইন ও ব্যাংকিং বিভাগের নিয়মের মধ্যে পরে কিনা তা খাতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই বিষয়ে এরইমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কিনা তা তিনি জানেন না বলে আমাদের সময়কে জানান।

সূত্র জানায়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প থেকে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়ে অনুসন্ধান বা তদন্তের স্বার্থে ব্যাংক গ্রাহকদের তথ্য সরাসরি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়ার অধিকার চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গত ১২ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি চিঠি পাঠিয়ে এ বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা করে গত ২৭ জুলাই ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের মহাব্যবস্থাপক দেবপ্রসাদ দেবনাথ অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে একটি চিঠি পাঠান। এতে তিনি ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের হিসাব বা লেনদেনের তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে প্রচলিত আইনগুলো তুলে ধরেন। চিঠিতে তিনি জানান, নতুন কিছু করতে হলে সরকারের আইন বা সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মতামত নেওয়া যেতে পারে।

সূত্র জানায়, কোনো সন্দেহভাজনের ব্যাপারে প্রচলিত আইন মেনে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে ব্যাংক হিসাব থেকে গ্রাহকরা অর্থ তুলে নিয়ে সটকে পড়েন। ফলে টাকা আটক করা যাচ্ছে না। এ কারণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সরাসরি ব্যাংক থেকে তথ্য পেতে চায়।

এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি আরও কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখন থেকে কোনো জঙ্গি বা বড় সন্ত্রাসীর নাম গণমাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওইসব হিসাব জব্দ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। সে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী না হলে জব্দ করা অ্যাকাউন্ট আবার স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে যাবে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আলাদাভাবে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, এর ফলে সন্ত্রাসী বা জঙ্গির ব্যাংক হিসাব জব্দ হয়ে গেলে টাকা উঠাতে পারবে না। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থেকে যদি প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তসহ বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হয় সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকও স্বীয় বিবেচনায় কিছু সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

এদিকে ১৮৯১ সালের ‘ব্যাংকার্স বুকস এভিডেন্স আইন’ অনুযায়ী ব্যাংকের কোনো গ্রাহকের হিসাবের তথ্য আদালতের আদেশ ছাড়া কোনো ব্যাংক কর্মকর্তাকে দিতে বাধ্য করা যাবে না। ব্যাংক গ্রাহকদের লেনদেন ও সম্পদের গোপনীয়তা রা করার জন্যই আইনটি করা হয়েছে। এই গোপনীয়তার কারণেই গ্রাহকরা ব্যাংকে নিজেদের সম্পদ রাখছেন। এখন ব্যাংকের অর্থ দ্বারা কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সেই েেত্র রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের তথ্য জানতে পারে। সেজন্য ওপরে উল্লেখিত প্রক্রিয়া আগে থেকেই চালু আছে।

বর্তমানে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি কোনো ব্যাংক-গ্রাহকের বিষয়ে তথ্য নিতে হয় তাকে আদালতের কাছে যেতে হবে। আদালত যদি কোনো নির্দেশনা দেন তবে সেসব তথ্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দিতে বাধ্য ব্যাংক। এছাড়া বাংলাদেশে ব্যাংকের মাধ্যমেও এসব তথ্য তারা সংগ্রহ করতে পারে।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম জানান, ব্যাংকের কাছে ঢালওভাবে গ্রাহকের তথ্য চাইলে তা দেওয়া কোনো সঠিক কাজ না। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাউকে সন্দেহ করলে সেই বিষয়টি বাংলাদেশ বাংকের কাছে জানতে চাইলে তার তথ্য ব্যাংক তো দেয়ই। আলাদা করে এমনভাবে চাওয়ার কোনো কারণ নেই।

আরও পড়ুন