বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় খুনিকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি নেই। অথচ মৃত্যুদণ্ডের রায় আংশিক কার্যকরের পর ছয় বছর পেরিয়ে গেছে। এ সময়কালে বিদেশে পলাতক দুজন খুনির অবস্থানের ব্যাপারে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে। চারজনের অবস্থান এখনো অজানা।
জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলেন, নুর চৌধুরী কানাডায় ও রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। অন্য চারজনের অবস্থানের ব্যাপারে নিশ্চিত না হলেও বিভিন্ন সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নানা তথ্য পেয়েছে। সেই অনুযায়ী খন্দকার আবদুর রশিদ পাকিস্তান কিংবা লিবিয়ায়, শরিফুল হক ডালিম পাকিস্তান, আবদুল মাজেদ সেনেগালে ও মোসলেমউদ্দিন জার্মানিতে অবস্থান করছেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ডের আপিল খারিজ করে দেন। এর ফলে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে হাইকোর্টের দেওয়া ১২ খুনির মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল থাকে। ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট ওই রায় দিয়েছিলেন। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি দিবাগত রাতে সৈয়দ ফারুক রহমান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান ও মহিউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। রায় কার্যকরের আগেই ২০০১ সালের জুনে জিম্বাবুয়েতে মারা যান আজিজ পাশা।
ঢাকা ও অটোয়ার কূটনৈতিক সূত্রে যোগাযোগ করে জানা গেছে, রাজনৈতিক আশ্রয়ের দাবি খারিজ হলেও কানাডা থেকে নুর চৌধুরীকে ফেরানোর ক্ষেত্রে বেশ জটিলতা আছে। মৃত্যুদণ্ড বিলোপকারী দেশ হিসেবে কানাডা সে দেশে আশ্রয় নেওয়া কোনো লোক নিজের দেশে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলে তাঁকে ফেরত পাঠায় না। এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে নুর চৌধুরীকে ফেরাতে একটি আইনি পরামর্শক সংস্থা নিয়োগ করা হয়েছে। অথচ সাংবিধানিক আইনি পরামর্শক সংস্থার পরিবর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি দেখভালের জন্য একটি বাণিজ্যিক আইনি পরামর্শক সংস্থা নিয়োগ করায় এতে সাফল্য পাওয়া নিয়ে সংশয় আছে।
অন্যদিকে, ঢাকা ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, অতীতে রাশেদ চৌধুরীর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র তেমন সহযোগিতার মনোভাব দেখায়নি। গত বছর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের রাজধানী সেক্রামেন্টো থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দূরের শহর কনকর্ডে অবস্থানকারী রাশেদ চৌধুরীর রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার বিষয়টি গত বছর বাংলাদেশকে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর থেকে বাংলাদেশ তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানালে তাতে ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ বিষয়টি জনসমক্ষে আসুক, সেটি যুক্তরাষ্ট্র চায় না। মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়ালের গত মে মাসে ঢাকা সফরের সময় বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের আলোচনা হয়েছিল। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিষয়টি নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সে দেশের আইন দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করছে।
জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, নুর চৌধুরীর কানাডায় ও রাশেদ চৌধুরীর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের ব্যাপারে সরকারের কাছে নিশ্চিতভাবে তথ্য আছে। অন্য চারজনের অবস্থান সম্পর্কে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে পলাতক ছয় খুনিকে ফিরিয়ে আনতে সরকারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ২০০৯ সালের নভেম্বরে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় দেওয়ার তিন বছর আগে অর্থাৎ ২০০৬ সালের শেষ দিকে নুর চৌধুরীকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। ২০০৬ সালে কানাডায় নুর চৌধুরীর রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন বাতিল হওয়ার পর তাঁর পাসপোর্টটি জব্দ করে অটোয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠিয়ে দেয় কানাডা। ওই সময় তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আগ্রহ দেখিয়ে কানাডা চিঠি দেয়। এ বিষয়গুলোকে ঢাকাকে অবহিত করা হলেও ওই সময় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়ায় নুর চৌধুরীকে দেশে ফেরত আনার সুযোগটি হাতছাড়া হয়।
নুর চৌধুরীকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সুযোগ ছিল না জানতে চাইলে ওই সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উদ্ধৃত হয়ে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা জানান। তবে তাঁরা আভাস দিয়েছেন, সে সময় এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কোনো নির্দেশনা ছিল না।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, ‘মূলত ২০১০ সালের জানুয়ারিতে আদালতের রায় কার্যকরের পর বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৯ সালে অন্য এক কাজে কানাডা সফরে গিয়ে সেখানকার আইনমন্ত্রীর সঙ্গে নুর চৌধুরীকে ফেরতের বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে আলোচনা করে বুঝতে পেরেছি, যেহেতু সে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে এবং কানাডা মৃত্যুদণ্ড রহিত করেছে, তাই তাকে ফেরত আনার ক্ষেত্রে জটিলতা আছে। তবে দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে, তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একক সিদ্ধান্তে বাণিজ্যিক আইনি পরামর্শক সংস্থা নিয়োগ করেছে। অথচ এখানে আমাদের প্রয়োজন ছিল সাংবিধানিক আইনে বিশেষায়িত একটি পরামর্শক সংস্থার।’
খুনিদের চাকরি হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭৬ সালের ৮ জুন প্রকাশিত এক সরকারি প্রজ্ঞাপনের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের সবাইকে বিভিন্ন দূতাবাসে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সৈয়দ ফারুক রহমান ও খন্দকার আবদুর রশীদ ছাড়া বাকিরা চাকরির প্রস্তাব গ্রহণ করেন।
নুর চৌধুরী ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। ১৯৭৬ সালে তিনি ইরানের বাংলাদেশ দূতাবাসে দ্বিতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। পরে আলজেরিয়া ও ব্রাজিলে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং হংকংয়ের কনসুলেটে বদলি হন তিনি। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি হংকংয়ে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল ছিলেন। ১৯৯৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান। ওই বছরই তিনি কানাডায় গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। কানাডার রাজধানী টরন্টোর ১৩ কিলোমিটার উপকণ্ঠ ইটোবিকোকে তিনি এখন অবস্থান করছেন।
রাশেদ চৌধুরী ১৯৭৬ সালে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনসুলেটে দ্বিতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। পরে তিনি কেনিয়া, মালয়েশিয়া, জাপান ও ব্রাজিলে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাজ করেন। ১৯৯৬ সালের জুলাইয়ে তাঁকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে ওই বছরের জুলাইয়ে দেশে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হলে তিনি ব্রাজিলের সাও পাওলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো চলে যান।
১৯৭৬ সালে বেইজিংয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রথম সচিব হিসেবে নিয়োগ পান শরিফুল হক। ১৯৮২ সালে হংকংয়ের কনসুলেটে বদলি হয়ে সেখানে তিনি ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। হংকং থেকে ওই বছরই তাঁকে কেনিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে বদলি করা হয় এবং ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি ওই পদে দায়িত্ব পালন করেন।


