মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

হুমায়ূন আহমেদের চোখে শেখ মুজিব, জিয়া ও মোশতাক

Humayun-Mujib-Zia“১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫। সকাল ৭টা ১৫ মিনিট। সেনা উপপ্রধান জিয়া চকচকে সামরিক পোশাকে সুবিন্যাস্ত হয়ে নিজ কার্যালয়ে এলেন। সেনাপ্রধান শফিউল্লাহও এলেন। আসলো খ‌‌‌ুনিরাও। ব্যাখা করল তাদের অবস্থান। ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে বেতার ভাষণ শেষ করলেন খন্দকার মোশতাক।

শেখ মুজিবের মন্ত্রীসভার প্রায় সবাই নতুন মন্ত্রীসভায় নাম লেখালেন। ঘৃণাভরে প্রস্তাব প্রত্যাখান করলেন মনসুর আলি। সৈয়দ নজরুল ও কামরুজ্জামানকে বাদ দেওয়া হলো। ডালিম ছুটে যান তাজউদ্দীনের কাছে। বললেন, ‘স্যার মোশতাক রাষ্ট্রপ্রতি হবেন। আপনি হবেন প্রধানমন্ত্রী।’

মাত‌‌‌ ১০দিন আগে প্রিয় নেতা মুজিব ভাই তাকে একটি বৃহত্তর সংগ্রামের জন্য পেপার তৈরী করতে দিয়েছিলেন। গত রাতেও আলাপ হয়েছে। দুহাত বুকে জড়িয়ে ধরলেন তাজউদ্দীন। সামনে অস্ত্র তাক করা সেনার দল। তিনি উচ্চারণ করলেন, ‘ইউ কিলড ইউর ফাদার, ইউ ক্যান কিল এভরিবডি। গেট আউট ইউ বাস্টার্ড।’

১৬ আগস্ট বেলা ২টা। শেখ মুজিবের লাশ হেলিকপ্টারে নিয়ে আসা হল টুঙ্গিপাড়ায়। সামরিক কর্মকর্তাদের নির্দেশ, লাশ যে অবস্থায় আছে সেভাবে দাফন করতে হবে। মুসলমানের লাশ এভাবে দাফন করতে রাজি না হওয়ায় সময় দেওয়া হয় ১০ মিনিট। শেখ মুজিবের পরনে রক্তমাখা লুঙ্গি, রক্তে লাল সাদা পাঞ্জাবি আর একটি তোয়ালে। ডান হাতের সেই বিখ্যাত তর্জনি গুলির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। মুখের চেহারা অবিকল!

অন্যদিকে ক্যান্টনমেন্টে ক্ষুব্ধ কর্নেল শাফায়াত জামিল বললেন, ‘এটা যদি সামরিক অভ্যুত্থান হয় তবে আমরা জানলাম না কেন? আমি মনে করি যারা এ কাজ করেছে দে শুড বি পানিশড।’ কিন্তু আশ্চর্য নীরব শফিউল্লাহ! শাফায়াত জামিল তাঁকে বলেন, ‘আপনি সেনাপ্রধান।আদেশ দিন আই উইল ওয়ার্কস আউট অল মার্ডারার্স উইদিন হাফ এন আওয়ার।’ তবু নীরব শফিউল্লাহ। কর্নেল জামিল ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘আমার ব্রিডেগ প্রস্তুত আছে। আপনি আদেশ দিতে না পারলে সেনাপ্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে চলে যান।’

পাশে বসেই ধূমপান করছিলেন জিয়‌‌‌া। সিগারেটে দীর্ঘ টান দিয়ে তিনি বলেন, ‘লুক, ইটস নট এ মেটার অব সেন্টিমেন্ট। মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে।’

২৪শে আগস্ট সেনাপ্রধান হন জিয়া। রাজাকার বাহিনীর সৃষ্টিকর্তা শফিউল আজম ক্যাবিনেট সচিব।

জেনারেল ওসমানী প্রতিরক্ষা সচিব! মাওলানা ভাসানীও অভিনন্দন জানালেন মোশতাক সরকারকে! গোলাম আযম উল্লাসিত হয়ে সৌদি থেকে মুসলিম দেশগুলোকে আহ্বান জানালেন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে। ভুট্টো পাকিস্তান থেকে উপঢৌকন পাঠালেন।

২২ আগস্ট গ্রেপ্তার হন তাজউদ্দীন, মনসুর, সৈয়দ নজরুল ও কামরুজ্জামান।

খুবই আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো শেখ মুজিবের হত্যার পর দেশ স্বাধীনের জন্য বীর বীক্রমে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধারাও ভাবলেন শেখ সাহেব যখন নাই তখন আর খামাখা ফাইট করে কি হবে। হাজার হোক খুনতো করেছে হাতিয়ারওয়‌‌‌ালা ভাইয়েরা। অতএব স্যালুট দ্য রাইজিং স্টার!”
সূত্র: দেয়াল – হুমায়ুন আহমেদ

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *